ঢাকা, বুধবার 19 September 2018, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দ্রুত ধনী হওয়ার উর্বর ভূমি

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : আগামী ছয় বছর পর নাকি বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। তা নিয়ে অনেক ছুঁচোর কেত্তন শুনেছি। এখনো মাঝেমধ্যে শুনছি। একে সাফল্যের মাইলফলক হিসেবে সরকার অনেক ডঙ্কা বাজিয়েছে: আমরা উঠে গেছি, আমরা উঠে গেছি। কিন্তু আমরা ভেবে দেখিনি, এর পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাংকসহ ঋণদানকারী সংস্থাগুলো মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর অধিক হারে সুদ আরোপ করে বসেছে। তাছাড়া বিভিন্নখাতে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা অনুদান দিয়ে থাকে, তারাও হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। এমনকি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বিভিন্ন দেশের সাহায্যও ফিকে হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গর্ব করে বলেছিলেন যে, আমরা যদি ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারি, তাহলে আর দশ লাখ রোহিঙ্গাকেও খাওয়াতে পারব। প্রয়োজনে খাবার ভাগাভাগি করে খাব। এমন কা-জ্ঞানহীন দম্ভের পরিণতি কী হতে পারে, আমরা তা ভেবে দেখিনি। এখন কান্নাকাটি শুরু করেছি, ওরা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আবার মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্যও আমরা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না। শিশুর মতো অপেক্ষা করে আছি, কখন আমাদের কোনো কান্নাকাটি ছাড়াই সারা দুনিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে মিয়ানমারকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেবে। আমাদের রাজনীতি যেমন দেউলিয়া, তেমনি দেউলিয়া আমাদের কূটনীতিও। তাই ফাঁকা বুলি দাবড়ে বেড়াচ্ছে।
এই সরকারকে জার্মান থিংকট্যাঙ্ক ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেছে। দেশ থেকে সুশাসন বিদায় নিয়েছে। মানুষের জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারব, এর কোনো নিশ্চয়তাও নেই। গায়েবি মামলায় বিরোধীরা পর্যুদস্ত। সাদা পোশাকে ডিবি পরিচয়ে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কখনো দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়ে যায়, তাদের খবর পাওয়া যায় না। কখনো আইন ভেঙে পুলিশ কয়েক দিন পর স্বীকার করে যে, তারাই তুলে নিয়েছিল সংশ্লিষ্টদের। কখনো মেলে লাশ। পরিবারে পরিবারে কান্নার রোল ওঠে। তারা সংবাদ সম্মেলন করতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাদক বিরোধী অভিযানের নামে প্রায় আড়াই শ’ লোককে বিনা বিচারে খুন করা হয়েছে। প্রতিদিন ক্রসফায়ার হচ্ছে। প্রতিদিন মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। এই দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে গোটা দেশের মানুষ।
দুর্নীতি আর লুণ্ঠনে ছেয়ে গেছে দেশ। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেছে। লুট হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণ হয়ে গেছে মিশ্র ধাতু। কয়লা খনির লাখ লাখ টন কয়লা চুরি হয়ে গেছে। পাথর খনির লাখ লাখ টন পাথর হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। সিএসডি গুদামে সংরক্ষিত হাজার হাজার টন চাল পাচার হয়ে গেছে। টিআর, ভিজিএফ, কাবিখার চাল লুট হয়ে গেছে। সড়ক আর ভবন নির্মাণে রডের বদলে দেয়া হচ্ছে বাঁশ। তিস্তা ব্রিজের সংযোগ সড়কের সেতু ভেঙে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনের মাত্র দু’দিন আগে। সে সেতুতে রডের চিহ্নমাত্র দেখা যায়নি। আর এক্ষেত্রে যে যতবড় চোর বা অপরাধী, আর সে সরকারের কাছে ততো বেশি প্রিয়। ওপরে উল্লিখিত চুরি-বাটপারির জন্য এ পর্যন্ত কারো কোনো শাস্তি হয়নি। বরং ‘রাবিশ’ ও ‘স্টুপিড’ খ্যাত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। যখন হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে লুট হয়ে গেল, তখন ওই মুহিত বললেন, চার হাজার কোটি টাকা তো কোনো টাকাই না। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির রিপোর্ট তিনি ধারাবাহিকভাবে গোপনই করে যাচ্ছেন। একবার তো বলেই ফেলেছেন যে, এর তদন্ত রিপোর্ট কোনো দিন প্রকাশিত হবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, স্বাভাবিক ডেলিভারি হবে না, সিজারিয়ান দরকার হতে পারে। এমনকি রাষ্ট্রীয় পদকের স্বর্ণও চুরি হয়েছে। চোরদের না ধরে সরকার বরং ঘোষণা করেছে যে, এসব পদকের স্বর্ণ নিয়ে আর প্রশ্ন তোলা যাবে না। এতবড় চোর বা দুর্নীতিবান্ধব সরকার এই সময়ে পৃথিবীতে আর আছে কিনা জানা নেই। আবার বিদ্যুৎ খাতেও ঘটেছে দারুণ ঘটনা। সরকার একেবারে আইন করে রেখেছে যে, বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি নিয়ে কোনো দিন কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কেন তোলা যাবে না? কারণ এসব দুর্নীতির পেছনে আছে সমাজের রাঘব-বোয়ালরা। যারা সরকারের অতি আপনজন। আর দুর্নীতির স্বার্থে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেয়া হয়েছে দায়মুক্তি। সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মবারীদের কেউ গ্রেফতার করতে পারবে না, মামলা দায়ের করা যাবে না। অথচ রাস্তা থেকে বিনা ওয়ারেন্টে বিনা অপরাধে যে কাউকে তুলে নিয়ে গুম করে দেয়া যাবে। তাতেও কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। বাহবা বাহবা বেশ সরকার।
এর মধ্যে এসেছে বাংলাদেশ কাঁপানো আর এক সুসংবাদ। এ সাফল্যের সংবাদ আসলে সারা দুনিয়াকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের গত দশ বছরের ধারাবাহিক শাসনের সুফল ফলতে শুরু করেছে। আর সেই সুসংবাদটি হলো এই যে, ‘বিশ্বে অতি ধনীর উত্থানে শীর্ষে বাংলাদেশ’। জয় বাংলা। এতবড় সুসংবাদ এদেশের মানুষ আগে কখনো শোনেনি। এটি শেখ হাসিনা সরকারের এক বিরাট সাফল্য। আমরা তো ভেবেছিলাম, এ সংবাদ শোনার পর একটি দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে স্টেডিয়ামে একটি আতশবাজির আয়োজন করবে সরকার। এ সরকারের আমলে চীন, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশে অতি ধনীর দ্রুত উত্থান ঘটেছে। সরকার দেশের অর্থনীতিকে কতোটা চাঙ্গা করে তুললে এমন সাফল্য আসতে পারে, সেটা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং এই খবরে সপ্তাহব্যাপী উৎসবের আয়োজনের অপেক্ষায় আছি। সাবাশ শেখ হাসিনা সরকার!
এই সুখবরটি দিয়েছে ওয়েলথ-এক্স নামের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধি হারের দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র চীন, জাপান ও ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনৈতিক দেশের চেয়েও বেশি। ওয়েলথ-এক্স বলেছে, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে, ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে চীন বিশ্বের এক নম্বর নয়, এ অবস্থান বাংলাদেশের।’ ওয়েলথ-এক্স এর প্রতিবেদনটির নাম ‘ওয়েল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮’। গত ৫ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওয়েলথ-এক্স বলেছে, তাদের তথ্য ভান্ডারে এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ধনকুবেরের তথ্য রয়েছে। তিন কোটি মার্কিন ডলার বা ২৫২ কোটি টাকার সম্পদ থাকেলে তাদের আল্ট্রা ওয়েলদি বা অতি ধনী হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে অর্থনীতিবিদরা এই ঘটনায় উল্লসিত হয়ে উঠতে পারেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যারা কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি ছিল তারাই ধনী হয়েছে। বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হয়েছে। তার সুফল সঠিকভাবে নিম্নস্তরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পৌঁছেনি বরং উপরের ধনীদের দিকে গেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে ধনিক শ্রেণীর বাড়ার মূল কারণ হলো- যারাই অতি দ্রুত ধনী হয়েছে, তারা নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার কাছে বা রাজনীতির কাছে বা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি কিংবা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে তারাই এই সুবিধাগুলো পেয়েছে। দক্ষতা হয়তো তাদের কিছুটা আছে, কিন্তু দক্ষতার চেয়ে তারা বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তারা দ্রুত এগিয়ে গেছে। অপর দিকে সমদক্ষতার লোক কিংবা উদ্যোক্তারা সে সুবিধা পায়নি। এটা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের আর্থ-সামিজিক উন্নয়নের প্রতিফলন নয়। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে না পৌঁছানোর কারণেই বৈষম্য বাড়ছে। আপেক্ষিকভাবে অনেক লোক দ্রুত ধনী হয়ে গেছে। আবার যারা নীচের দিকে আছে, তাদের সে হারে উন্নতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেটা হয়েছে এর পুরো টাকাটাই চলে গেছে ধনীদের ঘরে। বাংলাদেশে এখন বৈষম্য ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। আসলেই বড়লোকেরা আরও বেশি বড়লোক হচ্ছে। গরীবরা আরও বেশি গরীব হচ্ছে। বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদন ৭ শতাংশ হয় এটা সত্য, কিন্তু প্রবৃদ্ধির সে টাকা বড়লোকের ঘরে যায়, গরীবের ঘরে যায় না। যখন গরীবের অবস্থান পরিবর্তন হয় না তখন দেশে বৈষম্য বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, অর্জিত প্রবৃদ্ধির সুষম বন্টন হয়নি। প্রবৃদ্ধি সরাসরি ধনীর ঘরে চলে গেছে। সে কারণে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত হয়নি, মধ্যবিত্ত থেকে ধনী হয়নি। ধনী থেকে অতি ধনী হয়েছে, অতি ধনী আরও ধনী হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদের মতে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিচ্ছে। এতে বৈষম্য বাড়ছে। ধনী ও গরীবের মধ্যে এই বৈষম্য অর্থনীতির জন্য ভালো না। দ্রুত হারে ধনীর সংখ্যা বাড়া অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই প্রতিফলন। এটা রোধ করার জন্য সুষম অর্থনৈতিক বন্টনের দরকার। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে সব পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সঠিকভাবে ব্যাংক ঋণ বন্টন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতে একটি অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। যেমন গ্রাম থেকে ব্যাংক যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করছে, সে পরিমাণে ঋণ গ্রামের মানুষ পাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে গ্রাম ও শহরের ব্যবধান বিস্তরভাবে বাড়ছে। এ কারণে সারাদেশের মানুষ শহরে থাকতে চায়। ধনীরা আমানত কম করে। ঋণ বেশি নেয়। সেই ঋণ থেকে টাকা বাইরে পাচার করে। এ সব কারণে বৈষম্য বেড়ে অতি ধনীর সংখ্যা দিন দিন দ্রুত হারে বাড়ছে। এখানে আরেকটা তথ্য সংযোজন করা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ শতাংশের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। ২০১৬ সাথে তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়। যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল।
অর্থাৎ বাংলাদেশের এত বড় সাফল্যের পরও অর্থনীতিবিদ নামের কিছু লোক খুশি হতে পারেননি। এখানে আমরা এখনও সরকারের উল্লাস করার কোনো পরিকল্পনা না দেখে বিস্মিত হয়েছি। মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছে, ধনী লোকের সংখ্যা তো বাড়বেই। এমন যুক্তি দিয়েও কাউকে কথা বলতে শুনিনি। অর্থাৎ এটা যে সুস্পষ্ট লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে, এটা বুঝতে কারো বাকি নেই। লুট হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে না আছে কোনো জবাবদিহিতা না আছে দুর্নীতিবাজদের শাস্তির ব্যবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে আরও বড় ‘সুসংবাদ’-এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ