ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নাগরিকত্ব তালিকা থেকে বাদপড়াদের বাংলাদেশে বহিষ্কার করা হবে

বিবিসি বাংলা : ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করল যে আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা বা এনআরসি থেকে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের বাংলাদেশেই ডিপোর্ট করা হবে।
বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব গত সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে এনআরসি বিষয়ক এক আলোচনা সভায় তাদের এই নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন।
সেখানে তিনি বলেন, এখানে আমাদের পরিকল্পনা হল তিনটে ডি- ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। অর্থাৎ প্রথম ধাপে অবৈধ বিদেশী কারা, তাদের শনাক্ত করা হবে (ডিটেক্ট) - যেটা এখন চলছে।
তারপর ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে (ডিলিট)। আর তারপর আমরা তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করব।
এর আগে বিজেপির শীর্ষ স্তরের কোনও নেতাই এত স্পষ্টভাবে এনআরসি থেকে বাদ-পডা লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেননি।
ওই একই আলোচনাসভায় হাজির ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও। তিনি মন্তব্য করেন, অবৈধ বিদেশিদের খুঁজতে আসামের পর এবার সারা ভারতেই এনআরসি প্রক্রিয়া চালু করা উচিত।
রাম মাধব যখন ডিপোর্ট করার কথা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী সোনোওযাল-সমেত সভায় উপস্থিত বিজেপির শীর্ষ নেতারা ও শ্রোতা-দর্শকরা টেবিল চাপড়ে ও তুমুল করতালিতে সেই মন্তব্যকে স্বাগত জানান।
বস্তুত রাম মাধব অবৈধ বিদেশিদের যেভাবে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেছেন, তাতে পরিষ্কার বিজেপির মধ্যে বিষযটি নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক ভাবনাচিন্তা হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, সেখানে কীভাবে আপনি এই লোকগুলোকে ডিপোর্ট করবেন? আরে, বন্ধু তো আপনাদের সবাই - তাই বলে কি তাদের যে সব লোকজন অবৈধভাবে এখানে আছেন তাদের কি ফেরত পাঠানো যাবে না?
আরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের দিকেই তাকান না। বাংলাদেশ নিজেরাই তো লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সে দেশের সঙ্গে সক্রিয আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। সৌদি আরবও সে দেশে থাকা অবৈধ পাকিস্তানী, বাংলাদেশী বা ভারতীযদের মাঝ মাঝেই ফেরত পাঠায়। কাজেই ডিপোর্ট করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই।
ভারত সরকার বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিষযটি ঠিকই কূটনৈতিক দক্ষতায় ম্যানেজ করে নিতে পারবে বলেও তিনি দাবি করেন।
রাম মাধব বিজেপির নিছক একজন সাধারণ সম্পাদক মাত্র নন - দলের কাশ্মীর নীতি থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের নীতি, সবই তিনি দেখাশুনো করেন। রাষ্ট্রীয স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সঙ্গে বিজেপির প্রধান সেতুও তিনি।
বিজেপির পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও দলের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি ও কর্মকা-ও পরিচালিত হয় রাম মাধবের নির্দেশে।
বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বা এইচ টি ইমাম, জাতীয পার্টির প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ কিংবা জাকের পার্টির নেতা আমির ফয়সল মুজাদ্দেদি - দিল্লিতে যারাই আসুন না কেন, রাম মাধবের সঙ্গে তারা দেখা করবেন ধরেই নেওযা যায়।
দিল্লিতে রাম মাধব ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন নামে যে থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত, বাংলাদেশের নেতা-মন্ত্রী-নীতি নির্ধারকরাও সেখানে নিয়মিতই বিভিন্ন আলোচনাসভা বা সেমিনারে যোগ দিয়ে থাকেন।
এই কারণেই রাম মাধব যখন এনআরসি থেকে বাদ পডা লোকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেন, সেটাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হয়।
বস্তুত এটা যে তার কোনও ব্যক্তিগত দাবি নয, বরং বিজেপির সুচিন্তিত মতামত, সেটাও তিনি সোমবার সভার পর একান্ত আলোচনায় স্পষ্ট করে দিযেেছন।
তবে এনআরসি থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাটা ভারত সরকারেরও নীতি কি না - দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয স্পষ্টতই এ প্রশ্নের জবাব এডযিে যাচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলছি।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিন্দেশে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া যে এখনও শেষ হয়নি এবং খসড়ায় যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা যে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার আরও অনেক সুযোগ পাবেন সেটাও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে।
এই মুহুর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের বলার নেই, জানাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
তার কথা থেকে এটা পরিষ্কার, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার কথা পরিষ্কার করে বললেও ভারত সরকার এখনই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছে না।
ভারতে জুলাই মাসের শেষে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি)-র যে দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে রাজ্যের প্রায় চল্লিশ লক্ষ বাসিন্দার নাম বাদ পড়েছে।
সরকার যদিও বলছে, এরা সবাই আবার আপিল করার বা নথিপত্র জমা দেয়ার সুযোগ পাবেন। তারপরেও যদি এনআরসি-তে তাদের নাম না-ওঠে, তাহলেও তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে যাওয়ার অবকাশ থাকবে।
কিন্তু এই সব প্রক্রিয়ার শেষেও আসামের বেশ কযকে লক্ষ লোক অবৈধ বিদেশি হিসেবেই চিহ্নিত হবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
বিজেপি এই লোকজনদেরই এখন বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলছে - যদিও বাংলাদেশ সরকার অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা এদের বাংলাদেশী নাগরিক বলে মনে করে না, আর তাই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ারও কোনও প্রশ্ন নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ