ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সরকার দেশের সংবিধান অমান্য করে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছে

স্টাফ রিপোর্টার: গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধান অমান্য করে দেশ চালাচ্ছে। তারা নিয়মিতভাবে আইন লঙ্ঘন করছে। সরকার দেশে যা ইচ্ছা তাই করছে। তারা নিজেরা সমাবেশ করছে। অন্যদের করতে দিচ্ছে না। তারা দেশে জমিদারি কায়েম করেছে। সংবিধানে রয়েছে কাউকে আটক করতে হলে ইউনিফর্ম পরে আটক করতে হবে। সাদা পোশাকধারীদের জনগণ ছিনতাইকারী ভেবে পিটালে তখন কি হবে? ২০১৪ সালে নির্বাচন নয়, এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা জোর করে ক্ষমতায় টিকে আছে। সরকার দেশের সংবিধান অমান্য করে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আমরা উচ্চ আদালতকে বলবো কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচার সংবিধান সম্মত না।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন এ সব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক, যুগ্ম সম্পাদক আওম শফিক উল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশতাক আহমদ, গণফোরাম নেতা সাইদুর রহমান, এ্যাডভোকেট আবদুল বাতেন, রওশন ইয়াজদানী, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আবম মোস্তফা আমিন প্রমুখ।
ড. কামাল হোসেন বলেন, অনেক মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এগুলো কারা করছে তা তদন্ত করে দেখা দরকার। গুম-নিখোঁজ শেষে যারা ফিরে আসছে তারাও মুখ খুলছে না। কেন খুলছে না? এভাবে গুম-নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সংবিধান সমর্থন করে না। এগুলোর বিষয়ে আদালতে তদন্ত হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, দেশের সংবিধানে সরকারের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা আছে। কিন্তু সরকার সেটা অমান্য করছে। সরকার সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে না। সংবিধানে বলা আছে, কাউকে আটক করা হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে সোপর্দ করতে হবে। সংবিধানের এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। আমরা এ সব বিষয়ে আদালতে যাবো। উচ্চ আদালতের কাছে আমরা আদেশ চাইবো।
এই সংবিধান প্রণেতা বলেন, সাদা পোশাকে ধর-পাকড় চলছে। সাদা পোশাকে যারা আটক করছে তারা কারা? সাদা পোশাকধারীদের ছিনতাইকারী ভেবে জনগণ যদি পিটায় কিংবা ব্যবস্থা নেয় তখন কী হবে? সংবিধানে রয়েছে কাউকে আটক করতে হলে ইউনিফর্ম পরে আটক করতে হবে। আমরা এ সব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। আমরা সংবিধানের শাসনের বাইরে চলে যাচ্ছি। মৃত ব্যক্তিকে পুলিশ ককটেল ছুঁড়তে দেখেছে, আসামীকে বাদী চেনেন না। কিন্তু মামলা হচ্ছে এগুলো আজব দেশেই ঘটতে পারে। পুলিশ যদি সরকারের অনুমতি ছাড়া এগুলো করে তাহলে সেটা গুরুতর অপরাধ। আর যদি সরকারের অনুমতি নিয়ে করে তাহলে সরকার সংবিধান অমান্য করছে। এজন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উভয়ই অপরাধী।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীদের আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, এভাবে কেন ছাত্রদের আটক করা হচ্ছে? ছাত্ররা কোটা সংস্কার চেয়েছে তারা বাতিল চায়নি। ৪৬ বছর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটার কথা বলা হয়েছিল সেটা বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। এত বছর পর কোটার দরকার আছে কি না সেটা ভাবতে হবে। সংবিধানে বলা আছে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে মূল্যায়ন করতে হবে। সংবিধানে সকলের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের পরিচয় না দিয়ে সাদা পোশাকে গ্রেফতারী পরোয়ানা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে তুলে নেয়ার বিষয় অস্বীকার করছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দও করছে না। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানবিরোধী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে দেশের আইনগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ১২ শিক্ষার্থীকে ধরার কথা প্রথমে অস্বীকার করলেও কয়েকদিন পর তাদের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করেছে। এটা কোনো সরকারি বিধান হতে পারে না।
তিনি বলেন, গত সোমবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রেসক্লাবে বিএনপির মানববন্ধন শেষে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের নমুনা না।
কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালতকে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ‘সংবিধানসম্মত হয়নি’। কর্ণেল তাহেরের বিচারের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিচার মেলানো হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে কর্ণেল তাহেরের বিচার হয়েছিল সামরিক আদালতে। কারাগারের ভেতর আদালত বসানো ঠিক না। ৪১ বছর আগের উদাহরণ টেনে কারাগারে আদালত বসানো যেতে পারে না। এভাবে কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচার সংবিধান সম্মত না। আমার ধারণা এটা বিএনপি আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে। আদালত এটার বিচার করবে। এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সরকারের ‘পক্ষে যাবে না’। আমি আদালতে গেলে এটাই বলবো, এটা সংবিধানসম্মত না। সর্বোচ্চ আদালতকে আরও বলবো সরকার বেআইনিভাবে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করছে। আমরা চাই নির্বাচন হোক। তবে নির্বাচনের জন্য যেই পরিস্থিতি থাকা প্রয়োজন বর্তমানে তার উল্টোটা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পরিবেশ দরকার। কিন্তু এখন ভয়ভীতির আশঙ্কা তৈরী হয়েছে।
ড. কামাল বলেন, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে উচ্চ চিকিৎসা দিতে হবে। দেশে যে অবস্থা চলছে তা সভ্য দেশে চলতে পারে না। এখানে অসভ্য কোনোকিছু করা হলে তা দেশের জনগণ মেনে নেবে না।
২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টের সমাবেশের বিষয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু অনুমতি পাইনি। অনুমতি না পাওয়ায় মহানগর নাট্যমঞ্চে সমাবেশ করবো। আওয়ামী লীগ তো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে। তারা করতে পারলে অন্যরা করতে পারবে না কেন? সরকার দেশে জমিদারিত্ব কায়েম করেছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। যা হবে সংবিধান ও আইন মেনে গণতান্ত্রিক উপায়ে। এটা রাজতন্ত্র না যে রাজা যা বলবে তাই হবে। এটা সংবিধানের ১৬ আনা পরিপন্থী। আওয়ামী লীগকে এই জমিদারি ভাব পরিহার করতে হবে।
আওয়ামী লীগ দশ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গণফোরাম সভাপতি বলেন, তারা নির্বাচিত হয়ে পাঁচ বছরের জন্য এসেছিল। পাঁচ বছর পর এক ‘অনুষ্ঠানের’ মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় এসে টিকে আছে।
২০ দলীয় জোটে জামায়াত আছে, এই জোটে আপনারা থাকবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যতটুকু জানি জামায়াতে ইসলামী তো এখন দলও না, ইতোমধ্যে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। জামায়াত এখন নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল না। আমার দল জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনে জোটবদ্ধ হবে না। আমাদের এ অবস্থানের বিষয়টি আমরা পরবর্তীতে আরও স্পষ্ট করবো।
সরকারের বিদায় চান কি না? -এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা জনগণ বলবে, আমি বলব কেন? জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ঐক্য তৈরির কাজ ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ