ঢাকা, বুধবার 19 September 2018, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

টিআইবি’র অভিমত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি বলেছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও সংশয় এবং আস্থার সংকট রয়েছে। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরো বলেছেন, আস্থাহীনতা থাকলেও সব রাজনৈতিক দল এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে দলীয় সরকারের অধীনেও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং সে নির্বাচনের ফলাফলকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। কিন্তু এজন্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপযোগী সহায়ক ক্ষেত্র, সুষ্ঠু প্রশাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও আগ্রহ ও আস্থা থাকতে হবে।
‘রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন ও শুদ্ধাচার’ শীর্ষক গবেষণা রিপোর্টের উপস্থাপনা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি প্রসঙ্গক্রমে বলেছে, রাষ্ট্র কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে সবই হয়েছে কাগজেপত্রে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে নয়। এখন থেকে ১০ বছর আগে গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক, সুশাসনের জন্য সহায়ক এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের জন্য সহায়ক যে কাঠামো দেশে ছিল বর্তমানে সে সবের তুলনায় রাষ্ট্র কাঠামো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। নতুন নতুন আইন, নীতি, সংস্কার ও প্রতিষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনগুলো শুধু কাগজের মধ্যে রয়ে গেছে। প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। একই কারণে চ্যালেঞ্জও দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে।
টিআইবি মনে করে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাকে একচ্ছত্রভাবে কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা বিদ্যমান থাকায় এবং নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার পাশাপাশি হেরে যাওয়া দলের ফল প্রত্যাখ্যান করার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা থাকলে দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। এ উদ্দেশ্যে প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন করে না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থারও পালনীয় দায়িত্ব রয়েছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার প্রশ্নে দলগুলোকে নিজেদের দায়িত্বের বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অন্য কিছু বিষয়েও বক্তব্য রেখেছে টিআইবি। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বলেছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোতে বিরল হলেও ব্যবস্থাটি বাংলাদেশে প্রবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবর্তনকারী দেশেই সেটা বাতিল হয়ে গেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বাতিল হলেও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশগুলো সুফলও পাচ্ছে।
বলা দরকার, নতুন প্রেক্ষাপটে বললেও টিআইবি কিন্তু বহুবার আলোচিত বিভিন্ন বিষয়কেই সামনে এনেছে। বলেছেও অনেকাংশে দায়সারাভাবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে টিআইবি উচ্চ আদালতের দেয়া সেই রায়ের উল্লেখ পর্যন্ত করেনি, যেখানে পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছিল। সংবিধানের যথেচ্ছ সংশোধনের মতো কার্যক্রমের ব্যাপারেও টিআইবি নীরবতা অবলম্বন করেছে। অথচ এসবই দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ।
এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি আসলে সংকটের মূল কারণকেই পাশ কাটিয়ে গেছে। তাছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থাহীনতা সম্পর্কিত মন্তব্যের মধ্যেও যথেষ্ট ফাঁক বা অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে। টিআইবির বক্তব্যে মনে হবে যেন আস্থাহীনতার জন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দলই সমানভাবে দায়ী।
অন্যদিকে প্রমাণিত সত্য হলো, সবকিছুর জন্য বেশি দায়ী আসলে ক্ষমতাসীনরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা থেকে যথেচ্ছভাবে সংবিধান সংশোধন করা পর্যন্ত বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তারাই আসলে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি আস্থাহীনতারও সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু প্রশ্নসাপেক্ষ কারণে টিআইবি ক্ষমতাসীনদের দায়দায়িত্বের দিকটিকে পাশ কাটিয়ে গেছে।
এ ধরনের দুর্বলতা সত্ত্বেও টিআইবির বক্তব্যগুলোকে সাধারণভাবে সমর্থনযোগ্য বলে মনে করা যেতে পারে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আসলেও আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে হবে। এজন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে ক্ষমতাসীনদের। নির্বাচনের প্রতি লক্ষ্য রেখে আগে থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় লোকজনকে বসানো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দলের পক্ষে ব্যবহার করার যে প্রবণতার কথা টিআইবির রিপোর্টে বলা হয়েছে সে সব বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, টিআইবি নিজেও তার দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হবে এবং সকল দলের ওপর ঢালাওভাবে দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য রাখবে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পাশাপাশি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হলে টিআইবির মতো সংস্থাগুলোরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ