ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’র সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস

ষাটের দশকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল

* তিন দফায় নাম পরিবর্তন করে এবার সেজেছে মোগল স্থাপত্যশৈলীতে
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, নামটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। ১৯৭১ সালে এখানেই দুই দফা (৯ জুন এবং ১১ আগস্ট) আক্রমণ চালিয়েছিলেন সেক্টর দুইয়ের অধীন ক্র্যাক প্লাটুন খ্যাত গেরিলারা। অত্যন্ত সফল এ দুটি অভিযানের মাধ্যমেই মূলত বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয় পুরো পৃথিবী।
১, মিন্টো রোড রমনা, ঢাকা - ১০০০ ঠিকানায় ১৯৬৬ সালে ৩০০টি কামরা নিয়ে হোটেলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের। স্থপতি উইলিয়াম বি ট্যাবলারের নকশার এ হোটেলটি আজও চমৎকার স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন। যদিও পরবর্তীতে বেশ কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে।
১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপ এটি পরিচালনা করতো। সে বছর এটি পরিচালনার দায়িত্ব শেরাটন  নিলে এর নাম হয় শেরাটন ঢাকা হোটেল। ২০১১ সালে শেরাটন ঘোষণা দেয় যে তারা তাদের কার্যক্রম শেষ করবে এবং বাংলাদেশ সরকারকে এটি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দেবে, তারপর এটির নাম হয় রূপসী বাংলা হোটেল।
২০১৩ সালে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপ পুনরায় এ দেশের  ইতিহাসের সাথে জড়িত এই হোটেলের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষনা দেয়। বিপুল কর্মযজ্ঞ শেষে ৬০ বছরের পুরনো ভবন সংস্কারের মাধ্যমে নতুন আঙ্গিকে আসছে রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’। অবকাঠামোগত পরিবর্তন এনে যুক্ত করা হয়েছে দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মোগল স্থাপত্যশৈলীর আবহ।
বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘আগামীকাল ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর দুই মাস পর থেকে হোটেলটির বাণিজ্যিকভাবে কার্যক্রম শুরু হবে। কারণ আন্তর্জাতিক মানের এ ধরনের হোটেলের নিয়মানুযায়ী, উদ্বোধনের পর কিছুদিন পরীক্ষামূলকভাবে অপারেশন করতে হয়। আশা করা হচ্ছে, পরীক্ষামূলক অপারেশনের পর দেশি-বিদেশি অতিথিদের কাছে ফের জনপ্রিয় হয়ে উঠবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা।’
সাজানো হয়েছে মোগল স্থাপত্যশৈলীতে
পর্যটন ও আতিথেয়তা সেবা খাতে নতুন আঙ্গিকে আসছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল। ‘শেরাটন হোটেল’ নামেই এটি বেশি পরিচিত। প্রায় তিন দশক পর আবার এর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল। তাই নাম বদলেছে। ১৯৮৩ সালের পর আবারও ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ নামে চালু হবে পাঁচতারকা হোটেলটি।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বাকি পাঁচতারকা মানের হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হোটেলটি সংস্কার করা হয়েছে।
অতিথিদের রুম
সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিটি রুমের আকারের পাশাপাশি বিন্যাসেও এসেছে পরিবর্তন। আগে রাজকীয় প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ৬টি থাকলেও এখন করা হয়েছে ৫টি। পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্যুট রুম ছাড়াও ডিলাক্স রুমগুলোর আয়তন আগের চেয়ে বেড়েছে। আগে হোটেলে অতিথিদের জন্য ২৭০টি রুম ছিল। সেগুলোকে ভেঙে এখন করা হয়েছে ২২৬টি। প্রতিটি রুমের আয়তন ছিল ২৬ বর্গমিটার। বড় করার ফলে একেকটি রুমের আয়তন দাঁড়িয়েছে ৪০ বর্গমিটার। নতুন টাইলস, আধুনিক স্যানিটারি উপকরণসহ প্রতিটি রুমের বাথরুমে থাকছে নতুন বাথটাব। রুমভেদে ৩২ ইঞ্চি থেকে শুরু করে ৪৮ ইঞ্চি টিভি রাখা হয়েছে। বাইরের ফুলগাছ থেকে শুরু করে ভেতরের আসবাবে রয়েছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।
ছাদে সুইমিংপুল
নতুন অবকাঠামোতে সুইমিংপুল নিয়ে যাওয়া হয়েছে হোটেলের ছাদে। এটি এখন হয়ে উঠেছে বিশালাকারের ‘ইনফিনিটি সুইমিং পুল’। থাকছে অত্যাধুনিক স্পা, জাকুজ্জি ও পুলসাইড বার।
থিমড রেস্টুরেন্টমিটিং রুম, বলরুম, রেস্তোরাঁ
আগে বলরুম ও উইন্টার গার্ডেনসহ মিটিং রুমগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়ানো-ছিটানো ছিল। সংস্কারের মাধ্যমে ২১ হাজার বর্গফুটের মধ্যে থাকবে মোট ৯টি হল। এগুলোর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে আগের গ্র্যান্ড বলরুমকে দু’ভাগ করে ‘রূপসী বাংলা উইন্টার গার্ডেন-১’ ও ‘রূপসী বাংলা উইন্টার গার্ডেন-২’ রাখা হয়েছে। আগের বলরুমের জায়গায় স্থান পেয়েছে রান্নাঘর। আছে পাঁচটি সুসজ্জিত রেস্তোরাঁ।
ক্লাব ফ্লোর লাউঞ্জসুযোগ-সুবিধা
বিশ্বের অন্যান্য দেশের পাঁচতারকা হোটেলে যেসব সুবিধা রয়েছে, সবই থাকবে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশস্ত লবি, মিনি বার, ইন-রুম চা-কফির সেবা, জামাকাপড় ইস্ত্রির সুবিধা, জাতীয় দৈনিক, ইলেক্ট্রনিক নিরাপত্তা, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ, এক্সপ্রেস চেক-ইন, বিজনেস সেন্টার, ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট, এক্সিকিউটিভ ক্লাব লাউঞ্জ, ব্যবসা কেন্দ্র, মিটিং কক্ষ, উপহারের দোকান, গাড়ি ভাড়া, লিমুজিন ও এয়ারপোর্ট শাটল সার্ভিস, ফিটনেস সেন্টার, বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের দিকনির্দেশনা সংবলিত গাইড বই। উচ্চগতির ইন্টারনেটসহ ডিজিটাল সব প্রযুক্তি ও সেবার ছোঁয়া থাকবে এই হোটেলে।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে রূপসী বাংলা
১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম এই পাঁচতারকা হোটেল‘ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল’। এর পর থেকেই বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন এ হোটেলে। তারপর ১৯৭১ সালে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এ হোটেলের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের আগে ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এ হোটেল থেকে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এই হোটেল নো ওয়ার জোন হিসেবে স্বীকৃত ছিল। তখন এ হোটেলে অবস্থান করেই বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকেরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও বিদেশি গণমাধ্যমের কেন্দ্রস্থল ছিল হোটেলটি। বাংলাদেশের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ বিশ্বব্যাপী প্রচার করে তাঁদের অনেকেই তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব-জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিবিসির বিখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালি ও সাইমন ড্রিং, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) পাকিস্তান ব্যুরোর প্রধান আর্নল্ড জেইটলিন ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদক ডেভিড গ্রিনওয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৭১ সালের ৯ জুন ও ১১ আগস্ট এখানে দুটি সফল গেরিলা অপারেশন চালানো হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৮৪ সালে এটি সরকারের মালিকানায় এবং স্টারউড এশিয়া প্যাসিফিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতে থাকে। স্টারউড এশিয়া প্যাসিফিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস ২০ বছরের জন্য হোটেলটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই সময় হোটেলটির নাম পরিবর্তন করে ঢাকা শেরাটন হোটেল রাখা হয় স্টারউডের ব্র্যান্ড নেম শেরাটনের সঙ্গে মিলিয়ে। চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে স্টারউড ২০১১ সাল পর্যন্ত হোটেলটি পরিচালনা করে। চুক্তির মেয়াদকাল শেষ হওয়ার পর ১৯ আগস্ট ২০১১ হোটেলটির মালিকানার সঙ্গে পরিচালনারও দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল)। এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। আর হোটেলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো হোটেল রূপসী বাংলা।
পরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের ৩০ বছরের চুক্তি হলে হোটেলটির সংস্কার শুরু হয়। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে সংস্কারের জন্য বিরতিতে যায় এই হোটেল। সংস্কারের কাজ শেষে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের (আইএইচএস) কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ