ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সারাদেশে বিএনপির শান্তিপূর্ণ প্রতীকী অনশনেও পুলিশের তাণ্ডব

বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে গতকাল বুধবার রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে প্রতীকী অনশনে উপস্থিতির একাংশ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ প্রতীকী অনশন কর্মসূটিতেও পুলিশ তাণ্ডব চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দুই দিন আগে রাজধানীসহ সারাদেশে পালিত মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে তিন শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতারের পর গতকাল বুধবারও দুই শতাধিক নেতাকর্মী আটকের কথা জানিয়েছে বিএনপি। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়াপল্টনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, গণঅনশনের কর্মসূচি থেকে ঢাকায় ১০৭ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার  করেছে। সারদেশে আরও শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।  ঢাকা মহানগর, কুমিল্লা, লক্ষীপুর, মেহেরপুর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা সদরেও অনশন কর্মসূচিতে পুলিশী তাণ্ডব ও  গ্রেফতারের একটি তালিকা তুলে ধরেন তিনি। এছাড়া  নরসিংদী, রাজশাহী, বগুড়া, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রংপুর, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুরসহ সারাদেশে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারের তালিকাও দেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব।
কর্মসূচির  অনুমতি দিয়ে সরকার নেতা-কর্মী গ্রেফতারের নতুন ‘ফাঁদ’ এঁটেছে বলে অভিযোগ কওে রুহুল কবির রিজভী বলেন, আজকে (বুধবার) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে দেশনেত্রীর সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে প্রতীক অনশন কর্মসূটি শুরু ও শেষে রাস্তা অবরোধ করে পুলিশ নেতা-কর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের নির্বিচারে গ্রেফতার করে। কর্মসূচির মৌখিক অনুমতি দেয়ার পর নির্বিচারে গ্রেপ্তারে সরকার এক নতুন স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করেছে। অর্থাৎ অনুমতির কথা শুনে নেতা-কর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মসূচির জন্য এক জায়গায় জড়ো হবে আর সেই সুযোগে পুলিশ অনায়াসেই তাদেরকে ধরতে পারবে। দখল ও সন্ত্রাসের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত সরকার আগামী নির্বাচনের পূর্বে সারাদেশ জনশূণ্য করার জন্যই পুলিশকে অবাধ কর্মকান্ডের সনদ দিয়েছে। আমরা এহেন গ্রেপ্তারের নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।
রিজভী বলেন,  ঢাকায় গণঅনশন শুরুর আগে সকাল থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদের বনানীর বাসা পুলিশ ঘেরাও করে রেখেছে। নির্বিচারে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা বলতে চাই, এভাবে পুলিশি গ্রেপ্তারে জনগণের পুঞ্জিভূত নীরব ক্ষোভ প্রশমিত হবে না। বরং তা আগ্নেয়গিরির মতো উদগীরণ হবে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক চরিত্রই হচ্ছে হানাদারী আচরণে জনঅধিকার কেড়ে নেয়া। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের বাহিনী না বানিয়ে সবচেয়ে নিম্নমানের দাসত্বের তকমা ঝুলিয়ে দিয়েছে সরকার। পুলিশী গ্রেফতারের এই অবাধ কর্মকান্ডে জনগণের মধ্যকার পুঞ্জীভূত নীরব ক্ষোভ প্রশমিত হবে না, বরং তা আগ্নেয়গিরির মতো উদগীরণ হবে। আজকেও বেপরোয়া পুলিশী গ্রেফতার অভিযান গণতন্ত্রের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। বাক-স্বাধীনতা হরণ করতে সরকারের আগ্রাসী মনোভাব এখন চরম পর্যায়ে। অবৈধ সরকার দেশকে অতি দ্রুত গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, আওয়ামী সরকার এখন পড়ন্ত বেলায়। খাদের কিনারে পতনের শংকায়। সেজন্য তারা শেষ ভরসা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। কিন্তু এই ভরসা তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। ক্ষমতার কানেকশন বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের সাথে থাকবে না। বিএনপি নেতাকর্মীরা আত্মবিশ^াসের সাথে সরকারি বাহিনীর অন্যায় আচরণ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। সকল বাধা অতিক্রম করে সামনের আন্দোলনে গণতান্ত্রিক শক্তি জীবনবাজি রেখে অংশগ্রহণ করবে।
রিজভী জানান, কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট প্রাঙ্গণ থেকে প্রতীকি অনশন পালনকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ওয়ারী থানা বিএনপি নেতা শামসুল আলম শিমুল, নয়ন, শাহবাগ থানা ২০ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আকরামুল, চকবাজার থানা ২৯ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আলমগীর, মাহবুব, সালমান, লালবাগ থানা ২৪ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, বংশাল থানা ৩৩ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আজিম, মানিক, হাজারীবাগ থানা ১৪ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মো: পারভেজ, ঢাকা মহানগর উত্তর মোহাম্মদপুর থানা বিএনপি নেতা মিঠুন, জামান, রজ্জব, তেজগাঁও থানা বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর তেজগাঁও থানা যুবদল নেতা মো: আশরাফুল আলম আকাশ, মো: রিপন, মো: লিটন, মো: রিপন হোসেন, মো: লালচাঁন, গুলশান থানা যুবদল নেতা সাইফুর রহমান সাইফ, শামীম আহমেদ, কাওরান বাজার দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিট যুবদল নেতা মো: বজলুর রহমান, কাফরুল থানা যুবদল নেতা মো: সিরাজুল ইসলাম, মো: সিয়াম, মো: নাসির ফকির, ফরহাদ, রুপনগর থানা যুবদল নেতা মো: আজিজ, মো: মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ পল্টন থানা যুবদল নেতা মো: মিরাজ হোসেন, মো: লুৎফর, মো: সুজন, খিলগাঁও থানা যুবদল নেতা মো: হুমায়ুন, রমনা থানা যুবদল নেতা মো: নয়ন, ওয়ারী থানা যুবদল নেতা মো: লিটন, কামরাঙ্গীর চর ছাত্রদল নেতা মো: রিপন হোসেন, কেরানীগঞ্জ থানা ছাত্রদল সভাপতি শাহরিয়ার রাসেলসহ ৫ জন খিলগাঁও থানা ছাত্রদল নেতা মঈনুল হোসেন, মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী মোঃ ইউছছুফ, ঢাকা মহানগর (উত্তর) তেজগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ স¤ক্সাদক মোঃ জহির রায়হান, দারুসসালাম থানার মোঃ রানা, মোঃ শাহাদাৎ, মোঃ রুবেল, মোহাম্মদপুর থানা মোঃ রিপন, রামপুরা থানার মোঃ মাসুম, গুলশানা থানার মোঃ আনোয়ার হোসেন মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ খিলগাঁও থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোঃ রুবেল, রাসেল, রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জামাল, লালবাগ থানা আশরাফ উদ্দিনসহ  ১৬ জনকে আজ প্রতিকী অনশন পালন শেষে পুলিশ গ্রেফতার করে।
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রদলনেতা তাজ, ঢাকা কলেজ ছাত্রদল নেতা রাজু আহমেদ, মাহবুব অভি, সম্রাট, তিতুমীর সরকারী কলেজ ছাত্রদলের নেতা আবদুল হামিদ, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতা মহিদুল ইসলাম রিমন, জিয়াউল হক জিয়া, কাউছার আহমেদ রনি, ঢাকা মহানগর পূর্ব শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদল নেতা সেলিম ও শরিফ, নিউমার্কেট থানা ছাত্রদল নেতা শাকিল, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল নেতা নাজমুল হাসান আরিফ, মোঃ সজিব, স্বেচ্ছাসেবক দল লৌহজং থানা শাখার সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান শিকদার, সাধারণ সম্পাদক শাহীন মৃধাসহ ঢাকায় ১০৭ জন এবং গতকাল থেকে দেশব্যাপী ৪৪ জনসহ মোট ১৫১ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
রিজভী জানান, মঙ্গলবারও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কুমিল্লাদ্বেবিদ্বার উপজেলা রাজামেহার ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর রহমান মুন্সি, উপজেলা ছাত্রদলের দফতর সম্পাদক জুয়েল রানা, ছাত্রনেতা নজরুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। লক্ষ্মীপুর জেলা
চন্দ্রগঞ্জ থানা বিএনপির নেতা মোঃ আরাফাত রহমানকে গতকাল পুলিশ ঢাকা শাহবাগ থেকে গ্রেফতার করেছে। মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শামসুজ্জামান ও যুবদলের সহ-সভাপতি আবদুর রশিদসহ ১৯ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে কলারোয়া থানায় মামলা দিয়েছে পুলিশ। তার ঢাকার বাসায় হানা দিয়েছে পুলিশ।
মামলা দায়ের তালিকা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সোবহান স্বপন ও খালেদ মাহমুদ মাসুদ গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। নরসিংদী জেলায় ১০টি, রাজশাহী জেলায় ৫টি, বগুড়ায় ৬টি, নেত্রকোণায় ৫টি, ময়মনসিংহ জেলায় ৬টি, চাঁপাই নবাবগঞ্জে ২টি, নারায়ণগঞ্জে ৭টি, টাঙ্গাইল জেলায় ২টিসহ সর্বমোট ৪ হাজার বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ হতে মঙ্গলবার পর্যন্ত উক্ত জেলা সমূহে ১৯৬ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৮ দিনে রাজশাহী মহানগরে ৪টি, গাজীপুর মহানগরে ১১টি, রংপুর মহানগরে ৭টি, খুলনা মহানগরে ১৩টি মিথ্যা মামলায় মোট ৭৮৮ জনকে আসামী করা হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে ১৫৩ জনকে।  এছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ শাহজাদা মিয়া, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইয়াসমিন আরা হকসহ ১০৫ জনের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর উত্তর উত্তরা পশ্চিম থানায় মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।  এছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ০৪টি মামলায় ৪০০ জনের অধিক বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ফেনী আদালতে মিথ্যা মামলায় হাজিরা দিতে গেলে ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া, ফেনী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান মাহমুদ সবুজ, ফেনী জেলা বিএনপি’র নেতা ও পাঁচ গাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দেলু, জেলা যুবদল নেতা মোঃ শহীদুল্লাহ লিটন, জেলা ছাত্রদল নেতা  মোঃ আনোয়ার হোসেন, ফরহাদ নগর ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি মোশাররফ হোসেন, জেলা ছাত্রদল নেতা মোঃ ইউসুফ এবং ছাত্রদল নেতা ফরিদুল ইসলাম রাহাতসহ মোট ৯ জন নেতাকর্মীর জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করার ঘটনায় দলের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তাদের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ