ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চাপিয়ে দেয়া রোপণ ও মাড়াই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে কেরুজ চিনিকল

এফ,এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা: ঐতিহ্যবাহী দর্শনা কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও দূরদর্শিতার অভাবে দীর্ঘ মেয়াদী ফসল আখ চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে চাষীরা। ফলে গতবারের মতো এবারও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আখ রোপণ মওসুম শুরু করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন  ব্যর্থতার দিকেই মোড় নিচ্ছে। প্রতিবার লোক দেখানো লক্ষ্যমাত্রা প্রচারের মধ্যদিয়ে আখ রোপণ ও মাড়াই মওসুম শুরু করা হলেও কোন বারই অর্জিত হওয়ার নজির নেই। গত মাড়াই মওসুমের প্রায় ৫০ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে আরো একটি মাড়াই মওসুম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষ। যতই দিন যাচ্ছে লোকসানের বোঝা ততই বাড়ছে।

আখ সরবরাহ ও টাকা উত্তোলনের বাড়তি ঝামেলা না থাকলেও কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার মূল কারণ কি? সে প্রশ্ন এখন সবার। দেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়াত্ব শিল্প কমপ্লেক্স দর্শনা কেরু অ্যান্ড কো¤পানীর চিনিকলে গত ২০১৭-১৮ রোপণ মওসুমে আখ রোপণের ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলো মিল কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ মেয়াদী এ ফসলে ক্রমাগত লোকসান ও হয়রানিতে অতিষ্ট কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাষিদের পাশাপাশি লাঙ্গল কোদাল নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সুগার করপোরেশনের নির্দেশে ঘুম থেকে উঠে ছুটেছিলো মাঠে। ২০১৭-১৮ রোপণ মওসুমে সর্বমোট ১২ হাজার ৫শ একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিলো। এর মধ্যে চিনিকলের নিজস্ব খামারে ১ হাজার ৬৪৭ একর এবং চাষিদের জমিতে ১০ হাজার ৮৫৩ একর জমিতে আখ চাষ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। ৯ হাজার ৯শ একর নতুন এবং ২ হাজার ৬শ একর জমিতে মুড়ি আখ চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাষিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো। চাষিদেরকে আখের জমিতে সার প্রয়োগ, বীজ ক্রয়, কীটনাশক প্রয়োগ, নালাকাটা, আখবাঁধা প্রভৃতি কাজের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিলো প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ প্রদানের কর্মসূচি। এতকিছুর পরেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতে হয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ। সাড়ে ১২ হাজার একর জমির স্থলে আখ রোপণ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৮৯ দশমিক ২০ একর জমিতে। গতবার রোপণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অর্ধেক হলেও আবারও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ২০১৮-১৯ রোপণ মওসুমে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার একর। গত ২৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আখ রোপণ কার্যক্রম শুরু করেন মিলের কতৃপক্ষ। সাড়ে ১২ হাজার একর জমিতে আখ রোপনের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মিলের নিজস্ব ৯টি খামারের আখ রোপনের জমি রয়েছে ১ হাজার ৬৪৫ একর জমি। পরীক্ষামূলক আখচাষের জমির পরিমাণ ১৪৫ একর। চারা আখ রোপণ করা হবে ১ হাজার ৬০ একর এবং মুড়ি আখ রয়েছে ৪৪০ একর। আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এ রোপণ কার্যক্রম চলবে। ইতোমধ্যেই মিলের ৫টি সাবজোন এলাকায় নিয়মিত শুরু করা হয়েছে আখচাষিদের সাথে উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশসহ নানামুখী আয়োজন।  ২০১৮-১৯ আখ মাড়াই মওসুম শুরু হতে পারে ডিসেম্বর মাসে। এ মওসুমে কেরুজ নিজস্বসহ চাষিদের ৬ হাজার ৫৮৯ দশমিক ২০ একর জমিতে আখ দন্ডায়মান আখ রয়েছে। যে আখের ওজন হতে পারে প্রায় ১ লাখ মেট্রিকটন। অথচ বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরশের নির্দেশনা মোতাবেক আগামী আখ মাড়াই মরসুমে ১ লাখ ৬৯ হাজার মেট্রিকটন আখের হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। মাড়াই করতে বলা হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিকটন আখ। ৩৪ মেট্রিকটন আখ বীজসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। ৯০ মাড়াই দিবসে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বেধে দিয়েছে ৯ হাজার ৪৫০ মেট্রিকটন। গত ২০১৭-১৮ আখ মাড়াই মওসুমে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশেনের নির্ধারিত বেধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৮০ হাজার মেট্রিক টন। আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৮শ মেট্রিকটন চিনি উৎপাদন করার। ৭০ মাড়াই দিবসে চিনি আহরণের গড় হার নির্ধারিত ছিলো ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। চিনি আহরণের গড় হার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও তার ধারে কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে গত মওসুমে চিনি আহরণের গড় হার ছিলো মাত্র ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ৭৮ হাজার ৫৩০ মেট্রিকটন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন হয়েছিলো ৪ হাজার ২শ মেট্রিকটন। নির্ধারিত উৎপাদনের ক্ষেত্রে কম হয়েছিলো ৪৭০ মেট্রিকটন আখ মাড়াই। চিনি উৎপাদন কম হয়েছিলো প্রায় ১ হাজার ৬শ মেট্রিকটন। করপোরেশনের কর্তাবাবুরা ৭০ মাড়াই দিবস বেধে দিলেও তা ডিঙিয়ে পৌঁছে ৮৩ দিবসে। যা লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করা হয়েছিলো ১৩ দিন। ফলে গত আখ মাড়াই মওসুমে কেরুজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ লোকসান গুনেছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এ লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই আগামী আখ মাড়াই মওসুমের প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।  

এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কেরুজ চিনিকলটি রক্ষায় কর্মকর্তাদের দক্ষতা, কর্মচারিদের আন্তরিকতা ও শ্রমিকদের পরিশ্রমি ভূমিকা প্রযোজন। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনিহার কারণেই কি গত মওসুমে এত পরিমাণ লোকসান হয়েছে কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন? সাধারণ মানুষ ঢাক-ঢোল পেটানোয় বিশ্বাসী নয়, তারা কাজে ও প্রমাণে বিশ্বাসী। অযথা সভা-সমাবেশের নামে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ মূল্যহীন বলেই মন্তব্য করেছে আখচাষিরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ