ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পাকিস্তান ও ভারতের মহারণ দেখতে উদগ্রীব ক্রিকেট বিশ্ব

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দরজায় কড়া নাড়ছে এশিয়া কাপ ক্রিকেটের। বাছাই পর্ব পেরিয়ে ষষ্ঠ দল হিসেবে এশিয়া কাপে নাম লিখিয়েছে হংকং। চার পরাশক্তি ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পাশাপাশি কিছুদিন আগে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তানের সঙ্গী হবে তারা। এশিয়ান ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ‘এ’ গ্রুপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গী হয়েছে হংকং। আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শনিবার টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে টাইগারদের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। ‘বি’ গ্রুপের অপর দল আফগানিস্তান। ‘ডিফেন্ডিং’ চ্যাম্পিয়ন ভারত তাদের নিয়মিত অধিনায়ক ও বড় তারকা বিরাট কোহলিকে বিশ্রামে রেখে দল ঘোষণা করেছে। নিজেদের দ্বিতীয় হোম ভেন্যু হয়ে ওঠা আমিরাতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপাধারী পাকিস্তানও হট-ফেবারিট। ওয়ানডেতে ক্রমশ পরাশক্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশও রেসে থাকতে চায়। আছে এশিয়ান ক্রিকেটের নতুন আতঙ্ক আফগানিস্তান। এশিয়ার বিশ্বকাপ খ্যাত এশিয়া কাপের ১৪তম আসরে কোন্ দল জিতবে সেটি নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে তার চেয়েও বেশী আলোচনায় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ম্যাচটিকে ঘিরে। মরুর দেশ আরব আমিরাতে একটি ম্যাচ ঘিরে অনেক আগেই তৈরি হয়েছে উন্মাদনা। ১৯ সেপ্টেম্বর ‘এ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে মুখোমুখী হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান। ভক্ত-সমর্থক তো বটেই দু’দলের খেলোয়াড়দের বক্তব্যও ছড়াচ্ছে বাড়তি উত্তাপ। ভারতকে আগাম হুমকি দিয়ে রাখলেন পাকিস্তান পেসার হাসান আলি। এক-দুই বা পাঁচ নয়, সম্ভব হলে প্রতিপক্ষের সবকটি উইকেট একাই শিকার করতে চান ২৪ বছর বয়সী সেনসেশনাল এ পেসার! হাসান আলি বলেন, ‘পাঁচ উইকেট নয়, সম্ভব হলে আমি ভারতের সব কটি উইকেট নিতে চাইব। ওই ম্যাচে চাপ থাকবে। কিন্তু চাপে আমি নিজের সেরা খেলাটা বের করে আনতে পারি। এশিয়া কাপে ভারত ম্যাচের জন্য আমার আর তর সইছে না।’ ১৬ সেপ্টেম্বর ‘এ’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ দুর্বল হংকং। এই ভেন্যু দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১৯ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। শ্রীলঙ্কায় নিদাহাস টি২০ ট্রফিতে নিয়মিত অধিনায়ক বিরাট কোহলিকে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল। সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন রোহিত শর্মা। দ্বিতীয় সারির দল নিয়েও শিরোপা জিতেছিল তারা। এবার এশিয়া কাপেও কোহলিকে বিশ্রামে রেখে রোহিতের নেতৃত্বে খেলবে ভারত। তবে এক কোহলিকে বাদ দিলে পূর্ণশক্তির দল নিয়েই এশিয়া কাপে খেলতে নামবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।
তবে সুপারস্টার কোহলির অনুপস্থিতি পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দেবে বলেই মনে করেন হাসান আলি। তার কথায়, ‘বিরাট কোহলি একজন অসাধারণ ক্রিকেটার। সবাই জানে, তিনি একজন ম্যাচ উইনার। কিন্তু তাকে ছাড়াও ভারত ভাল দল। তাদের আরও খেলোয়াড় আছে। হ্যাঁ, তার অনুপস্থিতি আমাদের বাড়তি সুবিধা দেবে। কারণ কোহলি চাপ কাটিয়ে সেরাটা খেলতে পারে, কিন্তু বাকিরা সেটা পারে না।’ ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয় শীর্ষ দল ভারত। আর পাকিস্তনের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। তবু এশিয়া কাপে নিজের দলকেই এগিয়ে রাখছেন ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের তৃতীয় স্থানে থাকা ডানহাতি মিডিয়াম পেসার। কারণ হিসেবে বলেছেন গত বছরের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে জয়। তার মতে সর্বশেষ ম্যাচে হারের কারণে চাপে থাকবে ভারত। এছাড়া আরব আমিরাতের কন্ডিশনের সুবিধাও পাকিস্তান পাবে বলে মনে করেন হাসান আলি।
পাকিস্তান তারকা পেসার আরও বলেন, ‘আমিরাতের কন্ডিশন আমাদের চেনা। আমরা এখানে অনেক খেলেছি, তাই এখানে হোম কন্ডিশনের সুবিধা পাব। আমরা জানি, কিভাবে এখানকার কন্ডিশনের সুবিধা নিতে হয়।’ পাকিস্তানের হয়ে এ পর্যন্ত ৩৩টি ওয়ানডে খেলেছেন হাসান আলি। মাত্র দুই বছরের ক্যারিয়ারে ২০.৮৮ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ৬৮টি। গত বছর জুনে কেনিংটন ওভালে চিরশত্রু ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শিরোপা জেতে পাকিস্তান। ফাইনালে ৩টিসহ আসরে দুর্দান্ত বোলিং করে টুর্নামেন্টসেরা হয়েছিলেন হাসান আলি।
এশিয়া কাপে চিরশত্রু ভারতের বিপক্ষে বহুল আলোচিত ম্যাচে সতীর্থদের মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেদের সেরাটা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অভিজ্ঞ শোয়েব মালিক।  ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই অন্যরকম এক উন্মাদনা। ভক্ত-সমর্থক তো বটেই দু’দেশের খেলোয়াড়দের মাঝেও যা ছড়িয়ে দেয় বাড়তি উত্তাপ। দলের অন্যতম সিনিয়র সদস্য শোয়েব মালিক সতীর্থদের মাথা ঠান্ডা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। অভিজ্ঞ এ অলরাউন্ডার বলেছেন, এটিকে আর দশটা ম্যাচের মতো বিবেচনা করে কেবল নিজেদের সেরাটা দিতে। ‘আমার কাছে এটি আর দশটা ম্যাচের মতোই। শুধু নিজে না সতীর্থদেরও ভারত ম্যাচকে সেভাবে দেখার পরামর্শ দিয়েছি। ওদের বলেছি চাপ নেয়ার কোন দরকার নেই। এটিকে অন্য ম্যাচের মতো মনে কর। বাড়তি চিন্তা করার কিছু নেই।’ বলেন মালিক।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর থেকে ওয়ানডে ফরমেটে দারুণ খেলছে সরফরাজ আহমেদের দল। মালিক আরও যোগ করেন, ‘ওয়ানডেতে আমাদের ব্যাটসম্যানরা দারুণ করছে। আশা করছি ওরা এই টুর্নামেন্টেও ভাল করবে। আমিরাতের কন্ডিশনও আমাদের অনুকূলে থাকবে। আবার ম্যাচ জিতে ক্ষণিকের মধ্যে ২-৩টা উইকেট তুলে নেয়ার মতো বোলার আছে। সুতরাং ওদের বলেছি, খামাখা মাথা না ঘামিয়ে নিজেদের খেলাটা খেলে যাও।’ দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে এমন অনেক ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী মালিক অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই মাথা ঠান্ডা রাখতে চাইছেন।
বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে দীর্ঘদিন ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ। দু’দল এখন কেবল বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপের মতো বৈষয়িক টুর্নামেন্টগুলোতে খেলছে। মালিক বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তান যত বেশি বেশি ম্যাচ খেলবে, তত দু’দেশের ভক্ত-অনুরাগীরা উৎসাহিত হবেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভারত-পাকিস্তান দু’দেশের খেলোয়াড়রাই পেশাদার। একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সবটুকু উজাড় করে দিতে চায়। কিন্তু মাঠের বাইরে সবাই ভাল বন্ধু। আমরা একসঙ্গে খাই, গল্প করি। অভিজ্ঞ মোহাম্মদ হাফিজের দল থেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ক্রিকেটারের জীবনে এমন সময় আসে। ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। জানে কিভাবে ফিরে আসতে হবে। আমার বিশ্বাস সে ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগ দেবে।’
ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ মানেই চরম উত্তেজনা। মাঠ, গ্যালারি ছাপিয়ে সেই উত্তেজনার পারদ আছড়ে পড়ে টিভি সেটের সামনে। দুই চিরপ্রতিদ্বন্ধীর মহারণ দেখতে উদগ্রীব থাকেন বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমী। অফিস-আদালত, রাজপথ থেকে ফুটপাথ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলিগলিতেও এ নিয়ে চলে তুমুল আলোচনা। চুলচেরা বিশ্লেষণে মাতেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মালিক এটিকে আর দশটা ম্যাচের মতোই দেখতে চান।
শ্রীলঙ্কা, ভারত, আফগানিস্তান যেখানে স্পিন আক্রমণকে প্রাধান্য দিয়েছে, সেখানে ছয় পেসার নিয়ে এশিয়া কাপের ১৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে অন্যতম ফেবারিট পাকিস্তান। আলোচিত ঘটনা অভিজ্ঞ মোহাম্মদ হাফিজ ও তারকা অলরাউন্ডার ইমাদ ওয়াসিমের জায়গা না পাওয়া। এতে করে রঙিন পোশাকের সাবেক অধিনায়ক হাফিজের ক্যারিয়ারই প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল। সবশেষে জিম্বাবুইয়ে সিরিজে ওয়ানডে দলে থাকলে খেলার সুযোগ পাননি এই তারকা ক্রিকেটার। অন্তর্ভুক্ত ছয় পেসার হলেন মোহাম্মদ আমির, হাসান আলি, জুনাইদ খান, উসমান খান, ফাহিম খান ও শাহিন শাহ আফ্রিদি। ১৫ সেপ্টেম্বর আরব আমিরাতে শুরু এশিয়ার বিশ্বকাপ খ্যাত এশিয়া কাপের আসর। এবার ওয়ানডে ফরমেটেই অনুষ্ঠিত হবে ছয় জাতির এই টুর্নামেন্ট। অনেকের মতে গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর থেকে সংক্ষিপ্ত ফরমেটে দারুণ বদলে যাওয়া পাকিস্তান দলে হাফিজের দিন শেষ হয়ে এসেছে। তবে প্রধান নির্বাচক ইনজামাম উল হক জানিয়েছেন, হাফিজ এখনও তাদের ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় আছেন। হাফিজ ছাড়া ফিটনেস টেস্টে খারাপ করায় ইমাদ ওয়াসিমও বাদ পড়েছেন তবে ব্যাটসম্যান শান মাসুদের দলে আসাটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। ১৬ সদস্যের এই দলে পেস শক্তিকে বাড়াতে নেয়া হয়েছে ছয় ফাস্ট বোলারকে। যেটা বেশ আলোচিত হচ্ছে।
পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ম্যাচ নিয়ে বসে নেই ক্রিকেটাররা। কেমন হবে দল গোচানো সেটি নিয়েই ব্যস্ত সবাই। চমকজাগানো সব রিস্ট স্পিনারে সমৃদ্ধ ভারত। কুলদীপ যাদব এবং যুবেন্দ্র চাহাল, দু’জনের ওপরেই দলের দারুণ ভারসা। সম্প্রতি ছোট্ট ফরমেটের ক্রিকেটে ভারতকে নিজেদের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছেন তারা। যদিও আরব আমিরাতের কন্ডিশন স্পিনারদের অনুকূলে সেভাবে থাকবে না, তাও ভারতের গেম প্ল্যানের অন্যতম কান্ডারি এই দুই স্পিনার। আর কোহলিবিহীন ব্যাটিং লাইন আপে ভারতের প্রধান আস্থা অধিনায়ক রোহিত শর্মার ওপর। এছাড়া লোকেশ রাহুল বা শিখর ধাওয়ানের পারফর্মেন্সে পরিকল্পনা সাজাতে চাইবেন বস্ রবি শাস্ত্রী। অন্যদিকে পেস আক্রমণকে প্রাধান্য দিয়ে দল সাজিয়েছে আজহার আলির পাকিস্তান। পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান আলি, তরুণ অলরাউন্ডার শাদাব খানের পারর্ফমেন্সের ওপর চোখ থাকবে। আর ম্যাচের সুর বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন ওপেনার ফখর জামান। সঙ্গে অধিনায়ক সরফরাজ খানের ক্ষুরধার নেতৃত্ব এবং শোয়েব মালিকের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচে সেরাদের কাতারেই থাকবে পাকিস্তান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ