ঢাকা, মঙ্গলবার 18 September 2018, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘আর নয় ডুবে মৃত্যু’ : আমাদের কি করণীয়

জিয়া হাবীব আহসান : ­নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। তবুও সংবাদ শিরোনাম হয় ‘পুকুরে ডুবে মৃত্যু কিংবা নদীতে ডুবে মৃত্যু’।  অথচ সাঁতার আমাদের পূর্বপুরুষের অস্থিমজ্জার সাথে মিশে আছে। আমাদের গর্ব ব্রজেন দাশের মত বিখ্যাত সাঁতারুর জন্ম হয়েছিল এ দেশে। তিনি ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি যিনি ইংরেজদের দম্ভ চূর্ণ করতে ২৩টি দেশের প্রতিযোগীকে পরাজিত করে পার হয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল। তিনি সর্বমোট ৬ বার ইংলিশ চ্যানেল বিজয় করেন। আরো বলতে পারি চট্টগ্রামের কিংবদন্তী সাঁতারু বজল আহমদের কথা। যিনি ১৯৬১ সালে চট্টগ্রামের পক্ষে ১৩ বছর বয়সে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সাঁতারে সিনিয়র বিভাগে সর্বকনিষ্ট সাঁতারু হিসেবে বড় বড় প্রতিযোগীদের হারিয়ে ৩য় স্থান দখল করে স্বর্ণপদক লাভে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। যার কিংবদন্তী সর্বজনবিদিত। বিখ্যাত সাঁতারু মুন্সিগঞ্জের কৃতী সন্তান মোশারফ হোসেন ও রাজশাহীর রওশন আলী এবং নারায়ণগঞ্জের সন্দার ইদ্রিসের নাম এখনো মুখে মুখে। অথচ তাদেরই উত্তরসূরী আমাদের সন্তানদের শহরকেন্দ্রিক জীবন প্রবাহ অলস, অকর্মণ্য ও পরনির্ভরশীল করে দিচ্ছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার ব্রিগেড, মেরিন, বিপিএডসহ যে কোন প্রতিরক্ষা বিভাগে পরীক্ষা দিতে সাঁতার জানতে হয়। শরীর চর্চার অন্যতম মাধ্যম হল দৌড়ঝাঁপ ও সাঁতার।  গত কয়েকদিন পূর্বে একটি দৈনিক পত্রিকায় ‘৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ চকরিয়া’ শিরোনামে এক হৃদয়বিদারক সংবাদ চোখে পড়লো (সূত্র- ১৬ জুলাই, ২০১৮, দৈনিক আজাদী) বা  গোসল করতে গিয়ে পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু।  চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন এনায়েত বাজার গোয়াল পাড়ার পুকুরে কৃষ্ণ ঘোষ (০৭) নামের শিশুটি অপর ১০টা ছেলের সাথে গোসল করতে যায়।  কিন্তু অন্যরা ফিরে আসলেও সে ফিরে আসেনি।  পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা এবং স্থানীয় লোকজন তাকে পুকুরের ঘাটের নিচে মৃত অবস্থায় খুঁজে পায়। কিংবা পূর্ব সৈয়দাবাদ প্রবাসী খোরশেদ আলমের ছেলে ফরহাদুল আলম তাছিন (৮), মেয়ে মরিয়ম জান্নাত তুষ্পি (৫) তাদের পুকুরে পড়ে মারা যায়। একই দিনে উপজেলার চরগাচরের রফিক আহমদের এক বছরের শিশু বাথরুমের বালতিতে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। (সূত্র- ২৫ আগস্ট, ২০১৭, দৈনিক পূর্বকোণ) এই রকম অসংখ্য হৃদয়বিদারক সংবাদ নিয়মিত পত্রপত্রিকায় চোখে পড়ে।  প্রতিবছর দেশে পানিতে ডুবে মারা যায় প্রায় ১৭ হাজার শিশু থেকে ১৯ হাজার। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু নিয়ে দেশে খুব একটা আলোচনা-সমালোচনা নেই। সাঁতার ক্লাব-এর ২০০৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল  পর্যন্ত ১০ বছরব্যাপী গবেষণায় পরিচালিত তথ্যানুসন্ধানে  জানা যায় প্রতিবছর গড়ে ১৯ হাজার শিশু মারা যায়, ১-৩ বছর বয়সের শিশু বালতিতে পড়ে, ২-৭ বয়সের শিশু পারিবারিক তত্ত্বাবধানের অভাবে পানিতে ডুবে মারা যায়, ৭ এর উপরে বয়সের যারা সাঁতার না জানার কারণে। কোন সময়ে  এসব দুর্ঘটনা ঘটে? সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টায়, মে মাস থেকে নভেম্বর মাস পযন্ত সব চেয়ে বেশী ঝুঁকি থাকে। সাঁতার ক্লাব পত্রিকার সংবাদ সংগ্রহ করে এ গবেষণা পরিচালনা করে। ২০১৭ সালে  সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর সার্ভের থেকে জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। এর চার গুণ অর্থাৎ প্রায় ৬৮ হাজার শিশু পানিতে ডুবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। মৃত্যুর এ হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য পানিতে ডোবা প্রতিরোধে একটি জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে শিগগিরই তা জারি করা হবে। চট্টগ্রামসহ সারাদেশেই এ ধরনের দুর্ঘটনায় শিশুকিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও হারাচ্ছেন প্রাণ। বারবার এমন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনায় সচেতন মহলে উঠছে নানা প্রশ্ন। তাদের প্রশ্ন এসব মৃত্যু কি কেবল দুর্ঘটনা? সমুদ্রে যেসব প্রাণহানি ঘটছে তার বেশিরভাগই সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন স্পটগুলোতে হচ্ছে। নদীমাতৃক দেশে বাংলাদেশ সাঁতার জানা আবশ্যক। দেশের আনাচে কানাচে পুকুর, জলাশয়, হৃদ, খাল, ঝিরি, ছড়া, নদী ও হাওড়। দক্ষিণ পূর্বাংশ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। তাই পানির দেশ বাংলাদেশে সাঁতার জানা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। সাঁতার না জানাতে প্রতি বছর হাজারো শিশু, কিশোর ও সাধারণ মানুষ মারা যায়। তাছাড়া জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা কবলিত অঞ্চলে অনেক মানুষ পানির স্রোতে ভেসে যায়। অথচ সাঁতার জানলে অনেক মানুষ বেঁচে যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থাতেও অনেক শিশু ও কিশোর অসাবধানতার কারণে পুকুরে, নদী ও সমুদ্রে ডুবে মরে। এই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা কারোই কাম্য নয়। স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমাদের ছোট বড় সকলকে সাঁতার জানা ও প্র্যাকটিস করা আবশ্যক। সাঁতার বাংলাদেশের জন্য উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটি খেলাও বটে। অন্যান্য খেলার জন্য সরকার ও আমরা যেভাবে জোর দিচ্ছি এবং ব্যয় করছি সাঁতারে সেরকম কোন আগ্রহ দেখা যায় না। অথচ খুব কম খরচে সাঁতার শেখা যায় এবং দেশে বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করা যায়। এখানে উল্লেখ করা যায়, শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ২০১৬ সালের দক্ষিণ এশিয়ার সাঁতারের অলিম্পিক হিসেবে খ্যাত সাউথ এশিয়ান অকোয়াটিক চ্যাম্পিয়ানশীপের কথা। বাংলাদেশ সেখানে ৩য় স্থান লাভ করে। ৭ জন সাঁতারু নিয়ে ২টি স্বর্ণ, ২টি সিলভার আর ৫টি ব্রোঞ্চ লাভ করে দেশের মুখ উজ্জ¦ল করে। এছাড়াও সাঁতার থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো অজস্র পুরস্কারে নিজের ঝুলি ভারী করেছে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সরকারী উদ্যোগ এবং সহায়তা এক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করবে।  পণ্য ও যাত্রী বহনে নদীপথ অন্যতম। বাংলাদেশে নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার। গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ নৌকা ব্যবহার করে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ হাজার নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নৌযান চলাচল করছে। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান মিডিয়াকে বলেন, পানিতে ডোবা ও অসুস্থতার পরিস্থিতি নির্ণয়ের জন্য সরকার হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি নামে সার্ভে পরিচালনা করে। এ অবস্থায় সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবা নির্মূল করতে চায়। এই বয়সী শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু মারা যায় পানি ধরে রাখার পাত্রের পানিতে ডুবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রনিং প্রিভেনটিং এ লিডার কিলার প্রতিবেদনে পানিতে ডুবা প্রতিরোধে ১০টি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিটি দেশকে তার উপযোগী জাতীয় পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কাসহ আরো কয়েকটি দেশ এ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। আর্থ-সামাজিক ও ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন দেশে পানিতে ডুবার কারণ ভিন্ন ভিন্ন। পানিতে ডুবে মৃত্যুরোধে বাংলাদেশেরও উপযোগী কৌশল তৈরি করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এই খসড়া কর্মকৌশল তৈরি করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তু দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগ নেই।  উল্লেখ্য যে, এই হতাশা-নিরাশার মধ্যে আশার প্রদীপ জেলে বিশিষ্ট কবি, অধিকারকর্মী ও ফটো আর্টিস্ট বন্ধুবর ওচমান জাহাঙ্গীর। তারা ক’জনে গড়ে তুলেছেন ‘সাঁতার ক্লাব’ নামের একটি সামাজিক আন্দোলন। সাতাঁর ক্লাবের লক্ষ্য হচ্ছে সাঁতার শেখানোর পাশাপাশি জাতীয় আন্তর্জাতিক মানের সাঁতারু সৃষ্টি করা, পুকুরে, নদী, সমুদ্রের পানিতে ডুবে আর কারো মৃত্যু না ঘটে সে লক্ষ্যে সচেতনতা মূলক সামাজিক যোগাযোগ কর্মসূচী গ্রহণ করা। ওচমান বলেন,‘সাঁতার জানা জীবনের অংশ, সাঁতার না জেনে পানিতে নামাটা অপরাধ, যেহেতু পানিতে ডুবে মারা আত্মহত্যার সামিল, তাই সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক হওয়া চাই।” এ ব্যাপারে স্থানীয় জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবভিত্তিক প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে সাঁতার ক্লাব বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সাঁতারকে সার্বজনীন করার লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে প্রথম ফেব্রুয়ারি উক্ত সাঁতার ক্লাব গঠন করা হয়। অদ্যাবধি সীমিত আকারে তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বিশেষ করে পানিতে ডুবে মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে সচেতনমূলক প্রোগ্রাম করার পাশাপাশি সাঁতার শেখার প্রশিক্ষণ ও শেখার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধকরণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় বড় পুকুর নিয়ে সাঁতার ক্যাম্পেইন ক্যাম্প চালু রয়েছে। তার মধ্যে বহদ্দার বাড়ির পুকুর অন্যতম। এই জন্য বহদ্দার পরিবারের উদারতায় প্রচুর ছোট ছোট বাচ্চা আজ সাঁতার শিখছে। তাঁদের প্রতি আমাদের বিশেষ কৃতজ্ঞতা রইলো। গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বহদ্দার বাড়ির সন্তান বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এম রেজাউল করিম চৌধুরী উদ্ভোধনের মাধ্যমে সাঁতার ক্লাবের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের যাত্রা শুরু করে। আর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি বিশিষ্ট লেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিক কবি মাহাবুব উর রহমানের প্রতি, যিনি দীর্ঘদিন যাবৎ সাঁতার-এর সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন।   
সমস্যা ও সুপারিশমালা :
১। সম্প্রতি বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। সঠিক তথ্য-উপাত্ত না থাকায় অতীতে এ বিষয়ে জাতীয় কর্মকৌশল তৈরি করা যায়নি। কর্মকৌশল প্রস্তুত করতে হবে।
২। বন্যা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পানিতে ডুবার ঝুঁকি বাড়ছে। যেসব জনগোষ্ঠী বন্যাপ্রবণ এলাকায় বসবাস করে সেখানে বন্যা সতর্কীকরণ ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর ব্যবস্থা দুর্বল থাকলে পানিতে ডুবার ঝুঁকি বাড়ে। কক্সবাজার ও কুয়াকাটা দেশের অন্যতম পর্যটন স্থান। পর্যটকরা এসব স্থানের সঙ্গে পরিচিত না হওয়ায় পানিতে ডুবার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের কোনো সমুদ্র সৈকতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে লাইফগার্ডের ব্যবস্থা নেই (কক্সবাজারে লাইফ গার্ডের তৎপরতা অত্যন্ত সীমিত)।  প্রতি বছর সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসে অনেক মানুষ সাগরে ডুবে প্রাণ হারায়। লাইফ গার্ডের তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।  
৩। মানুষ এবং জলাধারের মধ্যে বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা না থাকায়, শিশুদের যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব, সাঁতার না জানা, অনিরাপদ বা উন্মুক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নৌযানে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন এবং ত্রুটিপূর্ণ নৌযান ব্যবহার পানিতে ডুবে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
৪। পানিতে ডুবাসহ অন্যান্য ইনজুরির প্রতিরোধ ব্যবস্থা শনাক্ত করার জন্য প্রিভেনশন অব চাইল্ড ইনজুরিস থ্রো সোস্যাল ইন্টারভেনশন অ্যান্ড এডুকেশন নামে কমিউনিটিভিত্তিক একটি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তাদের গবেষণায় শিশুদের পানিতে ডুবার প্রতিরোধক হিসেবে কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ৬ থেকে ১৮ মাসের শিশুর জন্য প্লে-পেন ব্যবহার করা। জলাধারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধক স্থাপন বিশেষ করে গভীর নলকূপ ঢেকে রাখা বা জলাধারে বেড়া দেওয়া বা প্লে-পেন ব্যবহার করা। প্লে-পেন হচ্ছে চতুর্দিকে বদ্ধ একটি স্থান যেখানে ৬ থেকে ১৮ মাসের শিশুদের বিনা তত্ত্বাবধানে নিরাপদে রাখা যায়।
৫। স্কুলগামী শিশুদের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাঁতার শেখানো। সাধারণ মানুষকে বুকে চাপ মুখে শ্বাস দেওয়াসহ প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষ করে তোলা।
৬। ১০ বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য পানিতে ডুবার ঝুঁকি সম্পর্কে বোঝানো এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে মা-বাবাকে সচেতন করা, বন্ধুদের সঙ্গে পানিতে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়াতে সচেতন করা, পুকুর, নদী, জলাশয় এবং সমুদ্রের পানিতে ডুবার ঝুঁকি এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতন করা, বিশেষ করে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস জাতীয় দুর্যোগের সময় এসব সতর্কতা বাড়াতে হবে। নৌকা, জাহাজ এবং ফেরি চলাচল বিষয়ক নিরাপদ আইন নিশ্চিত করা, বন্যা এবং অন্যান্য পানি সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি প্রশমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নে জনগণকে পানিতে ডুবা মৃত্যু থেকে মুক্ত করা।
০৭। প্রাণহানি বা দুর্ঘটনার জন্য সাঁতার না জানাটা যেমন দায়ী তেমনি অসচেতনতাও বড় একটা কারণ। যেমন কক্সবাজারে যেসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটে সেখানে বেশিরভাগই বাইরে থেকে আসা পর্যটক। যারা অনেকে সাঁতার জানা সত্ত্বেও দুর্ঘটনায় পতিত হয়। যার মূল কারণ আমাদের সাঁতার সেখানো হয় মূলত বদ্ধ পরিবেশে যেমন সুমিংপুলে। যেখানে জোয়ার-ভাটা বা স্রোতের বিষয়গুলো নেই। বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া দরকার।                
০৮।  আমরা কিভাবে ওয়াটার সেফটি করতে পারি নিশ্চিত করতে পারি এক থেকে সাত বছরের শিশু পারিবারিক তত্ত্বাবধান করা পাশাপাশি শিশুদের কি পানি নামার সেই বিষয়ে সতর্ক করা। ৭ বছরের উপরে শিশুদের সাঁতার শেখার ব্যাপারে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করা। স্কুলগামী শিশুদের প্রতিষ্ঠানিক এসেম্বলী ক্লাসরুম পাঠদানের সময় পানির বিষয়ে ওয়াটার সেফটির ৩ মিনিটের লেকচার দেওয়া।
০৯। নিয়মিত জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। স্কলারশীপের ব্যবস্থা করা।
১০। ফায়ার ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ইউনিট বা শাখার মাধ্যমে নিয়মিত শিশু কিশোরদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
১১। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সাঁতার সচেতনতা সৃষ্টি ও সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করা।    
১২। প্রাথমিক শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা।
১৩। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নির্দেশনা প্রদান।
১৪। ইসলামী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদে মসজিদে খুৎবা ও ওয়াজে জনসচেতনা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ।                  
১৫। স্থানীয় সরকারকে এ ব্যাপারে সম্পৃক্ত করা।  
১৬। একজন শিশু বয়স্কদের ন্যূনতম (২০-৩০) মিটার সাঁতারে কঠোর অনুশীলন থাকাসহ ৫ মিনিট পানিতে ভেসে থাকার ট্রেনিং দিতে হবে। 
বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন নগর বন্দরে, নদীনালা জলাশয় উদ্ধার ও রক্ষা করতে হবে। পরিবেশগত কারণেও এসব জলাশয় রক্ষা করা দরকার। সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সুইমিংপুল করে তা অল্প খরচে শিক্ষাথীদের সাঁতার শেখাতে কাজে লাগনো যায়। আমি মনে করি প্রত্যেক শিশু-কিশোরের জন্য সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করে সরকারী প্রজ্ঞাপন জারি করা দরকার।  আসুন গ্রামেগঞ্জে, নগরেবন্দরে, পাড়ায় সাঁতার ক্লাব গড়ে তুলি। এতে আগামী প্রজন্ম সাঁতারে বিশ্বজয় করবে।  নগর পিতা আজম নাসির উদ্দিন একজন ক্রীড়া সংগঠক ও সরকারী দলের নেতা, তাঁর কাছে বিশেষ অনুরোধ থাকবে অন্তত চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য সুইমিংপুল স্থাপনের ব্যবস্থা করা। যেসব সুইমিং হল আছে সেখানে সাধারণ পরিবারের প্রতিভাবান শিশু-কিশোররা এ সুযোগ পাচ্ছে না। তবে আশার কথা হলো জাতীয় টিমের ম্যানেজার আছলাম মোরশেদ থেকে জানা গেলো ইতিমধ্যে আউটার স্টেডিয়ামে একটি সুইমিংপুল হতে যাচ্ছে। একনেক-এ এজন্য ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি বিলও পাস হয়েছে। আমরা সে দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন ঘরে ঘরে এক একজন ব্রজেন দাশ বা চট্টগ্রামের কিংবদন্তী সাঁতারু বজল আহমদ জন্ম নিবে। ইনশাআল্লাহ।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী এবং সভাপতি সাঁতার ক্লাব, কার্যকর কমিটি।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ