ঢাকা, মঙ্গলবার 18 September 2018, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

১ম ও ২য় শ্রেণীর চাকরিতে কোটা না রাখার সুপারিশ

স্টাফ রিপোর্টার : নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) সরকারি চাকরিতে কোটা না রাখার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিটি। এ সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছে কমিটি। কমিটি নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের সব পদে মেধা ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করেছে।
সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্কার বা বাতিলের বিষয়ে করা কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম গতকাল সাংবাদিকদের এই কথা জানিয়েছেন। তিনি সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলন এ কথা জানান। এ দিকে কোটা সংস্কারে ফাইল চালাচালি না করে প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ দাবিতে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিতে বেতন কাঠামো অনুযায়ী মোট ২০টি গ্রেড রয়েছে। এর প্রথম গ্রেডে অবস্থান করেন সচিবরা। আর প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে যারা নিয়োগ পান তাদের শুরুটা হয় ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডের মধ্যে। একজন গেজেটেড বা নন গেজেটেড প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ৯ম গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা, ও শর্ত সাপেক্ষে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা অর্থাৎ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের বিধান রেখেছে সরকার। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে এই ৫৬ শতাংশ কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কোনও কোটা তুলে দেওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ দেয়নি ওই কমিটি।
এ প্রতিবেদনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা তুলে দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে এতদিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার আদালতের পরামর্শ চাইবে এমন কথাও বলা হয়েছিল। সচিব কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার আগে এ বিষয়ে আদালতের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, এ বিষয়ে রাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা উনি রাখবেন। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সচিব কমিটি ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এখন আর পিছিয়ে পড়া কোনও জনগোষ্ঠী নেই। সবাই এগিয়ে গেছে। তাই তাদের জন্য কোনও কোটা রাখার সুপারিশ করা হয়নি।
কীভাবে ও কবে এ প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রীর দফতরে অনুমোদনের জন্য যাবে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অনুমোদন পাওয়ার পর তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন পাওয়ার পর এ প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মন্ত্রিসভা বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
৪০ তম বিসিএসে নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে কি না জানতে চাইলে শফিউল আলম বলেন, এতে (বিজ্ঞপ্তি) বলা আছে, সরকার যদি ভিন্নরূপ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সে অনুযায়ী কোটা থাকবে।
প্রজ্ঞাপন জারীর দাবীতে আজ বিক্ষোভ : কোটা সংস্কারে ফাইল চালাচালি না করে প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ দাবিতে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
গতকাল সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা।
সাংবাদিক সম্মেলনে কোটা আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, সচিব যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, সেটাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। পাশাপাশি আমাদের দাবি ছিল সব চাকরির ক্ষেত্রে যে কোটা পদ্ধতি রয়েছে তার একটি যৌক্তিক সংস্কার। সচিব নবম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত বাতিলের যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এর পাশাপাশি যে গ্রেডগুলোর রয়েছে সেখানে যৌক্তিকভাবে কোটার সহনীয় সংস্কার করা হোক সেই দাবিও আমরা জানাই। কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপন আকারে জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।
সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হোসেন বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি, যেদিন আমাদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন হবে সেদিনই আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাব। ফাইল চালাচালির ওপর আমাদের ছাত্রসমাজের কোনও আস্থা নেই৷তাই ফাইল চালাচালি না করে প্রজ্ঞাপন জারি করুন।
এ সময় তিনি তিন দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো, ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সব মামলা প্রত্যাহার, হামলাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত এবং পাঁচ দফার আলোকে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি। তিনি প্রজ্ঞাপনের দাবিতে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিষদের যুগ্ম-আহবায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা, আতাউল্লাহ, রাতুল সরকার প্রমুখ।
বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ নিয়োগ হয় অগ্রাধিকার কোটায়। বাকি ৪৪ শতাংশ নিয়োগ হয় মেধা কোটায়। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান এই কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটিতে সদস্য ছিলেন ছয়জন সচিব।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের ব্যাপকতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের মধ্যেই গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিল হবে বলে জানান। এরপর কোটা সংস্কার, বাতিল বা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করেন।
 কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার শাহবাগ থানায় চারটি ও রমনা থানায় একটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল একটি মামলায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের এক যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান এজাহারভুক্ত আসামি। বাকি চার মামলার কয়েক শ আসামির সবাই অজ্ঞাতনামা। মামলাগুলোর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় দুটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মো. আখতারুজ্জামানের বাসভবনে ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্যের মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের চারটি ঘটনা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ