ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আসামে বিজেপির বাংলাদেশ বিরোধী তিন ‘ডি’

ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসামের নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি নিয়ে নতুন পর্যায়ে বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতারা। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত দুটি রিপোর্টের একটিতে জানানো হয়েছে, সোমবার বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এনআরসি বিষয়ক এক আলোচনা সভায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, আসাম রাজ্যে তাদের সরকার তিনটি ‘ডি’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। প্রথম ডি’র অর্থ ডিটেক্ট বা শনাক্ত করা। রাজ্যটিতে যেসব অবৈধ বিদেশি রয়েছে প্রথমে তাদের শনাক্ত করা হবে। বর্তমানে এনআরসির মাধ্যমে শনাক্ত করার কার্যক্রমই চালানো হচ্ছে।
এরপর দ্বিতীয় ডি’র মাধ্যমে অবৈধ বিদেশিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার বা ডিলিট করার কার্যক্রম শুরু হবে। অবৈধ বিদেশিরা যাতে আর কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে না পারে সে জন্যও বিভিন্ন তালিকা থেকে তাদের নাম ডিলিট করা হবে। সবশেষে অর্থাৎ তৃতীয় পর্যায়ের ডি হিসেবে আসবে ডিপোর্ট করার বা ভারত তথা আসাম থেকে বের করে দেয়ার পালা। এনআরসি থেকে বাদ পড়া অবৈধভাবে বসবাসকারীদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হবে বলেও ঘোষণা করেছেন বিজেপির ওই নেতা।
বিশেষ কিছু কারণে মিস্টার রাম মাধবের বক্তব্য ও ঘোষণাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। প্রথমত, তিনি শুধু বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক নন, বাংলাদেশ সংক্রান্ত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তাকে অন্যতম একজন ফ্যাক্টর বা নির্ধারক হিসেবে মনে করা হয়। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বাংলাদেশের যতো রাজনৈতিক নেতা ভারতে যান তাদের সকলেই বিজেপির এই প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করে থাকেন। বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে মিস্টার রাম মাধবই বাংলাদেশের মন্ত্রী, নীতি নির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতাদের তাদের করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
দ্বিতীয় বিশেষ কারণ হলো, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে বিতর্ক চললেও মিস্টার রাম মাধবের আগে বিজেপির উচ্চ পর্যায়ের কেন্দ্রীয় আর কোনো নেতা এতটা প্রত্যক্ষভাবে অবৈধ বসবাসকারীদের সরাসরি বাংলাদেশি হিসেবে উল্লেখ বা চিহ্নিত করেননি। সব দেশ রেখে কেবল বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার ঘোষণাও আর কেউ দেননি। উদ্বেগের তৃতীয় কারণ হলো, মিস্টার মাধব যে অনুষ্ঠানে সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য রাখছিলেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সেনোয়াল। তিনি শুধু তিন ডি বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোকেই সমর্থন জানাননি, ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও একই পন্থায় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
এসব কারণেই মিস্টার রাম মাধবের ঘোষণায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে তারও মাত্র দু’দিন আগে বিজেপিয় কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অমিত শাহ কলকাতার এক জনসভায় ঘোষণা করেছেন, পশ্চিম বঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতের প্রধান বিরোধী দল ন্যাশনাল কংগ্রেস যতো বিরোধিতাই করুক না কেন, আসামে তো বটেই, পশ্চিম বঙ্গসহ ভারতের অন্য কোনো রাজ্যেও একজন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে থাকতে ও বসবাস করতে দেয়া হবে না। কারণ ব্যাখ্যাকালে বিজেপি সভাপতি বলেছেন, বাংলাদেশের এসব অনুপ্রবেশকারী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নষ্ট করছে। ভারতের জন্য হুমকিরও সৃষ্টি করছে। এজন্যই নাগরিক পঞ্জি তৈরি করার মাধ্যমে রাজ্যে রাজ্যে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি সরকারের এই দেশপ্রেমিক কার্যক্রমের বিরোধিতা করছেন। কারণ, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীরা মমতা মমতা ব্যানার্জি ও তার দলের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ভ’মিকা পালন করে। একই কারণে সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীরাও সরকারের তথা এনআরসির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু সরকার কোনো বিরোধিতা বা প্রতিবাদের মুখেই এনআরসির কার্যক্রম বন্ধ করবে না বলে ঘোষণা করেছেন অমিত শাহ।
উল্লেখ্য, এরও কয়েক মাস আগে বিজেপির একই প্রেসিডেন্ট কলকাতারই এক সমাবেশে বলেছিলেন, আসামে বসবাসরত যে ৪০ লাখ মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জি তথা নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের সবাই অবৈধ ‘বাংলাদেশি’। এ সব বাংলাদেশিকে বের করে দেয়া হবে। শুধু আসাম প্রসঙ্গে বলেই থেমে যাননি বিজেপির প্রেসিডেন্ট। অমিত শাহ আরো বলেছিলেন, পশ্চিম বঙ্গেও লাখ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে এবং তাদের সকলকেও বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানো হবে। নিজের উদ্দেশ্য ব্যখ্যা করতে গিয়ে বিজেপির প্রেসিডেন্ট সেবার বলেছিলেন, পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি অবৈধ বাংলাদেশিদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। মমতার এই ভোটের রাজনীতির অবসান ঘটানোর জন্যই লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশিকে বের করে দেয়া হবে। অমিত শাহ অবশ্য অবৈধ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তারা অবৈধ হলেও ভারতে থাকতে পারবেন এবং তাদের নাগরিকত্বও দেয়া হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ এবং প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের বক্তব্য ও ঘোষণাকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। দু’জনের বক্তব্যেই পরিষ্কার হয়েছে, আসামের নাগরিক পঞ্জিকেন্দ্রিক সংকটে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে বিপদে পড়তে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকটি উপলক্ষে আমরা সরকারকে সতর্ক করেছি এবং কাল বিলম্ব না করে আসামের রাজ্য সরকার এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে তৎপর হওয়ার দাবি জানিয়েছি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যায়নি। এখনো যাচ্ছে না।
এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে ‘অবৈধ ও অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অথচ খোদ ভারতেরই বিভিন্ন দল ও সংস্থার জরিপ ও তথ্যনির্ভর পর্যালোচনায় দেখা গেছে এবং প্রমাণিতও হয়েছে, যাদের ‘অবৈধ ও অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা এবং বহিষ্কারের পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে তারা জন্মসূত্রসহ সকল বিচারেই ভারতীয় নাগরিক। তাদের বিরুদ্ধে বিজেপির অসন্তোষের প্রধান কারণ, তারা মুসলিম। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা অবৈধ হলেও ভারতে থাকতে পারবেন এবং তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে বলে অমিত শাহর ঘোষণাটিও নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় নিয়ে কোনো অভিমত দেয়ার পক্ষপাতী নই। কিন্তু আসামের নাগরিকপঞ্জিকেন্দ্রিক বিতর্ক ও ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশ বিপন্ন হতে চলেছে বলেই সরকারের উচিত অবিলম্বে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করা যাতে ভারতের কোনো একজন নাগরিককেও ‘অবৈধ ও অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা এবং বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ