ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কারাগারে আদালতের “বৈধতা” নিয়ে বিচারকের সামনেই বিতর্ক

# অনুপস্থিতিতে বিচার চালানোর শুনানি আজ
স্টাফ রিপোর্টার: জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারের অস্থায়ী আদালতে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ কারণে তাকে আদালতে হাজির করতে পারেনি কারা কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। এই আদালত কারাগারে বসানোর ‘বৈধতা’ নিয়ে এই আদালতের বিচারকের সামনেই বিতর্ক করেন দুই পক্ষের আইনজীবীরা। পরে উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন আদালত।
গতকাল বুধবার রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে অবস্থিত ঢাকার অস্থায়ী ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান শুনানির দিন ধার্য করেন।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক আখতারুজ্জামান বলেছেন, খালেদা জিয়া আদালতে না এলে কীভাবে তিনি জামিনে থাকবেন। এ ব্যাপারে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আজ আইনি ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন।
তবে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। তিনি আদালতে না এলে আইন অনুযায়ী এ মামলার বিচারকাজ চলবে।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী আদালতে একটি পিটিশন দাখিল করে বলেছেন, সুপ্রিম কোটের্র অনুমোদন ছাড়া এভাবে কারাগারের ভেতরে একজন বন্দীর বিচারের ব্যবস্থা করা ‘সংবিধান ও আইন পরিপন্থি’। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার স্থায়ী জামিনেরও আবেদন করেছেন আসামীপক্ষের আইনজীবী।
পুরাতন কারাগারের ভেতরে অস্থায়ী আদালত স্থানান্তর নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো সেখানে আদালতের কার্যক্রম চলে। সকাল ১০টায় বিচার কাজ শুরুর সময় থাকলেও সময় লেগে যায় বেলা ১২টা ২০ মিনিট অবধি। যদিও সকাল ১১টা থেকে অস্থায়ী আদালতের পাশের খাস কামরায় উপস্থিত ছিলেন বিচারক আখতারুজ্জামান।
শুরুতে আদালতের অবস্থা নিয়ে খালেদার পিটিশন এবং জামিন আবেদন নিয়ে বক্তব্য দেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া।
আদালত স্থানান্তর নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনেই এটাকে কারাগার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এতো ছোট আদালত আমরা চারজন আসলেও বসতে পারছি না। সাংবাদিকসহ অন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ডিফেন্সের সবাই আসলে এখানে এতো সাফোকেশন হবে, বিচারকাজ চালানো সম্ভব না।
সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, এই অবস্থায় এখানে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না, এটা সংবিধান পরিপন্থী কি-না- সে বিষয়ে আমরা পিটিশনে উল্লেখ করেছি।
এই আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং খালেদার চিকিৎসা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। বেগম জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আর এই আদালত করার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। এ অবস্থায় কারাগারের ভেতরে আদালত বসানো যায় কি-না এখন যেহেতু তার কাছে আইনজীবীরা গিয়েছেন, তিনি একটি সিদ্ধান্ত দেবেন।
সাধারণত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিচারকের নাম থাকলেও এবারের প্রজ্ঞাপনে তা ছিল না কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন সানাউল্লাহ মিয়া।
তারপরে দেওয়া বক্তব্যে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার অপর দুই আসামী জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে এই আদালত ‘আইনসম্মত’ না হওয়ায় এখানে মামলার বিচারিক কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা না করার আবেদন পড়ে শোনান আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।
এভাবে আদালত বসানো সংবিধানের ৩৫(৩) ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারার সাংঘর্ষিক হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি। বেআইনিভাবে গঠিত অত্র আদালত ও বিচারিক কার্যক্রম স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বরাবর একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে। এই রূপ অবস্থায় আইন সম্মত আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অত্র মামলার কার্যক্রম ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্থগিত হওয়া আবশ্যক।
তিনি বলেন, আদালত কক্ষটি আনুমানিক ১২ বাই ২৪ ফুট সরু আয়তনের। এবং এই ছোট্ট কক্ষে বিচারকের আসন, আইনজীবীদের বসার স্থান, পাবলিক প্রসিকিউটর, সাক্ষী ও বিচারপ্রার্থীদের বসার স্থানসহ আদালতের স্টাফ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকলের একত্রে আদালত কক্ষে অবস্থান বিচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ মোটেই সম্ভবপর নয়। আদালত কক্ষ সংকীর্ণ হওয়ায় সাফোকেশন ও গরমের কারণে যে কেউ যে কোনো সময় মারা যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী।
তিনি আরো বলেন, এ আদালত গুহার মতো। স্যাৎস্যাতে অবস্থা। এখানে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যায় না। যেকোনো সময় যে-কারও ‘সাফোকেশন’ হতে পারে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, গেজেটে বলা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগার স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বকশীবাজারের আদালত থেকে যতবারই সময় পেছানো হয়েছে, ততবারই বেগম জিয়ার অসুস্থতার কারণে সেটা করা হয়েছিল। নিরাপত্তার বিষয়টিতো একবারও উঠেনি। বা প্রসিকিউশন থেকেও বলা হয়নি।
তিনি বলেন, কারাগারে থাকা আসামীকে উপস্থিত করানোর দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রসিকিউশনের। কিন্তু এখানে বেগম জিয়া উপস্থিত নাই। তিনি অনুপস্থিত থাকাবস্থায় কোরাম নন-জুজিস হওয়া স্বত্ত্বেও বিচার কার্যক্রম চলছে। প্রসিকিউশন সেটা বলার কথা থাকলেও, তারা কিছু বলছে না।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষে দেওয়া বক্তব্যে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, আইন মেনে এ আদালত গঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার সুবিধার জন্য এখানে আদালত বসেছেন। বেগম খালেদা জিয়া ও অন্য আসামীদের আইনজীবীরা এই আদালতকে সংবিধান পরিপন্থী, আইন পরিপন্থী ও অবৈধ বলছেন। আবার তারাই সেখানে দাঁড়িয়ে জামিন আবেদন করছেন। এই আদালত যে কোনো আইনে বৈধ। বৈধ আদালতে দাঁড়িয়ে তারা জামিনের জন্য শুনানি করছেন। কিন্তু বৈধ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন না। আদালতের গঠন নিয়ে আসামীপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যকে ‘আষাঢ়ে গল্প’ হিসাবেও অভিহিত করেন তিনি। আদালত গঠনের ক্ষেত্রে পাবলিক হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বিচারের কথাও আছে। তারা দ্রুত বিচারের বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না। দ্রুত বিচারের স্বার্থে এখন যে অবস্থা আছে, সেই অবস্থায়ই আদালতের কার্যক্রম শুরু হোক।
পরে বিচারক আখতারুজ্জামান আদালতে খালেদার হাজির না হওয়া প্রসঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের চিঠির বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, উনি(খালেদা জিয়া) কোর্টে আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তার মানে, আসতে অনিচ্ছুক।
এরপর বিচারক খালেদার আইনজীবীর কাছে জানতে চান, খালেদা যদি না আসেন তাহলে জামিন শুনানি কীভাবে হবে এবং আর এভাবে আসতে অনিচ্ছুক হলে, কোরাম নন-জুডিস রেখে বিচারকাজ চালানো যাবে কি-না।
এর জবাবে সানা উল্লাহ মিয়া বলেন, বেগম জিয়া যেহেতু কারাগারে আছেন আর আদালত কারাগারের ভেতরে। দুইটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সে কারণে উনি কেন আসতে পারেননি, কী বলেছেন সেটা আমরা এখনও নিশ্চিত না। আবার উনি যেহেতু আগের দিন বলেছেন অনেক বেশি অসুস্থ। উনার শারীরিক অবস্থা কি, সেটাও তার সাথে দেখা করা ছাড়া বলা সম্ভব না। আর কারাগারে থাকা আসামীর অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না সে বিষয়ে আইনী ব্যাখ্যা দিতে পড়াশোনা করার সময় প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন জানান সানাউল্লাহ মিয়া।
খালেদা অসুস্থতার উপর তার আইনজীবীদের জোর দেওয়ার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, বারবার বলা হচ্ছে খালেদা অসুস্থ। ওনারাতো (খালেদার আইনজীবীরা) ওইদিন ছিলেন না। উনি (খালেদা) কিসের অসুস্থ। হুইল চেয়ারে ওনাকে আনা হয়েছে। উনি আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সবাই দেখেছে। খালেদা অনুপস্থিত থাকলেও বিচারকাজ তার আইনি গতিতে চলবে বলে আদালতে মন্তব্য করেন তিনি।
উভয়পক্ষের বক্তব্যের পর খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে কি-না এবং এই অবস্থায় জামিন শুনানি হবে কি-না সে বিষয়ে বক্তব্যের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ঠিক করে দেন। আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খালেদার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আদালত প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি কাস্টডিতে আছেন, কিন্তু আসতে ইচ্ছুক নন। খালেদা জিয়ার প্রকৃত তথ্য হল, তিনি গুরুতর অসুস্থ। যার কারণে তিনি আসেন নাই। আদালত ভবন এবং জেলখানা একই জায়গায়, দুইটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কারা কর্তৃপক্ষের কি দু’টি মাথা আছে, আদালতের কি দুইটা মাথা আছে অন্য কিছু লিখে দিবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, কাস্টডিতে থাকাবস্থায়, তাকে হাজির করার দায়িত্ব হচ্ছে জেল কর্তৃপক্ষের। জেল কর্তৃপক্ষ তাকে হাজির করবেন, মাননীয় আদালত তার বিচার করবেন। এক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া যদি না আসেন, তিনি যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, সেক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিতিটাকে উপস্থিতি ধরে নিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করব। মাননীয় আদালত বলেছেন, আপনারা একদিকে জামিন চাচ্ছেন, আবার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলছেন, আবার আপনারা সেখানে আসছেন না, সেক্ষেত্রে কীভাবে আমি জামিন বর্ধিত করব, সে ব্যাপারে আপনারা আইনগত ব্যাখ্যা দেন। উনারা আইনগত ব্যাখ্যা কালকে দেবেন।
আদালত ঘিরে নাজিমউদ্দিন রোড এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আদালতকক্ষেও অনেক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। আসামীপক্ষের পাঁচ আইনজীবীর সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষে আটজন আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের একটি কক্ষকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করে। ৫ সেপ্টেম্বর সেখানে আদালত বসেন। সেদিন আদালতে হাজির হয়ে খালেদা জিয়া আদালতকে বলেছিলেন, এ আদালতে ন্যায়বিচার নেই। তিনি অসুস্থ। তিনি আর আদালতে আসবেন না। যত দিন ইচ্ছা আদালত তাঁকে সাজা দিতে পারেন।
এর আগে এ মামলার বিচার চলছিল পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে। এ মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছে। খালেদা জিয়াসহ তিন আসামির যুক্তিতর্ক শুনানি বাকি রয়েছে।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় এ মামলা করে দুদক। মামলার অপর আসামীরা হলেন হারিছ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম ও মনিরুল ইসলাম খান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ