ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দুই মাসের মাথায় ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শিলাইদহ কুঠিবাড়ী রক্ষাবাঁধ ধসে যাচ্ছে

কুষ্টিয়া : নদী ভাঙনে কুঠিবাড়ি হুমকির মুখে

খালিদ হাসান সিপাই, (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা: কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ী রক্ষা বাধ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি, নির্ধারিত পরিকল্পনাসহ নকশা লঙ্ঘন, অর্থ অপচয় এবং বরাদ্দকৃত টাকা প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় না করে অব্যয়িত রাখায় প্রায় ২’শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটি নির্মাণের মাত্র দুই মাসের মাথায় ধ্বসে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে কুঠিবাড়ী রক্ষাবাঁধ। প্রমত্ত পদ্মার ভাঙ্গন থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি রক্ষায় প্রায় ২’শ কোটি টাকা ব্যয়ে বাধটি নির্মান করেন সরকার। কয়া ইউনিয়নের কালোয়া অংশে ভয়াবহ ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে যাচ্ছে রক্ষাবাঁধ। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সেই কাজটি না করার ফলেই এমন ধ্বসের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে শুরু থেকে অভিযোগ করে আসছিল জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা। ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতির মধ্যে দিয়ে অসম্পূর্ণ প্রকল্পকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে কাগজে কলমে প্রকল্পটি হস্তান্তর করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ মিটার বাধ ভেঙ্গে নদীগর্ভে চলে গেছে। আরসিসি ব্লকসহ এই বাঁধ ধসে পড়ায় নতুন করে লোকালয় ভাঙছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙনকবলিত স্থানে ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। তবে বাঁধের আরো বড় অংশ ধ্বসে যাওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড তত্ত্বাবধায়নে “কুষ্টিয়া জেলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ী সংলগ্ন এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় পদ্মা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ” প্রকল্পের ৩ হাজার ৭২০ মিটার বাধ নির্মান করে সরকার। প্রকল্প মেয়াদ ৩১মে থাকলেও অসম্পূর্ণ প্রকল্পকে সম্পূর্ণ হয়েছে দেখিয়ে ৩০ জুন কাগজে কলমে হস্তান্তরের মধ্যদিয়ে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রক্ষাবাধ প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষনা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া। যদিও এ প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে তৈরী ১৩ লক্ষ ব্লকের মধ্যে ২ লক্ষ ৫০ হাজার ব্লক অব্যবহৃত পড়ে আছে। কিন্তু পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে দুইমাস আগে নির্মিত বাধে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউল ইসলাম স্বপন বলেন, কুঠিবাড়ি রক্ষাবাঁধের কয়া ইউনিয়নের কালুয়া অংশে হঠাৎ ভাঙ্গন দেখা দেয়। মুহুত্বেই প্রায় ৫০ মিটার বাধ ভেঙ্গে নদীগর্ভে চলে যায়। যেভাবে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, তাকে মনে হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে পুরো বাধ ভেঙ্গে নদীগর্ভে চলে যাবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, নির্ধারিত পরিকল্পনা ও নকশা বহির্ভুত, প্রয়োজনীয় সামগ্রী অব্যবহৃত রাখা, ব্যয়িত অর্থের অপচয়, অনিয়ম ও দূর্নীতির মধ্যদিয়ে অসম্পূর্ণ প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে হস্তান্তর করে প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে কুঠিবাড়ী রক্ষাবাঁধ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জানান, কালোয়া এলাকার কিছু অংশ ভেঙ্গে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার সকল কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশে তাৎক্ষনিক ভাঙ্গন রোধে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, অটো মেশিনে তৈরী যেসব ব্লক দিয়ে পার বেধেছে সেগুলি সব এখন পানির ঢেউয়ে ধুয়ে চলে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশল আরিফুজ্জামান খান বলেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া ডিভিশনের তত্ত্বাবধায়নে “কুষ্টিয়া জেলায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ী সংলগ্ন এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় পদ্মা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ” প্রকল্পের সুলতানপুর অংশে ২ হাজার ৭২০ মিটার এবং শিলাইদহ অংশে ১ হাজার মিটার সংরক্ষণ বাধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু দুই অংশের মাঝখানে ১ হাজার ৫’শ ৩০ মিটার কাজ না হওয়ার ফলে নতুন করে সৃষ্ট নদী ভাঙ্গন নির্মিত বাধ এবং শিলাইদহ কুঠিবাড়িকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে এমন কথা শিকার করেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক হস্তান্তরিত অসমাপ্ত প্রকল্পের কিছু অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং সে কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার এই নির্বাহী প্রকৌশলী। স্থানীয় শিলাইদহ ইউপি চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন তারেক বলেন, ইউপি চেয়ারম্যন হিসেবে দায়বোধ থেকে প্রকল্প নির্মাণ কাজ দেখতে মাঝে মধ্যে গিয়েছি। সেখানে কিছু কিছু অনিয়মও দেখেছি; বিষয়গুলি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের নজরে নেয়ার অনুরোধ করেছি। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে কর্মরত কাস্টোডিয়ান মুখলেচুর রহমান জানান, বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক হেরিটেজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত সাহিত্য চর্চার তীর্থ শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা প্রকৃত অর্থে কুঠিবাড়ি রক্ষার জন্যই করেছেন। কিন্তু বাস্তবে এখানে যে কাজ হয়েছে তাতে কুঠিবাড়ি রক্ষার কাজ হয় নাই। নির্মাণ কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত না করেই প্রকল্পটি ক্লোজ করে দেয়া হয়েছে। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিজেল প্লান্টের সাথে নির্মাণ কাজ সম্পন্নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েষ্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কোং এর প্রকল্প তদারককারী প্রকৌশলী রাজিব আহমেদ বলেন, প্রকল্প মেয়াদের শর্তানুযায়ী ২০১৮ সালের ৩১মে থাকলেও ৩০ জুন অসম্পূর্ণ প্রকল্পকে সম্পূর্ণ হয়েছে দেখিয়ে কাগজে কলমে দাপ্তরিক নিয়মে হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রক্ষাবাধ প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া। যদিও এ প্রকল্পের অর্থব্যয়ে তৈরী ১৩ লক্ষ ব্লকের মধ্যে ২ লক্ষ ৫০ হাজার ব্লক অব্যবহৃত পড়ে আছে। যেখানে শর্তানুযায়ী মেইন্ট্যানেন্স কাজের জন্য মাত্র ৬% রাখার কথা। কিন্তু পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে ভাঙ্গন সৃষ্টি হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। কুষ্টিয়া-৪ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য (কুমারখালী-খোকসা) আব্দুর রউফ বলেন, আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের আঁখড়ায় পরিণত কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক কোন কাজই সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় না। তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান, শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রক্ষা প্রকল্পটির বাস্তবায়নে যে সব ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও নঁকশা বহির্ভূত কাজ হয়েছে এবং অসম্পূর্ণ প্রকল্প সম্পূর্ণ দেখিয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ