ঢাকা, মঙ্গলবার 18 September 2018, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে সবার মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে -টিআইবি

গতকাল সোমবার মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না- তা নিয়ে সবার মধ্যে সংশয় আছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে আস্থার সংকট রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও এই আস্থাহীনতা দেখা যাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমান সুযোগ তৈরী করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা আনতে পারলে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এ জন্য সহায়ক মাঠ, সুষ্ঠু প্রশাসন ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলেরও আগ্রহ থাকতে হবে। এদিকে টিআইবির দাবি রাষ্ট্র কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে বলা হলেও মূলত শক্তিশালী হয়েছে কাগজে, প্রয়োগে নয়।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন ও শুদ্ধাচার’ শীর্ষক এক সাংবাদিক সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ সব কথা বলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে মূল প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন- টিআইবি‘র রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রধান শাহজাদা এম আকরাম। এসময় উপস্থিতি ছিলেন- টিআইবির উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাকে একচ্ছত্রভাবে কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা বিদ্যামান। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভার বিস্তারের চেষ্টা এবং হেরে যাওয়া দলের ফল প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা থাকলে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা রয়েছে। জনগণের মধ্যেও এই আস্থাহীনতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন করে না। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অন্য যারা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে তাদের মধ্যে আমরা সাধারণত ধরে থাকি প্রশাসন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ইত্যাদি। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাজনৈতিক দলগুলো। সেখানে যদি তাদের (রাজনৈতিক দল) দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকে তাহলে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।
তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই মানতে হয় যে, আস্থাহীনতার কথাটা বলা হচ্ছে সেগুলো বাস্তবতা। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যেটা আশা করতে পারি, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল তাদের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে এবং সেই শ্রদ্ধবোধ থেকে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন থেকে ১০ বছর আগে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক, সুশাসনের জন্য সহায়ক, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য যে সহায়ক কাঠামো ছিল, তার তুলনায় অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামো। সেখানে নতুন আইন, নীতি সংস্কার, প্রতিষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, পরিবর্তনগুলো অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাগজে হয়েছে। প্রয়োগের ক্ষেত্রে, বাস্তাবায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে আমাদের চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকায় সংসদ প্রত্যাশিতভাবে কার্যকর হয়নি। একই সঙ্গে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়নি। প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব দেখা গেছে।
টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখানো হয়েছে, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত ঘাটতি ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রকাশে আগ্রহী হলেও পরবর্তীতে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে তৎপরতা চোখে পড়ে না উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কোনো কোনো অঙ্গীকার পূরণ হলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গীকার কখনো পূরণ করা হয় না। এসব অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল কার্যকর সংসদ, ন্যায়পাল নিয়োগ, কালো আইন বাতিল, জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ, রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিও-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন এবং বিতর্কিত বা নিয়ন্ত্রকমূলক আইন প্রণয়ন ইত্যাদি।
তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন না করতে পারলেও বিরোধী দল হিসেবে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা থাকবে তা ইশতেহারে স্পষ্ট করার পরামর্শ দিয়েছে টিআইবি। সাময়িক সুবিধার জন্য নাগরিক মানবিধাকার লঙ্ঘন করার মতো আইন তৈরি কাম্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন ইশতেহার বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে, তেমনি দুর্নীতি দমন, অবাধ তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সংক্রান্ত অনেক ভালো ভালো আইন প্রণয়ন করা হলেও সেসব আইনের বাস্তবায়ন হয় না।
সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ঘটনা বিরল, তবে বাংলাদেশে এটা ছিল জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে এটা বাংলাদেশে বাতিল করা হলেও বেশ কয়েকটি দেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছে। নির্বাচনের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং সমান সুযোগ সৃষ্টি করা শুধু নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব না, এটা সরকারেরও দায়িত্ব।
এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য হয়নি এই কথা বলা যাবে না। তবে রাজনৈতিক দল এবং জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে একটা আস্থাহীনতা রয়েছে। নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং সব দলের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে পারলে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব।
সাংবাদিক সম্মেলনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তির জন্য টিআইবি ৬টি ক্যাটাগরিতে ৩৫টি সুপারিশ করে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংসদে সরকারি দলের একচ্ছত্র ভূমিকা নিরুৎসাহিত্য করতে বৈধ ও আগ্রহী সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও নির্বাচিত সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দলীয় প্রধান, সরকার প্রধান ও সংসদ নেতা একজন হওয়া উচিত নয়। তিনজন এক ব্যক্তি হলে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না। বিরোধী দলকে সংসদীয় কার্যক্রমে আরও বেশি সুযোগ দেওয়া, ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নিয়োগ দেওয়া, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া, রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যান্তরীণভাবে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ দেওয়া।
এছাড়া টিআইবি এমন কোন আইনি সংস্কার না করা যাতে দুদকের স্বাধীনতা খর্ব হয়, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলা প্রত্যাহার না করা, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখা, বিচার বর্হিভূত হত্যা, গুম, নির্বিচারে আটকসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা, এবং নারী, সংখ্যালঘু ও অনান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির অধিকার নিশ্চিত করা, সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলী নিশ্চিত করারও সুপারিশ করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ