ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য

অনেকেই তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। কিন্তু  ইসলামে আল্লাহ পাক বাবা মায়ের মর্যাদা অনেক উপরে দিয়েছেন। যে বাবা-মায়ের কারণে একজন সন্তানপৃথিবীতে ভুমিষ্ঠ হয়, সেই বাবা-মাকে যারা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, তারা আর যাই হোক মানুষ নয়। পবিত্র কুরআন পাকে আল্লাহ পাক তার নিজের অধিকারের পরই পিতা-মাতার অধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন। কুরআনে কারীমে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্বব্যবহার করো। (সূরা বনী ইসরাঈল : ২৩)
ইমাম কুরতুবী (রাহ) বলেন এ আয়াতে আল্লাহপাক পিতা মাতার সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সাথে বর্ণনা করে সন্তানের ওপর তা অপরিহার্য করেছেন। যেমন  অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক নিজের শোকরের সাথে পিতা-মাতার শোকরের একত্রিত করে তা আদায় করা অপরিহার্য করেছেন। কুরআন পাকে বর্ণিত হয়েছে তোমরা আমার শোকরিয়া আদায় কর এবং পিতা মাতার (সুরা লুকমান : ১৪) এতে সুস্পষ্ট প্রতিয়মান হয় যে ইসলামে আল্লাহ পাকের ইবাদতের পর পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার সর্বধিক গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা যেমন অতি জরুরি অনুরুপভাবে পিতামাতার কৃতজ্ঞতা আদায় করাও সন্তানের জন্য জরুরি। (তাফসিরে কুরতুবী ৫/৫৭৫) এই প্রসঙ্গে হাদিস শরিফের বর্ণিত হয়েছে কোন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন সময় মত নামাজ পড়া।
তিনি আবার প্রশ্ন করলেন এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? রাসূলূল্লাহ (সা.) বললেন পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা (সহীহ বুখারী : ১/৭৬) এ হাদিস দারা প্রতিয়মান হয় যে দ্বীনের অন্যতম স্তম্ভ নামাজের পর আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কাজ হলো পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। কুরআনে কারীমে এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে আমি মানুষকে পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি। (সূরা লোকমান:১৪) উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে পিতামাতার অনুগত্য এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা সন্তানের ওপর অপরিহার্য । তবে সন্তানের ওপর পিতা মাতার অধিকার বেশি।
এ ব্যাপারে হদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে  হযরত আবু হুরায়রা (রাযি) বলেন এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন ইয়া রাসূলূল্লাহ (সা) আমার সাহচর্যে সদ্ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কে? রাসূল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে?  রাসূল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে?  রাসূল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার মাতা। সে আবার প্রশ্ন করলেন তারপর কে? রাসূল্লাহ (সা.) বললেন তোমার পিতা। অতঃপর ধারাবাহিকভাবে নিকটাত্মীয়। (সাহীহ বুখারী : ২/৮৮৩) আল্লামা ইবনে কাছীর রাহ.এ হাদিস উল্লেখ করে বলেছেন, এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানের ওপর মাতার অধিকার পিতার চেয়ে তিনগুণ বেশি। কেননা, রাসুলুল্লাহ (সা) মাতার কথা তিনবার উল্লেখ করেছেন, চতুর্থবারে পিতার কথা উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া মাতার অধিকার বেশি হওয়ায় স্বতন্ত্র কয়েকটি কারণ রয়েছে। এক. গর্ভধারণের কষ্ট। দুই. প্রসবকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গর্ভ প্রসাবের কষ্ট। তিন. দুগ্ধপান করানো এবং সন্তানের সেবা- যত্নে নিয়োজিত থাকার কষ্ট। এসব কারণ পিতার মধ্যে বিদ্যমান নেই। (তাফসীরে কুরতুবী-৫/৫৭৫)
তাছাড়া পবিত্র কুরআন পাকে মায়ের কষ্টের এসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, মাতা তাকে বড় কষ্টে গর্ভ ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছন, আর তাকে গর্ভ ধারণ করা ও দুধ ছাড়ানো ত্রিশ মাস। (সূরা লোকমান : ১৪) রাসুল (সা) বিভিন্ন হাদিস শরীফে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যেমন-হযরত আবুদ্দারদা (রাযি) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বললেন, আমার স্ত্রীকে আমার মা তালাক দেয়ার জন্য আদেশ দিচ্ছেন, তখন আবুদ্দারদা (রাযি) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বর্ণিত করতে শুনেছি, পিতা-মাতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা।
এখন তোমাদের ইচ্ছে, এর হেফাজত করো অথবা একে বিনষ্ট করে দাও। (তিরমিযী শরীফ-২/১২) অন্য এক হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, পিতা মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। (তিরমিযী শরীফ-২/১২) অন্যত্র হযরত আবু উমামা (রাযি. ) থেকে বর্ণিত হয়েছে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, সন্তানের ওপর পিতা -মাতার দায়িত্ব কী ?
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তারা উভয়েই তোমাদের জান্নাত এবং জাহান্নাম। (ইবনে মাজাহ, পৃ-২৬০) এ  হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের আনুগত্য ও সেবাযত্ন জান্নাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে অসৎ আচরণ ও তাদের অসন্তুষ্টি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। অনেকে ধারণা করে থাকে, পিতা-মাতার আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের জন্য তাদের ওলীয়ে কামেল বা সৎ ব্যক্তি হতে হবে, এমন এমন ধারণা আদৌ ঠিক নয়। এমনকি যদি কারো পিতা-মাতা অমুসলিম হয়, তাহলে তাদের সাথেও সদ্ব্যবহার করার জন্য ইসলাম জোর নির্দেশ দিয়েছে।
এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী (রোহ.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট আসলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস কলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ। আমার মা আমার নিকট দেখা করতে আসেন, আমি কি তার সাথে সদাচরণ করতে পারবো ? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ তার সাথে সদ্ব্যবহার করো। (বুখারী শরীফ-২/৮৮৪) ইসলামে পিতা-মাতার খেদমত ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব এতো বেশি যে, জিহাদ ফরযে কেফায়ার স্তরে থাকা পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহণ করা জায়েয নয়। বুখারী শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বললেন, আমি জিহাদে অংশ গ্রহণ করতে চাই, রাসূলুল্লা (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কী ? সে বললো, হ্যাঁ !
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি পিতা-মাতার সেবাযত্নে আত্মনিয়োগ করো। (বুখারী-২/৮৮৩) পিতা-মাতার খেদমত, আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা সর্বাবস্থায় সন্তানের ওপর ওয়াজিব।
-আলহাজ এ. কে.এম. মোয়াজ্জম হোসেন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ