ঢাকা, শুক্রবার 21 September 2018, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

আবদুল্যাহ আল-মাহমুদ ইমতিয়াজ : হিজরী সনের প্রথম মাস মহররম, এ মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আশুরা শব্দের অর্থ দশমী, এ দশমী তথা আশুরার দিবসে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটলেও আমরা মুসলমানরা যে কারণে এ দিবসটি স্মরণ করি তাহলো আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় নাতী হযরত ইমাম হোসাঈন (রা:) ও তাঁর পরিবারের মর্মান্তিক শাহাদাত। এ দিবসটি অনেক মর্যাদাপূর্ণ। এদিন রাসূল (সা.) রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখতে বলতেন। ইসলাম পূর্ব যুগে তথা রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে পূর্বতন অনেক নবীর উম্মতদের ওপর আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

ইমাম হোসাঈন (রা.) এর শাহাদাত বরণ ছাড়া ও উক্ত দিবসে যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল তার কয়েকটি নিন্মরূপ :

(১) মহান আল্লাহ এ দিনে আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত হন।

(২) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা এ বিশ^ জগত সৃষ্টি করেন।

(৩) এদিন পৃথিবীতে প্রথম বৃষ্টি হয়।

(৪) এ দিনে আল্লাহ মানবজাতির পিতা আদম (আ:) কে সৃষ্টি করেছেন।

(৫) দীর্ঘ দিন পর তাঁর তাওবা কবুল করে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।

(৬) বন্যার পর নূহ (আ:) এর নৌকা জুদি পাহাড়ে থামে।

(৭) মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ: এর জন্ম হয়।

(৮) হযরত ইব্রাহিম নমরুদের অগ্নিকু- থেকে বের হয়ে আসেন।

(৯) হযরত মুসা (আ:) এর উপর তাওরাত নাযিল হয়।

(১০) হযরত ইউসুফ (আ:) গভীর কূপ থেকে উদ্ধার পান।

(১১) চল্লিশ বছর পর ইউসুফ (আ:) তাঁর পিতা ইয়াকুব (আ:) এর সাথে মিলিত হন।

(১২) হযরত সুলায়মান (আ:) পূনরায় রাজত্ব ফিরে পান। 

(১৩) মুসা (আ:) ও তাঁর অনুসারীরা নীল নদ অতিক্রম করেন এবং ফেরাউন তার দল বলসহ নীল নদে নিমজ্জিত হয়।

(১৪) হযরত ইউনুস (আ:) মাছের পেট থেকে ৪০ দিন পর মুক্তি পান।

(১৫) হযরত আইয়ুব আ: দীর্ঘ ১৮ বছর অসুস্থতার পর সুস্থ্য হন।

(১৬) হযরত ঈসা (আ:)কে এ দিনে আকাশে উঠিয়ে নিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেন।

(১৭) আশুরার দিন জুমাবার কিয়ামত সংঘঠিত হবে।

এতসব ঘটনার পরও প্রতি বছর আশুরার দিবসে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনায় আন্তরিক দুঃখ ও বেদনা প্রকাশ করে থাকে। রাসূল (সা.) এর জানের টুকরা যাকে তিনি পিঠে তুলে ঘোড়া হয়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন, আদরে সিক্ত করেছেন। রাসূল (সা:) বলেছেন হাসান-হোসাঈন (রা.) আমার জানের টুকরা জান্নাতের দুটি ফুল। তিনি আরো বলেছেন হাসান-হোসাঈন (রা) জান্নাতবাসী যুবকদের নেতা। দুনিয়ায় বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত রাসূল (সা:)এর প্রিয় নাতী রাসূলের ওফাতের মাত্র পঞ্চাশ বছরের মাথায় কেনইবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণ করেছিলেন তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। 

রাসূল (সা:) এর মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের দশ বছরের মাথায় তাঁর ইন্তিকালের পর চল্লিশ বছর খোলাফায়ে রাশেদার শাসন ছিল। এরপর হযরত মুয়াবিয়া (রা:) ক্ষমতায় আরোহণ করে উমাইয়া খিলিফতের গোড়া পত্তন করেন। তিনি ৬০ হিজরী সনে ইন্তিকালের পূর্বে তাঁর আযোগ্য  ও মদ্যপ পুত্র ইয়াজিদকে ক্ষমতার উত্তরাধিকার মনোনিত করেন। যা তখন জীবিত উল্লেখযোগ্য ছাহাবীগণ মেনে নিতে পারেননি এবং আনেকেই তাঁর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেননি। তাঁদের মতো হযরত ইমাম হোসাইন (রা:) ও ইয়জিদের অনুগত্য মেনে নেননি এবং তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ইতিমধ্যে কুফার অধিবাসী লোকজন ইমাম হোসাইন (রা) কে কুফায় আসার আহ্বান জানিয়ে বলল- আপনি কুফায় চলে আসুন আমারা সবাই আপনার হাতে বাইয়াত নেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। ইমাম হোসাঈন (রা:) স্বপরিবারে কুফার দিকে রওয়ানা দিলেন। কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ ইবনে সিয়াদ আমর ইবনে সাদের নেতৃত্বে একটি সৈন্য দল হোসাইন (রা:)কে মোকাবিলা করার জন্য পাঠালো। উভয় পক্ষ কারবালার প্রান্তরে মুখোমুখি হলো। সেখানে ইমাম হোসাঈন এর কাফেলাকে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করা হলো, পানি বন্ধ করে দেয়া হলো। ইমামকে বলা হলো আপনি ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিলে আপনার ও আপনার পরিবারের সবার জীবন নিরাপদ হবে এবং আপনাকে একটি প্রদেশের গবর্নর বানিয়ে দেয়া হবে। আর যদি না মানেন তবে আপনার পরিবারের একটি মানুষকে ও বাঁচতে দেয়া হবেনা, তাদের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজী না হওয়ায় ৬১ হিজরী সনের ১০ মহররম এ অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা:) তাঁর শিশুপুত্রসহ পরিবারের ৭২ জন পুরুষ সদস্য নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। বাকী শিশু ও মহিলাদের বন্দী করা হয়। 

উল্লেখ যোগ্য যে, ইমাম হোসাঈন (রা:) যাকে মেনে নিতে পারেননি বা যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সে ইয়াজিদ একজন মুসলমান ও সাহাবী পুত্র ছিল। বলা বাহুল্য যে, জনসাধারণ তাদের দ্বীনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন আনেনি। ইয়াজিদসহ শাসক গোষ্ঠি এবং জনসাধারণ সবাই আল্লাহ, রাসূল ও কুরআনকে ঠিক সেভাবেই মানতেন, যেভাবে তারা এর আগে মেনে আসছিলেন। দেশের আইন ব্যবস্থাও তখনও পরিবর্তন হয়নি। তাহলে কোন পরিবর্তনের কারণে বা কি কারণে ইমাম হোসাইন ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন? কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইয়াজিদের ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের কারণে যে ত্রুটির সূচনা হচ্ছিল তা ছিল রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা, তার প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্যের পরিবর্তন। 

ইসলামী রাষ্ট্রের বেশিষ্ট্য হলো কর্মের মাধ্যমে আকিদা বিশ্বাসের পূর্ণ প্রমাণ পেশ করা যে, দেশের মালিক আল্লাহ, জনসাধারণ আল্লাহর প্রজা এবং প্রজা পালনের  ব্যাপারে রাষ্ট্রকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। রাষ্ট্র জনসাধারণের মালিক নয় এবং জনসাধারণও রাষ্ট্রের গোলাম নয়। রাষ্ট্র প্রধানদের কাজ হলো সর্বপ্রথম আল্লাহর বন্দেগী এবং দাসত্বের শৃঙ্খল গলায় ঝুলিয়ে দেয়া। অতঃপর আল্লাহর প্রজাদের ওপর আল্লাহী আইন জারি করা। কিন্তু ইয়াজিদের উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসন দখলের পর থেকে মুসলমানদের মধ্যে মানুষের কর্তৃত্ব ভিত্তিক রাজত্বের সূচনা হয়। 

ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পৃথিবীতে তারই পছন্দের সৎ কাজগুলোর প্রসার এবং অসৎ কাজ গুলোর পথরোধ ও বিলোপ সাধন। কিন্তু রাজতন্ত্র চালু করার পর রাজ্য নয় মানুষের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব, কর উসুল এবং বিলাসী জীবনযাপন ছাড়া রাষ্ট্রের আর কোনো উদ্দেশ্য থাকলোনা। খলিফা এবং তার অধিনস্ত শাসক ম-লীর মাধ্যমে সৎ কাজের প্রসার খুব কম এবং অসৎ কাজের প্রসার খুব বেশি হয়েছে। যাতে মুসলিম সমাজ ধাপে ধাপে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। 

ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাণ শক্তি ছিল তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি, রাষ্ট্রের প্রধান থেকে শুরু করে বিচারপ্রতি, সেনাপতিসহ সকল কর্মকর্তা কর্মচারী এ রুহানী শক্তিতে ভরপুর হতেন। যারফলে রাষ্ট্র ও সমাজে কোনরূপ অন্যায় দূর্নীতি হতোনা। কিন্তু রাজতন্ত্রের কারণে মুসলমানদের রাষ্ট্র এবং শাসক সমাজ, পারস্য ও রোম স¤্রাটদের রীতি-নীতি, চাল-চলন অনুকরণ করলো। ইনসাফের পরিবর্তে জুলুম, নিপীড়ন, আল্লাহ ভীতির পরিবর্তে উচ্ছৃংখলতা, চরিত্রহীনতা, গান বাজনা প্রসারিত হলো, শাসক সমাজের কাজে হালাল হারামের কোন পার্থক্য থাকলো না। আল্লাহ ভীতির পরিবর্তে শাসক সমাজ প্রজাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করতে লাগলো।

এ ছিল অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন। ইসলামী শাসন তন্ত্রের নি¤œলিখিত বুনিয়াদি নীতির মধ্যে ও এ পরিবর্তন সাধিত হলো।

(১) জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

(২) রাষ্ট্র পরিচালিত হবে পরামর্শের ভিত্তিতে এবং পরামর্শ ও করতে হবে তাদের সাথে যাদের ইলম তাকওয়া এবং নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছার মত বুদ্ধি বৃত্তির ওপর জনসাধারণের আস্থা রয়েছে।

(৩) স্বাধীন মতামত প্রকাশের ব্যাপারে জনসাধারণকে পূর্ণ সুযোগ দান। ক্ষমতাসীনদের ত্রুটির বিরুদ্ধে জনসাধারণের সমালোচনা করার অধিকার থাকার মানসিকতা থাকতে হবে।

(৪) খলিফা তথা রাষ্ট্রপ্রধান এবং তাঁর রাষ্ট্রকে আল্লাহর এবং জনগণ উভয়ের নিকট জবাবদিহি করার মানসিকতা থাকতে হবে।

(৫) বায়তুলমাল বা রাষ্ট্রিয় কোষাগার আল্লাহর সম্পত্তি এবং মুসলামানদের আমানত, আল্লাহর নির্দেশিত পথ ছাড়া অন্যকোন পথে কোন জিনিস তার মধ্যে প্রবেশ করা উচিত নয় এবং ব্যয় হওয়া ও উচিত নয়।

(৬) দেশে আইনের শাসন হবে। কেউ আইনের উর্ধ্বে থাকবেনা সাধারণ লোক থেকে রাষ্ট্র প্রধান পর্যন্ত সবার উপর একই আইন চলবে। ন্যায় বিচারের ব্যাপারে কারো প্রতি বৈষম্য করা হবেনা। এ ব্যাপারে আদালতগুলো পুরোপুরি স্বাধীন থাকবে।

(৭) অধিকার ও মর্যাদার দিক দিয়ে পূর্ণ সাম্যের প্রতিষ্ঠা, গোত্র ও বংশীয় কারণে কারো উপর কারো শ্রেষ্ঠত্ব থাকবেনা বরং মর্যাদা হবে আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এর অনুগত্যের বিবেচনায়।

ইসলামী খিলাফতকে রাজতন্ত্রে রুপান্তরিত করার কারণে এ পরিবর্তনগুলোর আত্বপ্রকাশ ঘটলো। ইয়াজিদের সিংহাসন দখলের কারণে এ পরিবর্তনের সূক্রপাত হয়েছে। তাই ইমাম হোসাইন (রা.) পূর্বাহ্নেই এ বিষয়ে বুঝতে পেরে পেরেশান হয়ে গেলেন। আর একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার পরিণতি যে ভয়ংকর বিপদ তা বুঝতে পেরেও হাসি মুখে সে বিপদ গ্রহণ করার মানসিকতা নিয়েই বিদ্রোহ করেন। 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইমাম হোসাইন (রা.) রাসূল (সা.)-এর আদর্শ সমুন্নত রাখতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। তাই আমরাও সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাসূল (সা.)-এর রেখে যাওয়া জীবন বিধান ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রে কুরআনের রাজ বাস্তবায়নে অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারলেই ইমাম হোসাইনের শাহাদাত ও আশুরার শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে। তা নাহলে আশুরা বার বার আমাদের জীবনে আসবে-যাবে তাতে আমাদের জন্য কোনো ফল বয়ে আনবেনা।

অধ্যক্ষ, চরকালিদাস ছোবহানিয়া 

 

ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, ফেনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ