ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সাফের ব্যর্থতার পর কোথায় বাংলাদেশের ফুটবল

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বাংলাদেশের জন্য চরম দুঃখ গাঁথা হয়ে রয়েছে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ। আরো একটি আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। তাকে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কতটা পরিবর্তন হলো দেশের ফুটবলে কিংবা ভবিষ্যতের জন্য কি অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের ফুটবলে অর্জন আর বিসর্জন দুটোই রয়েছে। তবে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বাংলাদেশের পরাজয় একেবারেই খাদেন কিনারে ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশকে। কোনভাবেই আশাবাদী হওয়ার মতো কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিলনা। তিন বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়াটা বেশ ধাক্কা দেয় বাংলাদেশকে। এই সময়ে বাংলাদেশেও বসেনি জাতীয় দলের কোন আন্তর্জাতিক আসর। গত ২৭ জুলাই লাওসের বিপক্ষে খেলে আবারো দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন খেলোয়াড়রা। সেই ম্যাচটাও পিছিয়ে পড়ে ড্র করেছিল বাংলাদেশ। এরপর এশিয়ান গেমসে যা করে দেখিয়েছে জেমি ডে’র শীষ্যরা সেটাকে ইতিহাস না বলে তো কোন উপায় নেই। কারণ এবারের আসরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রতিনিধিত্ব করা সব দলই বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ড থেকে। ব্যতিক্রম ছিল কেবল বাংলাদেশ। ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতারকে হারিয়ে যে যোগ্যতা অর্জন করেছিল এই দেশ সেটা অনেক বড় অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আর এখন তো খুঁজে পাওয়া গেছে সেই পুরনো বাংলাদেশকে। আগে থেকেই অনুমেয় ছিল বছরের শেষটা বেশ ব্যস্ততায় কাটবে বাংলাদেশের ফুটবলারদের। দেশে ও দেশের বাইরে খেলতে হবে অনেকগুলো ম্যাচ। সেই প্রস্তুতিটা যে কোচ ভালভাবেই খেলোয়াড়দের দিতে পেরেছেন সে আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। এই দলকে দুবার কাতারে আর একবার দক্ষিণ কোরিয়ায় কন্ডিশনিং ক্যাম্প করিয়ে আনা হয়েছে। খেলানো হয়েছে বেশকিছু প্রস্তুতি ম্যাচও। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ হিসেবে খ্যাত সাফ ফুটবলের আগে একটি মাত্র প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। সেটিতে শ্রীলংকার কাছে ১-০ গোলে পরাজয় দিয়ে শুরু করেছিল। রাজধানীর বাইরে নীলফামারির শেখ কামাল ষ্টেডিয়ামে উপচে পড়া দর্শকদের হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। তবে সাফ শুরু হতেই নতুন এক বাংলাদেশের দেখা পাওয়া গেছে। প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ২-০ গোলে হারানোর পর দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ১-০ গোলের জয় পায় বাংলাদেশ। গ্রুপের শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে অবাক করা পরাজয় আবারো পিছিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। তার আগে অবশ্য আলোর রেখা দেখা গিয়েছিল। হঠাৎ করে কি করলেন কোচ যে দলে এতটা পরির্বতন হলো। বাংলাদেশে কাজ করা বিদেশী কোচদের বেশিরভাগই নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে থাকেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের পঞ্চম বিভাগে কাজ করা জেমি ডে নিজের মতো করে কাজ করার পাশাপাশি নজর দিয়েছেন অন্যদিকে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় খাবার ভাত। আর তরকারিতে অতিরিক্ত তেল মসলার ব্যবহারও হয়ে থাকে। জেমি ডে শুরুতেই যখন দেখলেন খেলোয়াড়দের ফিটনেসের অবস্থা খারাপ তখন হাত দিলে খাদ্য তালিকায়। ভাত খাওয়া এককথায় নিষিদ্ধ করলেন। পাশাপাশি পুরোপুরি বর্জন করা হয়েছে তেল ও মসলা। শুধুমাত্র সিদ্ধ করেই শবজি খাওয়ানো হয়েছে এই কোচ আসার পর। পরিবর্তন যে হয়েছে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যে বাংলাদেশ ৭০ মিনিট খেলার পর ক্লান্ত হয়ে পড়ত সেই দলটি এখন ৯০ মিনিট কেন ১২০ মিনিট খেললেও ক্লান্ত হয়না। পাশাপাশি শেষ দিকে গোল হজম করে পরাজয়ের যে ধারা শুরু হয়েছিল তার লাগাম টেনে ধরেছেন নতুন কোচিং স্টাফ। এর মধ্যে আবার কয়েকজনকে একটু আলাদা করতে হয়। তাদের মধ্যে সবার উপরের নামটি তপু বর্মন। ডিফেন্ডার হয়েও নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছেন। ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের মতোই পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচেও সেরা ফুটবলার হয়েছেন। বল ক্লিয়ার থেকে শুরু করে ওভারল্যাপ করে আবার আক্রমনেও বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তার এভাবে উঠে আসাটা স্পেনের সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকেদের কথাই মনে করিয়ে দিলো। বয়সে সবার ছোট হলেও এরই মধ্যে ক্ষুরধার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিয়েছেন সাদউদ্দীন। এতদিন দলে তার জায়গা ছিল ডিফেন্ডার হিসেবে। এখন কোচ তাকে লেফট উইংয়ে অসাধারন এক খেলোয়াড়ের পরিণত করেছেন। বলা যায় লেফট উইংয়ে রীতিমতো ত্রাস হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন। অনেক বছর ধরে বাংলাদেশের ফুটবলে এমন কাউকে দেখার সুযোগ হয়নি। বলা যায় চোখ জুড়ানো ড্রিবলিং আর গতি দিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে সর্বদাই ব্যতিব্যস্ত রেখেছেন। বিশ্বের কোন দলেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের তেমন একটা কদর নেই। তারা মাঠে যে কাজটি করে থাকেন সেটিরও প্রচার তেমন একটা পান না। বাংলাদেশে জামাল ভুইয়া হচ্ছেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, ছোট করে বললে দলের প্রাণভোমরা। ডিফেন্সে মনযোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের সীমানায় মুহুমর্হু আক্রমণই যে তার প্রধান কাজ। দলের আরেক খেলোয়াড় ওয়ালি ফয়সাল। বয়সের কারণে তার খেলায় একটা ছাপ পড়েনি। মাঝমাঠ না পেরোনোটাই তার জন্য ভাল থাকলেও তিনি কারও বারণ মানেননি। ওভারল্যাপ করে উপরে উঠে আক্রমনেও বেশ পাকা এই লেফট ব্যাক। এই খেলোয়াড়দের দিয়েবেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশ দলে। এই দলটি এখন খেলছে হাই প্রেসিং ফুটবল। কোচ জেমি ডে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই পদ্ধতিতে খেলোয়াড়দের খেলিয়ে আসছেন। এশিয়ান গেমসে যেমন দেখা গেছে ঠিক তেমনি সাফেও মিলেছে তার প্রমাণ। এই পদ্ধতিতে খেলে প্রতিপক্ষ দলকে নিচ থেকে বিল্ডআপ খেলতে বাধাঁ দেওয়া হয়। যাতে করে নিজেদের সীমানাটা সুরক্ষিত থাকে। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের পায়ে যত দ্রুত বলা যায় তার চেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে বল কেড়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি সামনের পাসিং পজিশনগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই কাজটি বেশ চাতুরতার সাথেই করতে পারছে বাংলাদেশ দল। অন্ততঃপক্ষে জাতীয় দলের সাবেক দুই কোচ মারুফুল হক ও সাইফুল বারী টিটু বেশ নজর রাখছেন কোন পজিশনের কিভাবে কোচ জেমি ডে খেলোয়াড়দের খেলিয়ে যাচ্ছেন। এই পদ্ধতি মাঠে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়েছে খেলোয়াড়দের বয়স কম থাকার কারণে। বাংলাদেশের এই দলটি অনেকটাই অনুর্ধ্ব-২৩ দলের। সিনিয়র ৫/৬ জন খেলোয়াড় রয়েছেন। তবে প্রথম একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন মোটে চারজন। বাকি সাতজনের গড় বয়স ২২ বছরেরও নিচে। যারা নিজেদের প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছে। যার ফল বাংলাদেশ পেয়েছে এশিয়ান গেমসে আর পাচ্ছে সাফ ফুটবলেও। দারুণ ছন্দে রয়েছে বাংলাদেশ দল। তরুণ এসব খেলোয়াড় পুরো মাঠেই নিজেদের দাপট ধরে রাখার চেষ্ট অব্যহত রেখেছেন। যে পরিবর্তনটা হওয়া খুব জরুরি সেটা এবার অনেক বছর পর হয়েছে। হার না মানার মানসিকতা তৈরি হলে তার প্রভাব কতটা পড়ে সেই বিষয়টিও আচ করা গেছে। দ্বিতীয় ম্যাচে খেলা প্রতিপক্ষ পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল ২৬ এর বেশি। বয়স বলছে তারা বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু মাঠে ঠিকই জয় এসেছে বাংলাদেশের। কারণ বয়সে তারা অনেক তরুন। এবারের বিশ্বকাপের শিরোপা জেতা ফ্রান্স দলও ছিল তারুণ্য নির্ভর। তাদের শিরোপা জেতাও সহজ হয়ে যায়। একটা সময় বাংলাদেশের ষ্ট্রাইকারদের পায়ে অনেক গোল থাকত। কিন্তু গত এক দশকে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ঘড়োয়া ফুটবলে দেশী ষ্ট্রাইকারদের সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রেখে বিদেশীদের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল ক্লাবগুলো। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। দলের জয়ে দেশীদের ভুমিকা রাখতে না পারাই ছিল বড় কারন। কোচ জেমি ডে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই ডিফেন্ডারকে দিয়ে চেষ্টা করেছেন ষ্ট্রাইকার বানানোর। মাহবুবুর রহমান সুফিল ও সাদ উদ্দিন তাদের মধ্যে অন্যতম। ইন্দোনেশিয়ার মাটিতে কাতার বধের নায়ক সাদ। আর ভুটানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে গোল পেয়েছেন সুফিল। এছাড়া ডিফেন্ডার হিসেবে প্রথম দুই ম্যাচে দুটি গোল করেছেন তপু বর্মন। তাহলে বলাই যায় বাংলাদেশ দল এখন আলাদা কোন ষ্ট্রাইকারের উপর নির্ভরশীল নয়। কোচ হিসেবে সুফিলের গোল পাওয়াটা কোচের জন্য ছিল স্বস্থির। এছাড়া এশিয়ান গেমসে থাইল্যান্ডের বিপক্ষেও তিনি গোল করেছিলেন। পাকিস্তানের ব্রাজিলের কোচ বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার আগে জানিয়েই দিয়েছেন, তাঁরা নাকি সুফিলকে নিয়ে একটু বাড়তি বিশ্লেষণই করেছেন। বাংলাদেশের আরেকটা সমস্যা ছিল সেটপিসে গোল হজম করা। ছোট কিংবা বড় সব দলেই ফ্রি কিক থেকে গোল হজমের একটা ধারা তৈরি হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকেও বের হতে পেরেছে বাংলাদেশ। এছাড়া গোলরক্ষকদের নিয়ে আলাদা কাজ করার কারণেও এই অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সবদিক মিলিয়ে যদি বলা হয়, নতুন দিনের দেখা মিলেছে বাংলাদেশের ফুটবলে তাহলে কি খুব বেশি ভুল বলা হবে? আসলে সাফে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে পরাজয় ফেলে দিয়েছে নতুন ভাবনায়। এই ম্যাচটা যেখানে ড্র করলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ সেটিও পারলনা বাংলাদেশ। অনেক বছর পর টানা তিন ম্যাচে গ্যালারি ভর্তি দর্শকরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়েছে। এক গোলরক্ষক শহিদুল আলম সোহেলই হাস্যকর ভুল করে বাংলাদেশকে বিদায়ের পথ দেখিয়েছেন। অথচ ভুটান ও পাকিস্তানের বিপক্ষে পজিটিভ ফুটবল খেলেছে স্বাগতিকরা। নেপালে এসে সেই জয়রথ আটকে গেল। দুই জয়ও পারলনা তিন আসর পর সেমিফাইনালে নিয়ে যেতে। কাজি সালাউদ্দিন জমানায় টানা চার সাফের আসর থেকে খালি হাতে ফিরেছে বাংলাদেশ দল। বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, এই দলটার পাশাপাশি কোচের উপর ভরসা রাখতে। দিন বদল হলে এদের দিয়েই সম্ভব। পিছিয়ে পড়ার চিন্তা করাটা হবে বোকামী। এখন বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে কেমন খেলে সেটার উপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ