ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ যখন চিকিৎসা সেবা

রহিমা আক্তার মৌ : চিকিৎসা সেবা নিয়ে হয়তো এটা আমার ৫/৬ নং লেখা। “ঢাকামুখী নাকি টাকামুখী ডাক্তার”, “পেসেন্ট প্রেসক্রিপশন এবং কসাইখানা”, “চিকিৎসা সেবার হাল হকিকত” বাকিগুলো মনে নেই। “ঢাকামুখী নাকি টাকামুখী ডাক্তার” লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। সে লেখায় কয়েকজন ডাক্তারের সাথেও কথা বলি। লেখার শিরোনাম শুনে ঢাকা শহরে বসবাস রত ডাক্তাররা বলেছেন-
“ঢাকাও মুখী টাকাও মুখী”
কারণ জানতে চাইলে বললেন-
“ঢাকায় আছে টাকা”
সুন্দর জবাব। “পেসেন্ট প্রেসক্রিপশন এবং কসাইখানা” লেখাটি লিখতে গিয়ে কথা বলেছি হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের সাথে। এখন সে হাসপাতালে আমি গেলেই দ্রুত কাজ সারিয়ে দিয়ে বিদায় দেয়, কারণ উপস্থিত থাকলেই টিকটিকির মতো এদিক ওদিক তাকাই বলে। একটা গল্প বলি-
শায়লা বুকের ব্যাথা ৬/৭ বছর। এই রাজধানীতেই চিকিৎসা করানো হয়েছে। ডাক্তার বলেছে ওর হার্টের সমস্যা। এরই মাঝে রিং ও পরানো হয়েছে। আবারো ব্যাথা, এবার আর দেশে নয়, বাইরেই যাবে, একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আসবে। স্বামী হায়দারসহ যায় সিঙ্গাপুর, যাওয়ার সময় নিয়ে যায় আগের সব কাগজপত্র। ওখানকার ডাক্তাররা শায়লাকে দেখে আর কাগজপত্র দেখে জিজ্ঞেস করে এসব কার কাগজপত্র।
শায়লার কাগজপত্র শুনে ওদের মাথায় বাড়ি। শায়লার কখনো হার্টের সমস্যাই ছিলো না, ওকে রিং পরানোর তো কথাই না। আসলেও রিং পরায়নি। তাহলে শায়েলার এখানকার ডাক্তার কার এত পরীক্ষা নিরীক্ষা করালো? কাকে রিং পরালো? কোন চিকিৎসা বাবদ ৫/৬ লাখ টাকা নিলো।
শায়লারা দেশে এসে সে ডাক্তারকে বলে, মামলা করে। ডাক্তার উল্টো ভয় দেখায়, মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে বলে-
৫/৬ লাখ খরচ হয়েছে, তা ডাক্তার দিয়ে দিবে, মামলা তুলে নিতে। ঘটনা জানতে পারি স্কুল জীবনের সহপাঠীর কাছে, শুনেছি বছর খানেক আগে। ইহাকে ফুরোই গল্প ভাবলে ভুল করবেন পাঠক, এটা বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার সামান্য নমুনা।
অভ্রকে নিয়ে গেলাম আর্ট একাডেমীতে। বসে বসে গল্প হচ্ছে এক মায়ের সাথে। উনি হেলথ কমপ্লেক্সে জব করেন গ্রামে, একই প্রতিষ্ঠানে উনার স্বামীও। ম্যাডাম ২/৩ মাস পর এলাকায় যান, দুইদিন অফিস করে আবার রাজধানীতে চলে আসেন। এখানকার স্কুল কলেজে সন্তানরা লেখাপড়া করেন। সরকারি চাকরি করে ২/৩ মাসের ছুটিতে এই ভাবে, জিজ্ঞেস করায় বলেন-
“চিকিৎসা খাতে এমনটা সমস্যা হয় না, একজন না থাকলে অন্যজনে দেখেন।”
বাহ! কি মিল সবার মাঝে। শুধু ইনি নয়, এমন অনেকের মুখে শুনা যায় এমন কথা। এমন কথা শুনলে আপনারা অবাক হবেন না। আপনার আমার রাজস্বের টাকাই ওরা বেতন হিসাবে পায়, অফিস করলেই কি আর না করলেই কি? শুধু কি বেতন, বছরে তিনটা বোনাস ও আছে। চিকিৎসা খাতের ১২টা বাজতেছে বাজুক। কারো বেতন বোনাসের কিছু তো হচ্ছে না।
 সাধারণ নাগরিক সেবা পাক বা না পাক তাতে কি, এই শহর সেই শহর করতে করতে ভীনদেশী তো আছেই। এখন আবার সমালোচনা হচ্ছে কেনো বাংলাদেশের চিকিৎসা না করিয়ে লোকজন বাইরে চলে যাচ্ছে। শুধু যাচ্ছে না, দিন দিন এই সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিমালা এবং কৌশল নির্ধারণ করা নেই। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বিদেশগামীদের বিষয়ে কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা নেই।
ভারতের হেলথ সার্ভিস এক্সপোর্ট ২০১৫-১৬ জরিপে দেখা যায়, ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪ লাখ ৬০ হাজার রোগীর মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজারই বাংলাদেশের। যাদের বেশি টাকা-পয়সা বেশি, তারা ভারতে না গিয়ে চলে যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে। অপেক্ষাকৃত ভারতের হাসপাতাল গুলোতে বাংলাদেশে রোগীরা যান বেশি।
প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে কত মানুষ চিকিৎসার জন্য যায়, তার সঠিক সংখ্যা বের করার গবেষণা চলছে, দেখা যায় প্রতিবছর এই হিসাব বেড়েই যাচ্ছে। প্রশ্ন হতে পারে, এ বিপুল সংখ্যক মানুষ অর্থ ও শ্রম খরচ করে কেনো ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন?
জবাব একটাই, ভাল স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্যে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে যাচ্ছেন তারা।
চিকিৎসকদের সঠিক রোগ নির্ণয়, ভালো আচরণ, প্রয়োজনের বাইরে একগাদা টেস্ট না করানো, সর্বোপরি তুলনামূলক কম খরচে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নিশ্চিয়তা পাওয়া। রোগীর যত বড় লাইন হোক না কেন, একজন রোগীকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ ও দেখার জন্য যতক্ষণ সময় লাগবে, ততক্ষণই সেখানের চিকিৎসকরা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে এ ধরনের চিকিৎসা খুব কম বলেই এসব মানুষ ভারতে ছুটে যায়। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে পরীক্ষার কোন অভাব নাই। একটা রোগ নিয়ে যাবেন আপনাকে তারা ৮/১০ টা টেস্ট ধরিয়ে দিবেন। শুধু কি তাই? ৮/১০ টা টেস্ট দিয়ে নিচে আবার লিখে দিবেন কোথা থেকে করাবেন তাও। ডাক্তারের পছন্দের জায়গা থেকে না করালে আপনার রিপোর্ট ভুল বলতে ডাক্তারের গায়ে লাগবে না। উনারা শুধু তাই করেন না। কমিশন দেন আবার। ৮/১০ টেস্ট দিয়ে হাসি মুখে বলবেন-
“এই ঠিকানায় যাবেন, এটা দেখাইলেই ১০%/২০% কমিশন দিবে আপনাকে।”
ডাক্তার সাহেবের কথায় গলে যাই আমরা, মনে মনে বলি-
“ইসসসস ডাক্তার কতো ভালো, কমিশন দিয়েছে।”
১০% কমিশন দিয়ে ডাক্তার যে ৩টা টেস্ট বেশি করিয়ে নিলেন, তা তো কেউ টেরই পাই না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে বলেন- ‘ভারতের অন্তত ৩০০ হাসপাতালের এজেন্ট এদেশে কাজ করছে। যেসব রোগী ভারতে চিকিৎসা নিতে যান তাদের ৮০ শতাংশকেই আমরা চিকিৎসা দিতে সক্ষম। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, এর মধ্য থেকেই আমরা আমাদের চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন করছি।’
সাধারণের ক্ষমতা থাকলে যায় চিকিৎসা করায়, কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশে কোন চিকিৎসাই করাতে চান না। হুটহাট করেই উনারা চলে যান অন্যদেশে। উনাদের জন্য কি তাহলে দেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই? এটা অনেকের মনের প্রশ্ন।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব মনে করেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এটা মানসিকতার বিষয়। তবে কখনো-কখনো চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিছু চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি এখনও আসেনি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।’
অনেকের মতে ভীনদেশে না গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দেশের ভেতরের হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেন না বলেই বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার মান নিম্নগামী।
তারা যদি দেশের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন, তাহলে এখানকার ডাক্তাররা তাদের কর্মস্থলের প্রতি মনোযোগী হতেন অনুপস্থিত থাকতেন না। শুধু তাই নয়, হাসপাতালগুলোতে সেবার মান কেমন হচ্ছে তাও বুঝতে পারতেন।
এক হিসাবে বলা হয় সারা দেশে যে ১৫ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, তার অর্ধেকই ঢাকায়। এত এত চিকিৎসা কেন্দ্র, তারপরও মানুষ কষ্ট করে বিদেশ চলে যাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, এগুলোর সিংহভাগই চিকিৎসার নামে ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে চিকিৎসা গৌণ, ব্যবসা মুখ্য। সরকারি হাসপাতালগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার হাসপাতাল গুলোতেও বাংলাদেশি রোগীদের সেবা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাইরে চলে গেলেও এদেশের চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতি বছর অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যান এটা ঠিক।
আর যে কোনো স্থানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া প্রত্যেকের স্বাস্থ্যগত অধিকার। কিন্তু আনন্দ লাগে যখন খবর শুনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তারাও চিকিৎসা নিতে ছুটে যান বিদেশে। শুধু ভারতেই ২০১৬ সালে মেডিকেল ভিসা নিয়ে গেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার বাংলাদেশি। পর্যটন ভিসা নিয়ে গিয়েও অনেকে চিকিৎসা করান। থাইল্যান্ডের শুধু ব্যাংকক হাসপাতালেই প্রতি বছর হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা করাতে যান বাংলাদেশ থেকে।
লেখক : সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ