ঢাকা, বৃহস্পতিবার 20 September 2018, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঋণখেলাপিদের রক্ষার চেষ্টা

মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে হঠাৎ খেলাপি ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যা প্রকাশ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে হইচই ফেলে দিয়েছেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর এক লিখিত বিবৃতিতে জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। ওদিকে ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যা পৌঁছেছে দুই লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮-তে। জাতীয় সংসদে দেয়া ওই বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী একদিকে একশ’জন শীর্ষ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে জানিয়েছেন খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িত ৮৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম। কোন্্ ব্যাংকের কত হাজার কোটি টাকা খেলাপি বা অনাদায়ী রয়েছে সে পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে হইচই শুরু হলেও হঠাৎ জবাবদিহিতার ঢঙে অর্থমন্ত্রীর দেয়া বিবৃতিটি যথেষ্ট কৌতূহল ও সংশয়েরও সৃষ্টি করেছে। সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞরা বিষয়টির মধ্যে সরকারের চাতুরিপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপি কোটিপতিদের যে তালিকা প্রকাশ করেছেন সেখানে দু’জন মাত্র আওয়ামী এমপির নাম থাকলেও বাকি সবাই আসলে ‘চুনোপুটি’ ধরনের ঋণখেলাপি। বড় বড় তথা ‘রাঘব-বোয়াল’ ঋণখেলাপিদের কারো নাম নেই ওই তালিকায়।
তাছাড়া তালিকাটি তৈরিও করা হয়েছে সুচিন্তিত কৌশলের ভিত্তিতে। বিভিন্ন কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে কয়েক হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী থাকলেও তালিকায় বিচ্ছিন্নভাবে গ্রুপটির এমন একটি বা দুটি কোম্পানির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ঋণের পরিমাণ খুব বেশি নয়। এভাবে বড় বড় বহু গ্রুপকে বাস্তবে ছাড় দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অথচ তাদের কাছেই আটকে রয়েছে ঋণের বিপুল পরিমাণ অর্থ।
দ্বিতীয় পর্যায়ে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রকৃত তথ্য লুকানোর এবং জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন ঋণ নেয়ার ও পুরনো ঋণ নবায়নের অবৈধ কার্যক্রম। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো সিআইবি-এর রিপোর্ট জালিয়াতি করে খেলাপিরা নতুন করে বিপুল পরিমাণ ঋণ পাচ্ছেন। আগের ঋণ পুনর্গঠন ও ঋণ সীমা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সিআইবি-এর রিপোর্ট জমা দেয়া হচ্ছে না। ওই রিপোর্ট জমা দেয়া এবং তার পর্যালোচনার ভিত্তিতে নতুন ঋণ দেয়া বা না দেয়াসহ পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ‘রাঘব-বোয়াল’ ঋণখেলাপিরা সিআইবি-এর রিপোর্ট লুকিয়ে রেখে পুরনো ঋণের কথা আড়াল তো করছেনই, বিপুল অংকের নতুন ঋণও নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাকরি হারানোর ভয়ে এসব বিষয়ে সব জেনেও ব্যাংক কর্মকর্তারা মালিক পক্ষের নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর প্রায় সব ক্ষেত্রেই মালিক পক্ষের একদিকে ঋণ গ্রহণকারীদের সঙ্গে এবং অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকার তথ্য জানা যাচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের মালিক পক্ষের লোকজন নিজেরাই আবার ‘রাঘব-বোয়াল’। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে সহজেই ফাঁকি দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তাছাড়া খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেও ঋণখেলাপিদের দুর্নীতিবাজ অনেক সাহায্যকারী রয়েছেন।
এভাবেই ঋণখেলাপি, বিভিন্ন ব্যাংকের মালিক ও কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীসহ নেতৃস্থানীয়দের সমন্বয়ে অত্যন্ত ক্ষমতাধর একটি চক্র ব্যাংক ঋণের পুরো বিষয়টিতে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছেন। ওদিকে দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষেও অনিয়ম ও বেআইনি কর্মকান্ড প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সব মিলিয়েই খেলাপি ঋণের বিষয়টি ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।
তথ্যাভিজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, অনতিবিলম্বে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণের সঙ্গে ঋণখেলাপি কোটিপতিদের সংখ্যা যেমন লাফিয়ে বাড়তে থাকবে, তেমনি দেশ থেকে পাচার হয়ে যাবে আরো বহু হাজার কোটি টাকা। পরিণতিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবে জাতীয় অর্থনীতি। দেশে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের বিষয়টি শুধু কল্পনার রাজ্যে পড়ে থাকবে। সেই সাথে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে না বলে বেকারত্বও মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি করবে।
বলা দরকার, সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে পরিষ্কার হয়ে গেছে, জবাবদিহিতার নামে বিবৃতির মাধ্যমে সততা দেখানোর পদক্ষেপ নিলেও অর্থমন্ত্রী আসলে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত অনেক প্রকৃত সত্য আড়াল করেছেন। তিনি শুধু অনাদায়ী ঋণের মোট পরিমাণ উল্লেখ থেকেই বিরত থাকেননি, নামোল্লেখ না করার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের ঋণখেলাপিদেরকেও সুকৌশলে ‘পার’ করে দিয়েছেন। অথচ দেশ থেকে খেলাপি ঋণের অশুভ কর্মকান্ডের অবসান ঘটাতে হলে প্রথমে ‘রাঘব-বোয়াল’দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, সত্য আড়াল করার এবং নিজেদের লোকজনকে ‘পার’ করে দেয়ার চাতুরিপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করার পরিবর্তে সরকারের উচিত দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণ এবং জাতীয় অর্থনীতির সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। তাদের কাছ থেকে ঋণের সমুদয় অর্থ সুদে-আসলে আদায় করা। আমাদের ধারণা, সরকার সততার সঙ্গে সত্যি তেমন পদক্ষেপ নেয় কি না, নাকি নতুন পর্যায়েও দলবাজির নীতি ও কার্যক্রমকেই অব্যাহত রাখেÑ এসব বিষয়ে জনগণ নিশ্চয়ই গভীরভাবে লক্ষ্য রাখবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ