ঢাকা, রোববার 23 September 2018, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সরকারের অহংবোধ চরিতার্থ করতেই বেগম জিয়ার চিকিৎসায় বাধা -রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখনও গুরুতর অসুস্থ। তার হাত, পা এর ব্যথা আরও তীব্র হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতাকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতেই দেশনেত্রীকে ইচ্ছাকৃতভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। সরকারের গাইড লাইনে ২১ শে আগস্ট বোমা হামলার বিচার হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গতকাল শনিবার নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন।
রিজভী বলেন, অসুস্থতা লাঘবের জন্য বেগম জিয়ার আস্থার হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। প্রস্থেসিস কমপেটিবল এমআরআই মেশিন ইউনাইটেড হাসপাতাল অথবা অন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে রয়েছে। কিন্তু এটি বিএসএমএমইউতে নেই, এমনকি বিএসএমএমইউতে ভর্তিকৃত অনেক রোগীর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষাও বাইরের বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল থেকে করা হয় এবং দুপুর দুইটার পর বিএসএমএমইউতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া দুস্কর ও পরীক্ষা নিরীক্ষাও বন্ধ থাকে। সুতরাং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যথাযথ চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের দাবি কি অনায্য? এমনকি সরকারী মেডিকেল বোর্ডও বিএসএমএমইউসহ যেকোন বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেছে। বিএসএসএমএমইউ যদি এতই বিশেষায়িত ও ইকুইপড্ হতো তাহলে রাষ্ট্রপতি বার বার চিকিৎসা নিতে বিদেশ যাচ্ছেন কেন? ক’দিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশ থেকে চিকিৎসা করে আসলেন কেন? তারা কেন বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা নিলেন না?
বেগম জিয়ার ওপর জুলুম ও অত্যাচারে সরকার রীতিমতো উৎফুল্লবোধ করছে। সরকার প্রধানের এক ধরণের অহংবোধ চরিতার্থ করতে বেগম জিয়ার চিকিৎসায় বাধা দেয়া হচ্ছে। মানুষ হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরকারের টালবাহানায় অসুস্থ বেগম জিয়া চিকিৎসা না পাওয়ায় দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আপাত সংকীর্ণতার মধ্যেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবর্তিত হয়্। এদের মধ্যে মানবতা, সভ্যতা, উদারতা ও সহমর্মিতার প্রচন্ড ঘাটতি। বিরোধী নেতা ও সংগঠনকে সবদিক থেকে পর্যদুস্ত করতে এদের সাথে আর কারো তুলনা করা যায় না। আওয়ামী লীগের মানবসত্ত্বায় অন্তর্নিহিত রয়েছে বিপজ্জনক অনাচার।
রিজভী বলেন, ওবায়দুল কাদের সাহেবকে বলতে চাই-সাবেক প্রধান বিচারপতি তো দেশে বসেই সৎ সাহসের সঙ্গে কাজ করছিলেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতির কাছে তো বন্দুক নেই। রাষ্ট্রের বন্দুকধারিরা যদি তার দিকে বন্দুক তাক করে দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করে তখন তিনি কি করবেন? তখন তিনি বিদেশে গিয়ে লিখবেন নাকি গণভবনে সবুজ লনে বসে লিখবেন? আওয়ামী লীগ সরকারের লোকেরা একজন নিরস্ত্র প্রধান বিচারপতিকে সন্ত্রাসীদের কায়দায় বন্দুকের নলের মুখে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। এটা কোন বীরের কাজ নয়, এটি কাপুরুষের কাজ। সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগ একটি স্বাধীন সংস্থা। অথচ বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রী-উপদেষ্টারা কথা বলার নামে এমন আচরণ করেছেন যেন তারা প্রধান বিচারপতিকে রিমান্ডে নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব তাঁকে বঙ্গভবনে ডেকে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামনে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা ধমকাধমকি করেছেন তা সন্ত্রাসী আক্রমণেরই সমতূল্য। প্রধান বিচারপতি তাঁর বইয়ে লিখেছেন যে, ক্ষমতাসীন সরকারই তাকে পদত্যাগে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছে। সুতরাং নির্যাতিত এস কে সিনহা সাহেব কি আওয়ামী লীগের মৌসুম দেখে বই প্রকাশ করবেন? ওবায়দুল কাদের সাহেব বলেছেন-‘প্রধান বিচারপতি সাবেক হয়ে গেছেন, সাবেক হওয়ার অন্তর্জালা আছে। আপনারা তো বন্দুকের নল ঠেকিয়ে এস কে সিনহা সাহেবকে সন্ত্রাসী কায়দায় সাবেক হওয়ার আগেই সাবেক করেছেন। তাই সত্য কথা লিখাতে অন্তর্জালা হচ্ছে আপনাদের।   
রিজভী উল্লেখ করেন, যদি ভোটারবিহীন ক্ষমতাসীন সরকার দেশের প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে ও নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে তাহলে প্রশাসন, আইন আদালতকে বাধ্য করে বিচারকের কাছ থেকে মামলা ফেরত এনে সম্পূরক চার্জশিটে তারেক রহমানের নাম জড়ানো তো কঠিন কাজ নয়। গণবিরোধী অবৈধ সরকার যেকোন কাজই করতে পারে। আজ জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ২১ আগষ্টের বোমা হামলার আইনী প্রক্রিয়া নিয়ে। ১/১১ এর সরকার বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম তদন্ত করে পেলো না। তদন্তকারি কর্মকর্তারা কোথাও সন্দেহবশত:ও তারেক রহমানসহ সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করেনি, অথচ আওয়ামী লীগ ২০০৯ এ ক্ষমতায় এসে নজীর বিহীনভাবে পছন্দের তদন্তকারী কর্মকর্তা কাহার আকন্দকে অবসর থেকে ডেকে এনে ২১শে আগস্ট বোমা হামলা মামলার পূণ:তদন্তের ভার দেয়। সে বিচারকদের কাছ থেকে মামলাটি ফেরত এনে পূণ:তদন্তের নামে তারেক রহমানকে মামলায় জড়িয়ে ষড়যন্ত্রের যাত্রা শুরু করে।
রিজভী আরও বলেন, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করে গাড়ীতে ওঠাকালীন অনির্ধারিত ফটোসেশনে সময় ব্যয় এবং সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ ট্রাকমঞ্চে থাকা শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও দর্শক সারিতে থাকা নেতাকর্মীর সাথে মহিলা লীগের সভানেত্রীসহ ২০/২২ জন মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। বিকাল ৫টায় প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা ২০/২২ মিনিট বক্তৃতা করেন, ততক্ষণ সেখানকার পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল। প্রধান অতিথি’র বক্তৃতা শেষে নিজের বুলেট প্রুফ গাড়িতে ওঠার সময় লাগার কথা ২/৩ মিনিট। তিনি মঞ্চ থেকে যখন নামতে উদ্যত হচ্ছিলেন তখন তার সামনে এসে তার অতি পরিচিত দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ফটোগ্রাফার জনাব গোর্কী একটি ফটোসেশনের অনুরোধ জানান। এতে শেখ হাসিনা সম্মত হয়ে মঞ্চ থেকে না নেমে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর নেতারাও ফটোসেশনের জন্য তার পিছনে এসে দাঁড়ায়। ২/৩ মিনিটে গাড়ীতে উঠে যাওয়ার কথা। ফটোসেশনে দাঁড়ানোর কারণে ২/৩ মিনিট চলে যায়, যা হয়তো বোমা নিক্ষেপকারী দুস্কৃতিকারিরা বুঝতে পারেনি। সেই সময়টুকু অতিক্রান্ত হওয়ার পরে মঞ্চকে সুরক্ষিত রেখে পার্শবর্তী স্থানসমূহে আলোচ্য গ্রেনেডগুলো নিক্ষেপ শুরু করে। সমগ্র সিকোয়েন্সটাই রহস্যাবৃত। পাতানো গেম বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ থেকে যায়।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, আদালত দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের রমরমা রাজনৈতিক সফলতায় ক্ষমতাসীনরা উল্লসিত। এই অবৈধ সরকার আইন, বিচার সবকিছু কুক্ষিগত করে দেশকে ‘মগের মুল্লুক’ এ পরিণত করেছে। সরকারের ‘গাইডলাইন’ অনুযায়ী ২১শে আগষ্ট বোমা হামলা মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলছে কি না, তা নিয়ে জনগণের মনে বড় ধরণের সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারের সব ধরনের বক্তব্য, বিবৃতি ও প্রচারকেই জনগণ বাকোয়াস বলে মনে করে। তাদের উন্নয়নের ফানুস ফেটে গেছে। গণতন্ত্রকে বন্দী করে, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত দমনের পথ বেছে নিয়ে, মামলা-হামলা-গ্রেফতার করে সরকার বিরোধী দলের নেতাদের ঘুম কেড়ে নিতে চাচ্ছে। তবে আমি আবারও প্রত্যয়দৃঢ় কন্ঠে বলতে চাই-সরকারের এই সমস্ত অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সম্মিলিত কন্ঠস্বরে সরকার ও সরকারপ্রধান কতটুকু শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন তা দেখার জন্য জনগণ অপেক্ষা করছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সহ-দফতর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ