ঢাকা, বুধবার 12 September 2018, ২৮ ভাদ্র ১৪২৫, ১ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রখ্যাত সব হীরক খণ্ড

আখতার হামিদ খান : হীরা বা ডায়মন্ড আজ আর হানাহানির জন্ম দেয় না। এক সময় হীরা ছিল পৃথিবীর তাবৎ রত্ন ভাণ্ডারের সম্রাজ্ঞী। মধ্যযুগের রাজা বাদশা থেকে শুরু করে আমীর সওদাগর সকলেই কামনা করতেন কিছু সুদৃশ্য হীরকখণ্ড যেন তার দখলে থাকে। যেন তার হস্তগত হয়। হীরক খণ্ডের দখল নিয়ে বাদ-বিসম্বাদ, হানাহানি কম হয়নি। এই রত্নের উপর মানুষের দুর্বলতার অন্যতম কারণ এর দুষ্প্রাপ্যতা। এছাড়া আছে এর দ্যুতি, সৌন্দর্য এবং সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের সঙ্গে হীরাকে জড়িয়ে প্রচলিত নানা উপকথা। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম উপায়ে হীরা উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। ফলে এ রত্নের দাম কমেছে। সহজলভ্য হয়েছে। একে ঘিরে রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। তবুও প্রাকৃতির হীরার প্রতি মানুষ নির্মোহ হতে পারেনি। আর যেসব হীরকখণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস সেসব রত্নরাজি ইতিহাসের পাত্র-পাত্রীদের মতই বিখ্যাত। আজকের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রস্থল মানুষের এ আগ্রহকে বিবেচনা করে বিচিত্রা পাঠকদের জন্য ১০টি বিখ্যাত হীরকখণ্ডের কথা এখানে তুলে ধরা হল।
কোহিনূর (আলোর পাহাড়)
এ বিখ্যাত রত্ন সম্পর্কে প্রথম জানা যায় ১৩০৪ সালে। তখন এর আকৃতি ছিল ডিমের মত, ওজন ১৯৩.৯৩ ক্যারেট। এই রত্ন শোভা পেত মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজ-মুকুটে। মুঘলদের এই রত্ন এখন ব্রিটিশ রাজ মুকুটের প্রধান মণি হয়ে আলো ছড়াচ্ছে। ব্রিটিশদের হস্তগত হওয়ার পর এই হীরকখণ্ডের উপর আরও কাট-ছাঁটের কাজ চলে। এখন কোহিনূরের ওজন ১০৫.৬০ ক্যারেট।
দ্য গ্রেট স্টার অব আফ্রিকা (আফ্রিকার নক্ষত্র) 
বৃহৎ এই হীরকখণ্ড পাওয়া গিয়েছিল আফ্রিকার খনিতে। ৫৩০.২০ ক্যারেট ওজনের এই হীরকখণ্ড সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম, বড় কাট-ডায়মন্ড। এ হীরকখণ্ডের রয়েছে ৭৪টি তল। এটিও এখন ব্রিটিশ রাজ পরিবারের রতœ সম্ভারের অংশ।
দ্য সেঞ্চুরি ডায়মন্ড 
১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে আবিষ্কৃত এ হীরকখণ্ডের ওজন ৫৯৯.১০ ক্যারেট। আবিষ্কারকালে এ ওজন ছিল। পরে প্রখ্যাত রতœকার গবি তোলকভস্কি একে কেটে ছেঁটে এক অতীব সুন্দর দুর্লভ রত্নে পরিণত করেন। এ কারণে ‘ সেঞ্চুরি’ কে ওজন হারাতে হয় অনেকখানি। ২৪৭টি তল নিয়ে এর ওজন এখন ২৭৮.৮৫ ক্যারেটে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থলতা কমায় সে হয়ে উঠেছে মোহিনী। সেঞ্চুরি ডায়মন্ড প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৯৯১ সালে লন্ডন টাওয়ারে।
দ্য রিজেন্ট
রিজেন্ট সর্বার্থে এক ঐতিহাসিক রত্ন। এক ইন্ডিয়ান ক্রীতদাস এই রত্ন আবিষ্কার করেছিল গোলেওন্ডার কাছে। ওই সময় এর ওজন ছিল ৪১০ ক্যারেট। এরপর কি করে যেন এ রত্ন ইংল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিটের দখলে চলে যায়। এরপর এই হীরকখণ্ডকে কেটে ছেঁটে ১৪০.৫০ ক্যারেটের এক স্মার্ট ডায়মন্ডে রূপান্তর করা হয়। ১৭১৭ সালে এই রত্ন ডিউক অব অরলেন্সের কাছে বিক্রি করা হয়। অরলেন্স ছিল একটা ফরাসী রিজেন্ট, ১৭১৭ সালে পঞ্চদশ লুই ছিলেন এক বালক।
ডিউক অব অরলেন্স
এ হীরার মালিক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি পিট নামে প্রচলিত ছিল। উিউক এ রত্নের পুনঃনামকরণ করেন ‘রিজেন্ট’। পঞ্চদশ লুই-এর অভিষেক কালে রিজেন্ট শোভিত মুকুট তার মাথায় পরিদেয় দেয়া হয়। ফরাসী বিপ্লবের পর এর মালিকানা যায় নেপোলিয়ানের হাতে। নেপোলিয়ান তার তরবারির বাঁটে একে স্থাপন করেন। এই হীরকখ- এখন প্যারিসের ল্যুভারে প্রদর্শনের জন্য রক্ষিত আছে।
দ্য ব্লু হোপ
এই হীরার যত নামধাম সবই কুখ্যাতি থেকে অর্জিত। এই হীরকখণ্ড এক সময় চতুর্দশ লুই-এর মুকুটের শোভা ছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘দ্য ব্লু ডায়মন্ড অব দ্য ক্রাউন’। ফরাসী বিপ্লবের সময় এই হীরা চুরি হয়ে যায়। ১৮৩০ সালে এটি লন্ডনে দেখা যায়। তখন এর মালিক থমাস হোপ নামে এক ব্যক্তি। থমাস হোপের নামানুসারেই এ রত্নের বর্তমান নাম। এ রত্নের অধিকারী হয়ে হোপ পরিবার নিদারুণ দুর্দশায় পড়ে। দারিদ্রের কষাঘাতে হোপ পরিবারের সকল সদস্যের মৃত্যু হয়। এর পরবর্তী অধিকারীর ভাগ্যেও বিপর্যয় নেমে আসে। এডওয়ার্ড ম্যাক্সলেন যখন এর মালিক তার পরিবারের সকল সদস্য দুঃখকষ্টে মারা যান। এরপর এর মালিক হন হ্যারী উইস্টন নামে এক ভদ্রলোক। তিনি এই হীরা বিক্রি করে ব্যর্থ হয়ে ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটকে দান করে দেন। এই রত্ন এখনো ওখানেই আছে। এর ওজন ৪৫.৫২ ক্যারেট।
দ্য স্যানসি
এই হীরকখণ্ডের প্রথম মালিক ছিলেন বার্গান্ডির ডিউক চার্লস দ্য বোল্ড। ১৪৭৭ সালে এক যুদ্ধে তিনি এ রত্ন হারিয়ে ফেলেন। এর ওজন ৫৫ ক্যারেট। এ রতেœ নামকরণ করা হয় এর পরবর্তী মালিক সিগনেউর দ্য সেনসির নামানুসারে। ষোঢ়শ শতকের শেষদিকে সেনসি তুরস্কে ফরাসী দূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি এই হীরা ফরাসী রাজা তৃতীয় হ্যানরীকে ধার দেন। রজাা তৃতীয় হেনরী তার টুপিতে এটি পরিধান করতেন। চতুর্থ হ্যানরিও সেনসির কাছ থেকে এটি ধার নিয়েছিলেন। পরে ১৬৬৪ সারে এই হীরা বেচে দেয়া হয় ইংল্যান্ডের প্রথম জেমসের কাছে। ১৬৮৮ সালে দ্বিতীয় জেমস এই রতœ সঙ্গে করে প্যারিসে পালিয়ে আসেন। ফরাসী বিপ্লবের পরপর এর রত্ন হারিয়ে যায়।
দ্য টেলর বারটন
এই হীরকখণ্ডের ওজন ৬৯.৪২ ক্যারেট। ১৯৬৯ সালে এক নিলামে এটি বিক্রি হয়। শর্ত থাকে যে- ক্রেতা এর নতুন নামকরণ করতে পারবেন। কারটিয়ার অব নিউইয়র্ক সর্বোচ্চ মূল্যদাতা হিসেবে এটি কিনে নেয়। এবং এর নামকরণ করে প্রতিষ্ঠানের নামানুসারে। এর পরদিন রিচার্ড বারটন এটি এলিজাবেথ টেলরের জন্য ক্রয় করেন। মোনাকোর এক ‘চেরিটিবল’- এ টেলর এটি প্রথম অঙ্গে ধারণ করেন। ১৯৭৮ সালে এলিজাবেথ টেলর এই হীরা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। হীরা দেখার জন্য সম্ভাব্য ক্রেতারা যা ব্যয় করেছিলেন তার পরিমাণ ছিল ২৫০০ মার্কিন ডলার। ১৯৭৯ সালের জুন মাসে ৩০ লাখ মার্কিন ডলারে এটি বিক্রি হয়। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী টেলর-বারটন এখন সৌদি আরবে অবস্থান করছে।
হরটেনসিয়া
২০ ক্যারেট ওজনের এই হীরকখ-ের নামকরণ করা হয় হল্যান্ডের রাণী হরটেনস ডি বুহারনাইসের নামানুসারে। তিনি ছিলেন জোসেফাইনের কন্যা এবং নেপোলিয়ানের সৎ মেয়ে। হরটেনসিয়া চতুর্দশ লুই-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত ফরাসী রাজাদের সম্পদ ছিল। বর্তমানে এটি রিজেন্টের সঙ্গে ল্যুভারে প্রদর্শিত হচ্ছে।
দ্য অরলফ
বলা হয়ে থাকে আবিষ্কারকালে অরলফের ওজন ছিল ৩০০ ক্যারেট। অরলফ এখন ৬৭.৫০ ক্যারেট ওজন নিয়ে মস্কোর রত্ন ভান্ডারে রক্ষিত। কথিত আছে ভারতে এই হীরকখ-কে ‘ব্রহ্মার চোখ’ বলে অভিহিত করা হত। আরো একটা কথা প্রচলিত আছে যে, শ্রীরঞ্জন মন্দিরের বিগ্রহের চোখ হিসেবে ছিল অরলফ। ফরাসী সৈন্যরা এই রতœ চুরি করে নিয়ে যায়। পরে  নানা হাত বদল হয়ে মস্কোতে গিয়ে পৌঁছায় অরলফ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ