ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভনেন ডিএমপি, শোনে পুণ্যবান

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : আমাদের ডিএমপি কমিশনার অত্যন্ত সদাশয় ব্যক্তি। তিনি অবিরাম কথা বলেন, কখনও বেশ হুমকি-ধামকি দেন, বরদাশত করা হবে না জাতীয় কথা বলেন। আবার কখনও কখনও এমন সব পরিকল্পনার কথা বলেন যা শুনে আহ্লাদিত হয়ে উঠি। এই সম্প্রতিকালে তিনি অনেকগুলো কথা বলেছেন। বলেছেন, ঢাকা শহরে লেগুনা চলবে না। কোনো সন্দেহ নেই মহাসড়কগুলোতে লেগুনা এক বিরাট জঞ্জাল। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় যে দশ-পনেরজন করে লোক মারা যান, তার জন্য অনেক ক্ষেত্রে এ বেপরোয়া লেগুনা দায়ী। সুতরাং কমিশনার সাহেব যদি হাইওয়ে থেকে লেগুনা তুলে দেয়ার কথা বলতেন তাহলে সেটা অনেক যৌক্তিক হতো। কিন্তু তিনি প্রথমেই পড়লেন ঢাকা শহর নিয়ে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে লেগুনা চলাচল করে। এসব রুটে বাস চলে না। আর বাসের যে হাল সেটা কমিশনার সাহেব আমাদের চেয়ে কম জানেন না। বাসে কোনো শৃঙ্খলা নাই, যখন তখন যাকে-তাকে চাপা দেয়। একটার পথ আটকে আরেকটা দাঁড়ায়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ধারণা করা হয়েছিল যে, সড়কে এ অরাজকতা বন্ধ হবে। কিন্তু রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে দেখি সে অরাজকতার মাত্রা যেন আরো বেড়ে গেছে। লেগুনা চলে ঝিগাতলা থেকে ফার্মগেট, নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালী। এমনি চিপাচাপা রুটে। প্রধান সড়কে যে একেবারে তারা উঠে না এমন নয়। প্রধান সড়ক দিয়ে তাদের আসতে হয়। তবে এই লেগুনা হাজার হাজার যাত্রী পারাপার করে। প্রতিদিন অফিস ও স্কুল-কলেজগামী হাজার হাজার মানুষ শিক্ষার্থী লেগুনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন লেগুনা বন্ধ। রিকশাওয়ালা লেগুনার ১০ গুণ ভাড়া নেন। সেটি দেবার সাধ্য অল্প সংখ্যক মানুষেরই আছে। 
লেগুনার সমস্যা অনেক। এগুলোর কোনো ফিটনেস নেই, অর্ধেক গাড়ি ভেঙে চূরে একাকার। হেডলাইট ব্যাক লাইট নেই, গাঁদাগাঁদি করে ১৪ জন বসে, ২ জন দাঁড়িয়ে যায়। এটাই লেগুনার চেহারা। এর চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অনেক সময় ১০-১২ বছরের বালকরাও এ লেগুনা চালায়। তাদের চালনা অত্যন্ত বেপরোয়া। কোথায় কখন কিভাবে টার্ন নেবে সেটা বলা যায় না। ফলে দুর্ঘটনা অবধারিত, গাড়ির গায়ে ধাক্কা মেরে চলে যায়। বলবার কিছু থাকে না। যদি লেগুনা একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে এর বিকল্প একটা কিছু সামনে আনা দরকার ছিল। সেরকম ব্যবস্থা ঢাকা মহানগরীর সড়কে নেই। ফলে লেগুনা বন্ধ করায় হাজার হাজার যাত্রী বিপাকে পড়েছে। কিন্তু লেগুনা বন্ধ হয়েছে, সড়কে দুর্ঘটনা বন্ধ হয় নাই। বেপরোয়া যান চলাচল বন্ধ হয় নাই। উগ্র ওভারটেকিং বন্ধ হয় নাই। যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা বন্ধ হয় নাই। অর্থাৎ পুলিশের খবরদারি ওই লেগুনা পর্যন্তই। লক্কর-ঝক্কর বাস সেগুলোর রোয়া ওঠা বডি কোনো কিছুর দিকে পুলিশ নজর দিতে পারে না কিংবা দেয় না। যেসব বাস রাজধানীতে চলাচল করে তার অর্ধেকের বেশিতে কোনো হেড লাইট, ব্যাক লাইট বা ইন্ডিকেটর নাই। কখন যে কাকে চাপা দিয়ে যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এগুলো নির্বিঘেœ চলছে, এই অরাজকতা যদি চলতেই থাকে তাহলে লেগুনা বন্ধ করার যৌক্তিকতা কি?
আর দেখলাম, ট্রাফিক সপ্তাহে হাজার হাজার মোটর সাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা  দেয়া হলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চালকের হেলমেট হ্যান্ডেলে রাখা। অতএব, মামলা। কোনো ক্ষেত্রে পেছনের যাত্রীর মাথায় হেলমেট নেই অতএব মামলা। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে হেলমেট মাথায় পরা না থাকার জন্য এক অতি প্রবীণ নাগরিককে তিরস্কার করছেন। আবার সেই ওবায়দুল কাদেরকেই দেখলাম এমন একটি মোটর সাইকেলে চড়ে যাচ্ছেন, যার চালকেরও হেলমেট নেই, আর ওবায়দুল কাদেরেরও মাথায় হেলমেট নেই। আপনি আচরি ধর্ম অপরকে শেখাও। এসব বিদ্যা ওবায়দুল কাদের সাহেবরা কখনো অর্জন করেননি। সেই ধারাবাহিকতা নিচের দিকে নেমে এসেছে। বাসওয়ালাদের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেন না। কারণ বাসের মালিকরা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের গাড়ি আটক করার ক্ষমতা কার? আর সে কারণেই ট্রাফিক সপ্তাহের যাদের কোনো মামা নেই সেই মোটর সাইকেল আরোহীদের ওপর চড়াও হয়েছিল পুলিশ।
কমিশনার সাহেব আরেক কথা বলেছেন। এখন থেকে বাস স্টপেজ ছাড়া বাস থামবে না। কিন্তু ১০ মিনিটের জন্য এই মহানগরীতে তিনি সেই আইন কার্যকর করতে পারেননি। শহর জুড়েই বাস স্টপেজ। হাত তুললেই বাস থামে। কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাসচালকরা যাত্রী খোঁজে। ততক্ষণে আরেকটি বাস সামনে দাঁড়ায়। রাস্তায় জ্যামের সৃষ্টি হয়। একদিনও দেখলাম না, কোনো ট্রাফিক পুলিশ কোনো বাস চালককে এজন্য শাস্তি দিচ্ছেন কিংবা জরিমানা করছেন।  অফিস আসতে বিজয় সরণীর মোড়ে অনেক সময় বেশকিছুক্ষণ দাাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তখন যে দৃশ্য দেখি, তাতে মন বিষণœ হয়ে ওঠে। চতুর্দিকে ট্রাফিক থামিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য একদিক চালু রাখা হয়। আর দেড়টনি ট্রাক আটকানোর জন্য দৌড়াতে থাকে ট্রাফিক পুলিশ। তারপর কিছু লেনদেন হয়। দেড়টনি ট্রাকচালক হাসিমুখে চলে যায়। চতুর্দিকে গাড়ি হর্ন বাজাতে থাকে, ট্রাফিক পুলিশ ব্যস্ত থাকে তার নিজস্ব কাজে। নির্ধারিত স্টপেজে একটি গাড়ির পেছনে আরেকটি গাড়ি দাঁড় করানো যে দায়িত্ব সে দায়িত্ব পালনে তাদের তৎপর দেখা যায়নি, দেখা যায় না। তাহলে কমিশনার সাহেবের কথার কি গুরুত্ব রইল। এটা তো খুব ভালো ব্যবস্থা ছিল যে, বাস স্টপেজে দাঁড়াবে বাস, সেখানে যাত্রীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবেন, একে একে বাসে উঠবেন। দাঁড়িয়ে যেতে কোনো অসুবিধা নাই। সারা দুনিয়ার বাসেই দাঁড়িয়ে যাবার ব্যবস্থা আছে। যাত্রীরা দাঁড়িয়ে যেতে প্রতিবাদ করেন না। কিন্তু সে ব্যবস্থা তো কোথায়ও দেখলাম না। অথচ ১৯৭২-৭৫ সালে চরম অরাজকতার সময়ও আমরা দেখেছি বাস স্টপেজে বাস দাঁড়ায়। হাত তুললেই স্টপেজ পাওয়া যায় না। দিনে দিনে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এখন কমিশনার সাহেবের ঘোষণায় বাস চালকরা কোনো পরওয়াই করে না কিংবা তিনি একটি ভাল ঘোষণা দিয়ে নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলে তা বাস্তবায়ন হলো কি না, সেটি আর খোঁজ নিয়ে দেখলেন না। কমিশনার সাহেব পায়ে হেঁটে চলেন না। আর তার গাড়িরও অসম্ভব কড়াকড়ি প্রটোকল। কমিশনার সাহেবের গাড়ি যাবে, সে রাস্তা আধা ঘন্টা আগে থেকে ক্লিয়ার করে রাখা হয়। অর্থাৎ চলতি পথেও তিনি দেখতে পান না যে, সড়কে কি ঘটছে। অথচ যদি এরকম নিয়ম করা যেতো যে সপ্তাহে অন্তত এক দিন এই সাহেবরা পায়ে হেঁটে সরেজমিনে সড়ক পরিদর্শন করবেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অর্ডার দেবেন কিংবা দাঁড়াবেন কোনো ট্রাফিক মোড়ে, কি ঘটছে দেখে নেবেন। তারপর বলবেন এই করা যাবে, এই করা যাবে না। এটি একটি কষ্ট কল্পনা মাত্র। সাত মণ ঘিও জুটবে না, রাধাও নাচবে না।
ঢাকা শহরে ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম। এক নম্বর নিকৃষ্টতম নাকি নেপাল! আবার পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট সড়ক নেপালে। বাংলাদেশ দ্বিতীয় নিকৃষ্ট। সেই এক নম্বর নিকৃষ্ট দেশ নেপালে সড়কে সিগন্যাল বাতি মানে সবাই। সেখানে রাস্তার মোড়ে ডজন ডজন ট্রাফিক পুলিশ ভিড় করে থাকে না। হলুদ বাতি জ্বললে গাড়ি থেমে যায়, সবুজ বাতি জ্বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। তারপর ট্রাফিক আছে কি নেই গাড়ি সামনে এগিয়ে যায়। অন্তত এইটুকু শৃঙ্খলা নেপালের মতো দেশেও আছে। কিন্তু আমাদের দেশে আজব কা-! সবুজ বাতি জ্বললেও ট্রাফিক পুলিশ হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে রাখে। লাল বাতি জ্বললে গাড়ি চলবার সিগন্যাল দেয়। একি হীরক রাজার দেশ! এ কেমন খামখেয়ালি? অথচ এটাই চলে আসছে। সত্যাসত্য জানি না, তবে শুনেছি সিগন্যাল বাতির দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের, ট্রাফিক পুলিশের নয়। সিটি কর্পোরেশন আর ট্রাফিক পুলিশের দ্বন্দ্বে ইলেট্রনিক সিগন্যালগুলো অর্থহীন শো-পিসে পরিণত হয়েছে। র‌্যাংগস ব্রিজের ওপরে সেই কারণে সারাক্ষণ দীর্ঘ জ্যাম লেগে থাকে। এই ওভার পাস বা ব্রিজে উঠলে ধরে নিতে হবে যে পার হতে অন্তত আধা ঘণ্টা লাগবে।
পুলিশ কর্তা ঘোষণা দিলেন, জাহাঙ্গীর গেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এখন থেকে ইলেকট্রনিক সিগন্যাল পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। এই পথে সাতটি মাত্র সিগন্যাল। যেদিন তিনি এই ঘোষণা দিলেন পরদিনই বিজয় সরণীর মোড়ে গিয়ে পুরনো চিত্রই দেখলাম। সবুজ বাতি জ্বলছে। ট্রাফিক পুলিশ হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ কর্তা যা বলছেন তা কি তবে ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবলদের জন্য নির্দেশনা হচ্ছে না, সার্জেন্টরা কি তা অবহিত হচ্ছেন না? তা যদি হতেন, তা হলে তারা নিজে থেকেই কমিশনার সাহেবের ঘোষণা বাস্তবায়ন করতেন। কিন্তু সে দিল্লী দূর অ¯্Í। আর সেই কারণে এসব ঘোষণা কোনো অর্থ বহন করে না। তাই যদি করত তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে খুব বেশি সময় লাগতো না। কমিশনার সাহেবরা তো অবিরাম কথা বলেই যাচ্ছেন। কোন কথাটা কেন বলছেন, সেটি বুঝে ওঠা কঠিন। দায়িত্ব তার। কিন্তু সেই দায়িত্ব তিনি যেন কার ওপর ঠেলে দেবার চেষ্টা করছেন।
 গত শনিবার ডিএমপি কমিশনার বললেন, অনেক সময় প্রভাবশালীদের কারণে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। তিনি বললেন, আইন কেউ মানতে চায় না। আইন প্রয়োগ করতে গেলে অনেক সময় চাপ সহ্য করতে হয়, অনেক সময় পেছন থেকে টেনে ধরতে চায়।  কখনো আমরা সেটা উপেক্ষা করতে পারি, কখনো আমাদের সেটা আপোস করতে হয়। পথচারী আইন মানে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও আইন মানে না। কেউ যেখানে আইন মানে না, তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা কীভাবে ফিরে আসবে। এটিও কম উল্লেখযোগ্য কথা নয়। প্রভাবশালীদের যদি আইন মানানো না যায় এবং সেখানে যদি পুলিশকে আপোস করতে হয়, আর সে দৃশ্য যে পথচারী দেখবে সেই বা কেন আইন মানবে? আপনি যদি একজন সচিবের গাড়িকে উল্টো পথে আসতে দেন তাহলে তার পেছনে যদি আরো চারটি গাড়ি আসে, তবে কোন নৈতিক বলে ওই চারটি গাড়িকে আটকে দেবেন? এই চাপ উপেক্ষা করতে হবে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তানা হলে শুধু লেগুনা বন্ধ করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ