ঢাকা, বৃহস্পতিবার 13 September 2018, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইংল্যান্ডে অচেনা এক ভারত

অরণ্য আলভী তন্ময় : দেশের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে পেরে ওঠা দল ক্রিকেট বিশ্বে খুব একটা নেই। আবার ভারতের জন্য দেশের বাইরে ভাল খেলাটা বেশ কষ্টের। সেটাই আবার প্রমাণিত হলো ইংল্যান্ড সফরে। ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের পরিসংখ্যান মোটেই ভাল নয়। দীর্ঘ দিনে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে মাত্র তিনটি সিরিজ জিততে পেরেছে তারা। সবশেষটি সেই ২০০৭ সালে। অনেকে ভেবেছিলেন সুপার বিরাট কোহলির নেতৃত্বে বদলে যাওয়া ভারত এবার ভাল কিছু করবেন। কিন্তু সেটিও হলো না। এজবাস্টন টেস্টে ৬০ রানে হারের মধ্য দিয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ খুইয়েছে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলটি। যদিও এক টেস্টে জয় ও হেরে যাওয়া তিন ম্যাচের দুটিতে স্বাগতিকদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছে সফরকারীরা। অধিনায়ক বিরাট কোহলি বলেন, ‘আমরা কি খুব খারাপ খেলেছি, তা তো মনে হয়না। লর্ডস টেস্ট বাদ দিলে আমার মনে হয় না কোনও ম্যাচ একপেশে হয়েছে। দুটো দল সমানে-সমানে লড়াই করেছে। টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য এটাই। ওভারঅল ছেলেরা ভাল খেলেছে। সিরিজের ফয়সালা হয়ে গেলেও ওভালের শেষ টেস্টে আমরা একই রকম তীব্রতা নিয়ে মাঠে নামব।’ তিনি আরও যোগ করেন,‘অনেক কিছু নিয়েই আলোচনা করা যেতে পারে। অনেক কিছু ঘটেছে এই টেস্টে। কোনটা হলে কী হত, কোনটা না ঘটলে আমরা জিততে পারতাম কি না, সে সব নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তবে খুব নেতিবাচক দিক নেই।’ ভারত এ নিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে মোট ১৮তম সিরিজ খেলছে। এর মধ্যে সফরকারীরা জিতেছে মাত্র তিনবার। শেষবার ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডে রাহুল দ্রাবিড়ের নেতৃত্বে তিন টেস্টের সিরিজে জিতেছিল ভারত। সেই সফরের পর ভারত দুবার ইংল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছে। দুবারই মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে খেলে খুব খারাপভাবে সিরিজ হারে ভারত। ২০১১ ইংল্যান্ড সফরে চার টেস্টের সিরিজে ভারত ০-৪ হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল। তারপর ২০১৪ সফরে পাঁচ টেস্টের সিরিজে ১-৩ এ্যালিস্টার কুকের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ হারে ভারত। তার মানে ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারত শেষ ১৩টা টেস্টে জিতেছে দুটিতে, হার ১০। ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে সবুজ জীবন্ত পিচে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের টেকনিকে দুর্বলতা প্রকট। পেসের পাশাপাশি সুইংয়ে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা কাবু হয়ে পড়েন। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের এই রোগটা ভারী পুরনো। এখনও পর্যন্ত ইংল্যান্ডে মাত্র তিনটি সফরে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছিল ইংল্যান্ড পেসারদের। ১৯৭১ সফরে অজিত ওয়াদেকরের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডে ৩ ম্যাচের সিরিজে ১-০ জেতে ভারত। তারপর ১৯৮৬ সালে কপিল দেবের নেতৃত্বে তিন টেস্টের সিরিজে ২-০ জিতেছিল ভারত। আর তারপর একই রকম কাজ করে ২০০৭ সালে সিরিজ জিতে দেখান দ্রাবিড়রা। এবার কোহলিও পারলেন না। শুরুটা হয়েছিল এজবাস্টনে ৩১ রানের হার দিয়ে। লর্ডসে বড় লজ্জা পড়া সফরকারীরা হারে ইনিংস ও ১৫৯ রানের বিশাল ব্যবধানে। তবে ট্রেন্টব্রিজে ২০৩ রানের বিশাল জয়ে ঘুড়ে দাঁড়ানোর ম্যাচটা ভারতীয়দের অনেক দিন মনে থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বীতার ইঙ্গিত দিয়েও শেষ পর্যন্ত সাউদাম্পটন টেস্টে ৬০ রানে হারে ভারত। এক ম্যাচ আগেই পাঁচ টেস্টের সিরিজটা ৩-১এ হাতছাড়া হয়। ২৪৫ রানের জয়ের লক্ষ্যে নামা সফরকারীরা চতুর্থ দিনে অলআউট ১৮৪ রানে। চেতেশ্বর পুজারার সেঞ্চুরির সৌজন্যে প্রথম ইনিংসে তাদের সংগ্রহ ছিল ২৭৪। ইংল্যান্ড ২৪৬ ও ২৭১। পুরো সিরিজে ব্যাট হাতে দলকে একাই টেনেছেন কোহলি। কেউই অধিনায়ককে সেভাবে সঙ্গ দিতে পারেননি। কোহলি অবশ্য স্বাগতিক ইংলিশদের প্রশংসা করেছেন, ‘আমরা ভাল খেলার পুরো চেষ্টাই করে যাচ্ছি। ইংল্যান্ড ক্রিকেটাররা অক্লান্তভাবে চাপটা রেখে গেছে। ম্যাচের কঠিন মুহূর্তগুলোতে আমাদের চেয়ে বেশি সাহস দেখিয়েছে। বিশেষ করে ওদের টেল-এন্ডার ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য ছিল অনেক।’ তরুণ ইংলিশ অলরাউনআর স্যাম কুরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সে দারুণ একজন ক্রিকেটার। আমি স্যাম কুরানকে অভিনন্দন জানাতে চাই।’ এজবাস্টন এবং সাউদাম্পটন দু-জায়গাতেই জেতার মতো অবস্থা ছিল কোহলিদের এবং দু’টো মাঠেই কুরান কাঁটা হয়ে বিঁধলেন। ভারত অধিনায়ক তাই জানেন, মঈন আলি ম্যাচসেরা হলেও কে তাঁদের সিরিজ থেকে ছিটকে দিয়েছে। এজবাস্টনে দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডকে চেপে ধরার পরেও ব্যাট হাতে কুরান-ঝড় ভারতের সামনে টার্গেট স্কোর বাড়িয়ে দেয়। এখানেও প্রথম ইনিংসে ৮৬-৬ থেকে কুরানের ৭৮ ইংল্যান্ডকে পৌঁছে দেয় ২৪৬ রানে। দ্বিতীয় ইনিংসেও বাঁ হাতি অলরাউন্ডার করেন ৪৬। দল হারলেও নতুন রেকর্ড গড়েন ক্যাপ্টেন কোহলি। অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে ৪০০০ রান করলেন তিনি। যা এর আগে কোনও ভারতীয় অধিনায়ক করতে পারেননি। অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে ৪০০০ রান করতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ শুরু হওয়ার আগে ৫৪৪ রান দরকার ছিল। চার টেস্টে ভারত অধিনায়ক ঠিক সেই রানই করেছেন। সিরিজে ২৯ বছর বয়সী ৫৭.০২ গড়ে করেছেন ৫৪৪ রান। যার মধ্যে দুটো শতরান, তিনটে অর্ধশতরান। কোহলির পেছনে রয়েছেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। অধিনায়ক হিসেবে ৬০ টেস্টে তিনি করেছেন ৩৪৫৪ রান। যাতে রয়েছে পাঁচটি শতরান ও ২৪টি অর্ধশতরান। তালিকায় তিনে সুনীল গাভাস্কার। কিংবদন্তি ওপেনার টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে করেছেন ৩৪৪৯ রান। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে ১৫০০ রানও করে ফেলেছেন কোহলি। তালিকায় তিনি ছয়ে। শীর্ষে শচীন টেন্ডুলকর। ৫১.৭৩ গড়ে শচীন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২৫৩৫ রান করেছেন। যাতে সাতটি শতরান ও ১৩টি অর্ধশতক। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্টে দেড় হাজারের বেশি রান রয়েছে সুনীল গাভাস্কার (২৪৮৩), রাহুল দ্রাবিড় (১৯৫০), গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ (১৮০০) ও দিলীপ বেঙ্গসরকরের (১৫৮৯)। বিদেশে টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডও এখন কোহালির দখলে। সৌরভ গাঙ্গুলী ১৬৯৩ রান এত দিন ছিল বিদেশে ভারতীয় অধিনায়কের সর্বাধিক রান। কোহালি তাকে টপকে গেছেন। মাত্র ১৯ টেস্টে তিনি এই কৃতিত্বের অধিকারী হলেন। সৌরভ সেখানে বিদেশে অধিনায়ক হিসেবে ২৮ টেস্ট খেলে ১৬৯৩ রান করেছিলেন। এই তালিকার তিনে আছেন ধোনি। ৩০ টেস্টে তিনি করেছিলেন ১৫৯১ রান। বিদেশে অধিনায়ক হিসেবে ২৭ টেস্ট ১৫১৭ রান করেছেন মেহাম্মদ আজহারউদ্দিন। রাহুল দ্রাবিড় বিদেশে অধিনায়ক হিসেবে ১৭ টেস্টে ১২১৯ রান করেছেন। তবে সব মিলিয়ে সিরিজটা জয় কিংবা ড্র্র করলেই কেবল ভারতে দেশের বাইরে সেরা দল হিসেবে অভিহিত করা যেত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ