ঢাকা, সোমবার 17 September 2018, ২ আশ্বিন ১৪২৫, ৬ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে সংখ্যালঘুদের নাভিশ্বাস

ইবরাহিম রহমান : জাতিগত শ্রেণী ও বর্ণগত বিভেদে বিভক্ত ভারতীয় সমাজ। সংস্কৃতি থেকে সভ্যতা, ধর্ম থেকে জাতীয়তা, বিশ্বে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে আঞ্চলিক ও জাতিগত আন্দোলন জোরদার। ফরেন পলিসি জার্নালের মতে, ভারতে অন্তত ৩০টি জাতিগত বিদ্রোহী সশস্ত্র আন্দোলন চলছে। এই বিদ্রোহী আন্দোলনগুলোর একটা সাধারণ চরিত্র হলো এরা সকলেই অহিন্দু জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। পাশাপাশি ভারতীয় রাষ্ট্র মনে করে এই আন্দোলনগুলো মূলত হিন্দু প্রাধান্য ও কর্তৃত্বের জন্য চরম হুমকি। এসব আন্দোলন ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদ ও অনাস্থার মূল কারণ অহিন্দুদের উপর হিন্দুদের কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য। অহিন্দুদের উপর হিন্দুদের অব্যাহত জুলুম ও অত্যাচার।
অব্যাহত ভুল বোঝাবুঝি ও আস্থার অভাবের পেছনে বহুবিদ কারণ: অর্থনৈতিক বৈষম্য, নি¤œশ্রেণীর হিন্দুদের প্রতি চরম অবহেলা, ধর্মীয় নিপীড়ন, কোটা পদ্ধতি, জাতিগত নিধন প্রভৃতি। ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। হিন্দু দৌরাত্ম বৃদ্ধির পর অহিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ থেকে আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে। সংখ্যালুঘুদের বর্তমান নাজুক অবস্থা, তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট সৃষ্টি করেছে। কারণ সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি, নিরাপত্তাহীনতা বোধ থেকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হতাশাগ্রস্ত।
২০১৬ সালের বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভারতে প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন ভারতীয় চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে তফসিলী সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। প্রতি দুইজনে একজন তপশিলি সম্প্রদায়ের সদস্য। এরা সকলেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এ্যাপ্লাইড ইকোনোমিক রিচার্সের রিপোর্টে প্রকাশ, মুসলিমদের অবস্থা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে আরও খারাপ। প্রতি দশজন মুসলিমের মধ্যে তিনজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ভারতীয় অর্থনীতি শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য অর্থাৎ অহিন্দুদের অংশও হিন্দুরাই ভোগ করে থাকে। পল্লী অঞ্চল ও শহরাঞ্চলের দারিদ্র্যের কথা চিন্তা করলে আশ্চর্যান্বিত হতে হয়। সামান্য আয় দ্বারা গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠী কিভাবে জীবন ধারণ করে।
সমাজের কোন বিশেষ অংশকে সমাজ থেকে বিচ্যুত করা প্রান্তিকীকরণের ক্ষেত্রেও সরাসরি আনুপাতিক। ভারতে সামাজিকভাবে প্রান্তিক গোষ্ঠীও সেই নি¤œশ্রেণীর হিন্দুরাই, দলিত ও সকল অহিন্দু সম্প্রদায়। আপাত প্রতীয়মান হয়, সে বিষয়টি যেন অহিন্দুদের প্রতি হিন্দুদের অবহেলা বাস্তবে আসলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে। যদিও প্রান্তিকীকরণ একটি ঐতিহাসিক সত্য, এর দ্বারা শুধু হিন্দু প্রাধান্যকেই আরও এগিয়ে দেয় এমনকি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। প্রান্তিক গোষ্ঠী এখন অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন এমনকি তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী সব কিছুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে।
অহিন্দু জনগোষ্ঠী মুসলিম, খৃস্টান ও শিখ সম্প্রদায় যৌথভাবে হিন্দুত্ববাদের হুমকির সম্মুখীন। হিন্দুত্ববাদের নীতি হলো সহিংসতা, বৈষম্য, সংখ্যালুঘুদের উপর ধর্মীয় নিপীড়নের মাধ্যমে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা। বিজেপি ও আরএসএস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় এই নীতিগুলোর চর্চা করা হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুসারে আরএসএস ৫ হাজার ধর্মীয় উগ্রবাদী নিয়োগ দিয়েছে শুধুমাত্র গরু পাচার রোধ করার জন্য। ২০১৭ সালে খৃস্টানদের বড় দিন (খৃস্টমাস) খৃস্টান সম্প্রদায় চরম নিরাপত্তার অভাব বোধ করেছে এবং খৃস্টানদের বহু অনুষ্ঠান আরএসএস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।
হিন্দুদের হাতে শিখ সম্প্রদায় নিগ্রহ এখন বিশ্ব মিডিয়ায় শীর্ষ সংবাদ। ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে শতকরা ১৭% ভাগ শিখ মাতৃভূমি ভারত ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তারা এখন আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের স্থায়ী-অস্থায়ী বাসিন্দা।
ধর্মীয় নিপীড়ন নির্যাতনের কারণ দেখিয়ে শিখরা এই সব দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করছে। বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত সকল শিখ সম্প্রদায় স্বাধীন খালিস্তানের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। সম্প্রতি শিখ সম্প্রদায় স্বাধীন খালিস্তান রাষ্ট্রের দাবিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনে বিরাট মিছিল ও শো ডাউন করে শিখদের প্রতি ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়েছে।
বর্তমানে ভারতীয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো কোটা পদ্ধতি। অধিকাংশ জনসংখ্যার বিপরীতে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে এই কোটা পদ্ধতি। ভারতীয় সমাজে শ্রেণি প্রথার কারণেই এই কোটা পদ্ধতির উদ্ভাবন। তপশিলি গোষ্ঠি, তপশিলি নৃগোষ্ঠি ও অন্যান্য অনুন্নত গোষ্ঠির জন্য ৪৯% শতাংশ কোটা প্রদান করা হয়েছে। প্রথম দিকে কোটা পদ্ধতি প্রশংসা লাভ করে।
বর্তমানে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিক্ষোভ চলছে। সমালোচনা ও বিক্ষোভের কারণ হলো শতকরা ৪৯% সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় মাত্র শতকরা ২/৩ অংশের জন্য। অন্যদিকে কোন কোন প্রধান হিন্দু সম্প্রদায় কোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে দাবি জানাচ্ছে। এদর উদ্দেশ্য কোটার আর্থিক সুবিধা ভোগ করা। প্রধান হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাপ্য সুবিধা অন্য সম্প্রদায় ভোগ করছে।
জাতিগত নিধন এখন ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটা অংশ। বহু ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্যে “অপারেশন ব্লু স্টার” ও “গুজরাট দাঙ্গা” এবং সাম্প্রতিক কালে ৪০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ভারতের টালবাহানা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এড়ায়নি। ভারত সরকার এই ৪০,০০০ হাজার রোহিঙ্গাকে বরদাশত করতে পারছে না। ভারত সরকার ভারত থেকে তাদের বিতাড়নের পরিকল্পনা করছে। মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের বিষয়ে ভারতের নীরবতা একটি কূটনৈতিক অপরাধ বলে গণ্য করা যায়। ভারতে অবস্থানরত ৪০,০০০ রোহিঙ্গা বিতাড়নের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে বিজেপি ও আরএমএস কী পরিমাণ মুসলিম বিদেশী এবং অহিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যেকোন অত্যাচার নিপীড়ন আগ্রাসন তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক।
ভারতে জাতিগত সহিংসতা এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে ৩০০টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় বলে প্রকাশ যার ফলে ৩২২ জন নিহত হয় এবং ৭,৩৯৮ জন আহত হয়।
এই পরিসংখ্যানগুলো ভারতের সংখ্যালঘু নাগরিকদের করুন অবস্থার একটা ভূমিকা মাত্র। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার পরিকল্পিতভাবে আরএসএস এর ব্যানারে ভারতকে একটা সম্পূর্ণ হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বিজেপি সরকারের এই ভূমিকা বিজেপির জন্য একটা দুঃস্বপ্ন হিসেবে আবির্ভুত হবে যার প্রমাণ গুজরাটের নির্বাচন।
এই নির্বাচনে কংগ্রেস ৭৭টি আসন লাভ করে বিজেপির ভূমিধস বিজয়কে আটকে দিয়েছে। ভারতীয় জনতাপার্টি (বিজেপি) যদি তাদের হিন্দুত্ব বাদী-নীতি পুর্নবিবেচনা না করে তাহলে বিজেপি কতিপয় সমমনোভাবপন্ন হিন্দু নাগরিকের দলে পরিণত হতে বাধ্য।
সংখ্যালঘুদের এই করুন অবস্থায় বিজেপি আর এসএমএর রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের ফলে সংখ্যা লঘু সম্প্রদায় মুসলিম খৃস্টান, বৌদ্ধ শিখ তথা সকলে সম্প্রদায়ের জন্য চরম হুমকির কারণ। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাধান্য দৌরাত্ম্য ও রক্তচক্ষুর মুখোমুখী অহিন্দুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ