ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘নাশকতার পরিকল্পনা’র নামে সক্রিয় বিরোধী নেতা-কর্মীদের ‘মামলাবন্দী’ রাখার টার্গেট

সরদার আবদুর রহমান : আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে একতরফা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন সরকার কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বলে জানা গেছে। এর আওতায় ‘নাশকতার পরিকল্পনা’র নামে বিরোধীজোটের সক্রিয় সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে ‘মামলাবন্দী’ রাখার টার্গেট করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে নিত্যনতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। এসব মামলায় কোথাও সুনির্দিষ্ট নামে আবার কোথাও শত শত ‘অজ্ঞাত’ আসামী হিসেবে এসব মামলার ফাইল চালু করা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রায় প্রতিদিনই বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সারা দেশে হিড়িক চলছে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারের। বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীদের বাসায় না পেলে তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী- এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। সরকারি তরফে ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিজেদের ‘অনুকূল’ রাখতে এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানা গেছে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিরোধী নেতাদের নামে দায়ের করা মামলার গতি-প্রকৃতিও বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে এবং যারা ‘নাশকতা করতে পারে’ বলে সন্দেহ করা হয় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নতুন শত শত মামলায় আসামী ৮০ হাজার : বিরোধীপক্ষের জোরালো কোনো কর্মসূচি না থাকলেও সারা দেশে চলছে ধরপাকড়। ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে থেকে এ পর্যন্ত শুধু বিএনপি ও অঙ্গ দলের দেড় হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিএনপি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১২ শতাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এতে নাম ধরে ও অজ্ঞাত হিসেবে প্রায় ৮০ হাজার লোককে আসামী করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের জামিনও মিলছে না সহজে। জামিন পেলেও কারাফটক থেকে শ্যোন এরেস্ট দেখানো হচ্ছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা কারাগারে রয়েছেন তাদের জামিন মিলছে না সহজে। যারা মুক্ত ছিলেন তাদের জামিনের মেয়াদ না বাড়িয়ে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। পুরনো মামলাগুলোও সক্রিয় করা হচ্ছে। নাশকতার পরিকল্পনা, গোপন বৈঠক, অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাখা প্রভৃতি অভিযোগ তুলে এসব আটক অভিযান চলছে। নিত্য-নতুন মামলার পাশাপাশি পুরনো মামলারও আসামী হিসেবে দেখানো হচ্ছে গ্রেফতারকৃতদের। সূত্রে জানা গেছে, বিএনপিসহ সরকারের বিরুদ্ধে থাকা দলগুলোর নেতাদের নামে দায়ের করা পুরনো মামলা সচল করার ওপর বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে।
আগাম মামলা দায়ের : দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটনা না ঘটলেও বিভিন্ন থানায় অগ্রিম মামলা দায়ের করে হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামী করে রাখার মতো ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে বলে তথ্যে জানা গেছে। বিদেশে অবস্থানরত বা পবিত্র হজ¦ পালনে সৌদি আরবে অবস্থানকারী, এমনকি মৃত ব্যক্তির নামও যুক্ত করা হচ্ছে আসামীর তালিকায়। বিগত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় নাশকতার অভিযোগ এনে বিভিন্ন জেলায় ‘ভুতুড়ে’ মামলা করে রাখার কথা জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতেই থানায় থানায় গোপনে এভাবে মামলা করে রাখা হয়েছে, যাতে নির্বাচনের আগে-পরে প্রতিপক্ষের লোকজনকে এসব মামলায় ফাঁসানো যায়। যেসব স্থানে মামলা হয়েছে, সেখানে কোন সহিংসতা ছিল না, অথচ মামলা করে রাখা হয়েছে। এসব মামলায় কয়েক হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করে রাখা হয়েছে।
কমিটির তালিকা ধরে মামলা আসামী : বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটির তালিকায় নাম থাকা নেতাদের নামেও মামলা দায়ের ও আসামী করার কথা জানা গেছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর কমিটির তালিকা ধরে ধরে নতুন মামলাগুলোতে আসামী করা হচ্ছে। আর আসামীদের তালিকা ধরে চালানো হচ্ছে গ্রেফতার অভিযান। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এভাবে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সক্রিয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদেরকে ‘মামলাবন্দী’ করে ফেলা হচ্ছে। এভাবে এদেরকে ‘অপরাধী’ হিসেবে তালিকাভূক্ত করার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগে প্রকাশ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করা হচ্ছে, এর বাইরে কোনো গ্রেফতার নেই।
দৌড়ের ওপর রাখার কৌশল : রাজনৈতিক সূত্রগুলো থেকে বলা হচ্ছে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধলক্ষ মামলা আছে এবং দিন দিন এ মামলার সংখ্যা বাড়ছে। এসব মামলায় লাখ লাখ নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে। গত কয়েক বছরের চিত্রে দেখা যায়, বিরোধী জোটের প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয়, জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের এমন নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না- যাদের নামে মামলা নেই। প্রতিদিনই কোন না নেতা গ্রেফতার হয়ে চলেছেন। দৌড়ের ওপর আর আত্মগোপনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর এটাই সরকারের কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল দু’টিকে ধ্বংস করার জন্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হয়ে দায়েরকৃত মামলাগুলো এখন দ্রুত বিচারকার্য সমাধা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। আদালতে লড়াইরত আইনজীবী, ভুক্তভোগী বিএনপি-জামায়াত নেতৃবৃন্দ প্রমুখদের ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকার চাচ্ছে মামলার খড়গ ও শাস্তি দিয়ে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে। তারা জানান, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা থাকার কারণে তারা প্রতিনিয়ত পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মামলায় জামিন নিতে গিয়ে তারা গলদঘর্ম হচ্ছেন। কোনো কোনো নেতাকে সপ্তাহে অন্তত চার দিন আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। মামলা ছাড়াও পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকিতে তারা দিশেহারা।
বিরোধী নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, পুলিশের সন্দেহ মোতাবেক যে ব্যক্তি ‘নাশকতা করতে পারে’- এই অনুমাননির্ভরতাই পুলিশের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ‘ধারণা’কে তারা সরকারের ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ