ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিলীন তিন লক্ষাধিক লোকের স্বাস্থ্যসেবা অনিশ্চিত

কে এম মকবুল হোসাইন, শরীয়তপুর : অব্যাহত পদ্মার ভাঙ্গনে প্রতিদিনই গিলে খাচ্ছে নড়িয়া এলাকার সরকারী বে-সরকারী ভবন মূলফৎগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসহ বহু লোকের সাজানো গোছানো ঘরবাড়ী। সোমবার রাতে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নতুন ভবনটির অধিকাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের একটি আবাসিক ভবনে জরুরী বিভাগ ও বহিঃ বিভাগ চালু রাখা হলেও হাসপাতালে প্রবেশের সড়কটি বিলিন হয়ে যাওয়ায় ভয়ে কোন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছে না। ফলে এ উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষাধিক লোকের স্বাস্থ্য সেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এই উপজেলার চরাঞ্চলের ৫টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক পরিবারের নারী ও শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে বেশী প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে। স্থানীয় লোকজন সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্যত্র হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করার দাবি জানিয়েছে। এদিকে হুমকির মুখে পড়েছে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরো ১১টি ভবন। এ ছাড়াও গত ৩দিনে মূলফৎগঞ্জ বাজার ও আশপাশের এলাকার অর্ধশতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্তত ৪০টি বাড়ী ঘর পদ্মাগর্ভে চলে গেছে। এর আগে মুলফৎগঞ্জ বাজারের ২শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীর, মসজিদ, গ্যারেজ ও পাশ্ববর্তী রাম ঠাকুর সেবা মন্দির বিলনি হয়ে গেছে। সরকারী হিসাব অনুযায়ী গত তিন মাসে নড়িয়া উপজেলার অন্তত সাড়ে ৪ হাজারের বেশী মানুষের ফসলী জমি, বাপ-দাদার কবর, বাড়ি-ঘর ও বহুতল ভবনসহ পদ্মায় কেড়ে নিয়েছে অনেক স্থাপনা। এসব ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ রাস্তার পাশে বা অন্যের জমিতে খুপরি ঘর তোলে ধনি, গরিব ও মধ্যবিত্তরা একই কাতারে দাড়িয়েছেন। সিমাহীন কস্টে আর চোখের জলে দিন কাটছে রাক্ষুসি পদ্মার ভাঙ্গনে স্বর্বহারা হাজার হাজার মানুষের।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, ১৯৬৮ সালে নড়িয়া উপজেলা সদরের চার কিলোমিটার দুরত্বে মুলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন পূর্ব পার্শ্বে ৩০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। ২০১৪ সালে ওই হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। হাসাপাতাল ক্যাম্পাসে জরুরী বিভাগ, বহিঃ বিভাগ ও আবাসিক ভবনসহ ১২টি পাকা ভবন রয়েছে। গত রোববার সকাল থেকে উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতালটি গ্রাস করে সর্বনাশা পদ্মা। সোমবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে নতুন ভবনটির ৭৫ ভাগ বিলিন হয়ে যায়। এই হাসপাতালটিতে গত কয়েক দিন আগেও প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষ ও শিশুরা চিকিৎসা নিতে আসতো। আগস্ট মাসের শেষের দিকে নড়িয়া সুরেশ্বর সড়কটি পদ্মায় বিলীন হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে রোগী কমতে থাকে। প্রায় এক সপ্তাহ যাবত হাসপাতালে প্রবেশ পথটিও পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এর পর হাসপাতালের পিছন দিক দিয়ে একটি সরু পথে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হলেও ভাঙ্গন আতঙ্কে কোন রোগি ভয়ে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেনা। স্থানীয়রা আরো জানায়, যেভাবে পদ্মা হাসপাতালের সীমান প্রাচীর, এর পর নতুন ভবন গ্রাস করে এখন ভিতরের দিকে ঢুকছে। এ ভাবে ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ধীরে ধীরে সবকটি ভবন পদ্মায় গিলে খাবে। হাসপাতালটি নদীগর্ভে চলে গেলে নড়িয়ার ৩ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সরে জমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনটি দ্বিখন্ডিত হয়ে অধিকাংশ পদ্মা পড়ে গেছে। পার্শ্বের ভবনগুলো নদীর তীরে রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও কোন রোগি দেখা যায়নি। হাসপাতালের সামনে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে বালু ভর্তি জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ভাঙ্গন কবলিত ক্ষতিগ্রস্তরা বসত বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছে। বাজারের পাকা দোকান গুলো নিজেদের উদ্যোগে ভেঙ্গে ইট ও রড সড়িয়ে নিচ্ছে।
কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়াম্যান ক্ষতিগ্রস্ত ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, আমরা খুবই অসহায়। আমাদের আর কিছুই অবশিস্ট নেই। হাসপাতালটি ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় এ উপজেলার লোকজনের চিকিৎসা সেবা অনিশ্চি হয়ে পড়েছে। আমরা সরকারের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে হামপাতালের কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানাচ্ছি।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মুনীর আহমেদ বলেন, সোমবার রাতে হাসপাতালের নতুন ভবনটির অধিকাংশ পদ্মা চলে গেছে। আমরা ভবনটি নিলামে বিক্রির জন্য মাইকিং করলেও কোন লোক আসেনি ক্রয়ের জন্য। হাসপাতালের আরো ১১টি ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে। সীমিত পরিসরে জরুরী ও বহিঃ বিভাগের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। তবে এখনো হাসপাতারের কার্যক্রম অন্যত্র সড়িয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াছমিন বলেন, ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় হাসপাতালের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনিয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নদীর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ