ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশ্বের অন্যান্য অংশের জন্য রোল মডেল -প্রধানমন্ত্রী

* আমরা কাছে এলাম, সম্পর্ক গভীর হলো -নরেন্দ্র মোদি
সংগ্রাম ডেস্ক : ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আমাদের এ সম্পর্ক বিশ্বের অন্যান্য অংশের জন্য একটা রোল মডেল হিসেবে গণ্য হবে। আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখেছি। এ সুসম্পর্ক আমাদের দৃঢ় আস্থার সঙ্গে পারস্পারিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। যাতে দুই দেশের জনগণই লাভবান হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লী থেকে গতকাল সোমবার বিকেলে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর গ্রিড থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আন্তঃবিদ্যুৎ সংযোগ গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্বোধন করেন। এ সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার  বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে ভারত থেকে আরো ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, এ উপলক্ষে দুই প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে ভেড়ামারায় নবনির্মিত ৫০০ মেগাওয়াট এইচভিডিসি ব্যাক টু ব্যাক স্টেশন সেকেন্ড ব্লকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
এ ছাড়া বংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের নির্মাণকাজও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। একই অনুষ্ঠানে দুই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সংযোগ পুনর্বাসন প্রকল্পেরও নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।
ভিডিও কনফারেন্সে দুই প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও ছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদিকে আমাদের উন্নয়নে সমর্থনদানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্তমানে ভারত থেকে আমরা ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছি, ভারত থেকে আরো তিন হাজার মেগাওয়াট আমদানি করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা গত সাড়ে ৯ বছরে তিন হাজার থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। ধন্যবাদ জানাই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে যে তিনি বলেছেন আমাদের আরো এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিবেন। আশাকরি নরেন্দ্র মোদি এতে সম্মতি দেবেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য আমাদের আরো অনেক বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এজন্য আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর অধীনে ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করছি। আমি আশা করি এ লক্ষ্য অর্জনে ভারত আমাদের পাশে থাকবে।’
বাসস জানিয়েছে, নতুন ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট আসবে ভারতের সরকারি খাত ‘ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট’ থেকে। ২০০ মেগাওয়াট আসবে সে দেশের বেসরকারি খাত ‘পাওয়ার ট্রেডিং করপোরেশন’ থেকে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণ ৬৬০ মেগাওয়াটের মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১৬০ মমেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কুমিল্লায় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সংযোগ পুনর্বাসন প্রকল্পে ৫৪৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা খরচ হবে।
প্রকল্পের অধীনে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল রুটে রেলওয়ে ব্রিজ, ব্রিজ ও স্টেশন বিল্ডিং, প্লাটফর্ম, রেল লাইন ও অন্যান্য রেল অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। আখাউড়া-আগরতলা রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল পুনর্বাসন প্রকল্পের খরচ ভারতের এক বিলিয়ন ডলার লাইন অব ক্রেডিটের অংশ থেকে মিটানো হচ্ছে।

শেখ হাসিনাকে নরেন্দ্র মোদি
সম্পর্কের মধ্যে প্রটোকল থাকা উচিত না
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমি মনে করি, সম্পর্কের মধ্যে কোনো প্রটোকল থাকা উচিত না। সম্পর্ক হতে হবে অবাধ। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বিমসটেক সম্মেলনে। এর আগে সব মিলিয়ে মোট চারবার আমাদের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে। খুব শিগগিরই আবারও ভিডিও কনফারেন্স হবে বলে আশা করি।
সোমবার বিকেলে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি বিষয়ক প্রকল্প, রেলওয়ের ‘কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন’ ও ‘আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেল সংযোগ (বাংলাদেশ অংশ)’ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এসব কথা বলেন।
ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু উপস্থিত ছিলেন।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ২০১৫ সালে যখন আমি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলাম, তখনই সিদ্ধান্ত নিই ৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেবো। এ জন্য পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের লিংক স্থাপন করা হচ্ছে। এই কাজে সহযোগিতা করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ সম্পন্ন হলে শিগগিরই ১ দশমিক ১৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সাপ্লাই করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহে মেগাওয়াট থেকে মেগাওয়াটে উন্নীত করা ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কেও সোনালি অধ্যায়ের প্রতীক। হিন্দি ভাষায় বক্তৃতার সময় মোদি বলেন, এটা আমার জন্য খুবই স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়, আমরা সম্পর্ক উন্নয়নে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমরা বিদ্যুৎ কানেকটিভিটিকে বাড়িয়েছি। এরপর রেলওয়ে কানেকটিভিটিকে আরও বাড়াতে দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছি, যা চলমান। তিনি বলেন, রেলওয়ে খাতেও দু’দেশের কানেকটিভিটি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ কানেকটিভিটি ও ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটি একে অপরের সঙ্গে জড়িত। আখাউড়া ও আগারতলার মধ্যে রেল কানেকটিভিটির কাজ সম্পন্ন হলে আমাদের ক্রস কানেকটিভিটিতে আরেক নতুন পালক যুক্ত হবে। এই প্রজেক্টে যুক্ত হয়ে সহযোগিতার জন্য মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবকেও অভিনন্দন জানাই।
মোদি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দেশের উন্নয়নের জন্য বড় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এই পরিকল্পনাকে স্বীকার করে তাকে সহযোগিতা করা আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস- আমরা ঐ বেশি সম্পর্কের উন্নয়ন করবো, মানুষের মধ্যে মানুষের সম্পর্ক তত বাড়বে। বিকাশ ও সমৃদ্ধির নতুন আকাশ ছোঁব।
ভিডিও করফারেন্সে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আজ থেকে আমরা আরও কাছে এলাম আর সম্পর্ক আরও গভীর হলো। 
এ অনুষ্ঠানে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যাপারেও একমত হয় দুই পক্ষ। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অংশ নেন।
মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দু’জনেই বাংলাদেশে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যাপারে তার কোনো দ্বিমত নেই।

আপনি জিতুন আমরা আসবো: শেখ হাসিনাকে মমতা
বাংলাদেশে আসতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। বললেন, ‘আপনি জিতুন, আমরা আসবো।’ গতকাল সোমবার বিকেলে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন, তিনি।
এর আগে বিকেল পৌনে ৫টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আখাউড়া-আগরতলা রেল প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশের কাজের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
জানা যায়, ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থের যোগান দিচ্ছে ভারত।
আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ মোট ১৫ কিলোমিটার। এরমধ্যে আগরতলা অংশে পাঁচ কিলোমিটার আর বাকি ১০ কিলোমিটার আখাউড়া অংশে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ