ঢাকা, সোমবার 24 September 2018, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা

আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ‘জনপ্রিয়’ কথা প্রচলিত রয়েছে- ‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’। কথাটা যে কে বলেছিলেন তা আর কেউই সঠিকভাবে মনে করতে পারেন না। তবে যার মুখ থেকেই বেরিয়ে আসুক, এসেছিল স্বৈরশাসক জেনারেল (অব.) এরশাদের আমলে। এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করলেও দেশের রাজনীতিতে আরো একবার কথাটার সত্যতা দেখতে হলো। বহু বিতর্ক ও নেতিবাচক অবস্থা পার হয়ে অবশেষে গত ২২ সেপ্টেম্বর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও জেএসডি নেতা আ স ম আবদুর রবসহ জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় প্রথম থেকে উদ্যোগী সকল নেতা তো ছিলেনই, দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন দেশের ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। বড় কথা, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি দলের নেতা-কর্মীরাও মহানগর নাট্যমঞ্চের ওই নাগরিক সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। তীব্র মতবিরোধ ও বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে অংশ নেয়নি শুধু জামায়াতে ইসলামী। ২০ দলীয় জোটের দ্বিতীয় প্রধান এ দলটি গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে আরো একবার উদারতা ও দেশপ্রেমের উদাহরণ স্থাপন করেছে। জামায়াতের ভূমিকা ও কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো জোর আলোচনা চলছে। আমরাও পরবর্তী কোনো সময়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আশা রাখি।
ঘটনাপ্রবাহে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে ১৯৫০-এর দশকে ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী’র নেতৃত্বে গঠিত ‘যুক্তফ্রন্ট’। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল এই যুক্তফ্রন্টই মুসলিম লীগ বিরোধী প্রথম সরকার গঠন করেছিল। এখানে পেছনের ইতিহাস স্মরণ করা দরকার। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত প্রদেশের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই প্রতিষ্ঠিত কৃষক-শ্রমিক পার্টির সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও মাহমুদ আলীর নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী দল (প্রতিষ্ঠা: ১৭ জানুয়ারি, ১৯৫৩) এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট্রের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ সেক্রেটারি আবুল হাশিমের খেলাফতে রব্বানী পার্টিও (প্রতিষ্ঠা: সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩) যুক্তফ্রন্টের মিত্র সংগঠন হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
অন্যদিকে মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি (প্রতিষ্ঠা: ১৯৫৩) কৃষক-শ্রমিক পার্টির সঙ্গে পৃথকভাবে স্বাক্ষরিত ‘১০ দফা’ চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়েছিল। এখানে লক্ষণীয় যে, নামে যুক্তফ্রন্ট হলেও এবং বেশ কয়েকটি দল সে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিলেও সব দল কিন্তু সকল বিষয়ে একমত ছিল না। তাছাড়া বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাপারে আপত্তি থাকায় নেজামে ইসলাম পার্টি শেরে বাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টির সঙ্গে এমন এক ‘১০ দফা’ চুক্তির ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিয়েছিল, যার মধ্যে সেকালের পূর্ব বাংলার প্রধান দাবি স্বায়ত্তশাসনের উল্লেখ পর্যন্ত ছিল না। সব দলের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা থেকে মুসলিম লীগকে উৎখাত করা। সেটা তারা করেছিলও।
যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি হিসেবে ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে ঘোষিত ২১ দফায় প্রধানত পূর্ব বাংলার জনগণের বিভিন্ন দাবি ও অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার করা হয়েছিল (তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো সংবিধান ছিল না, প্রদেশের নামও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়নি)। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ২১ দফার ১৯তম দফায় বলা হয়েছিল, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়া ও সার্বভৌমিক করা হবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত সকল বিষয়কে প্রদেশের কর্তৃত্বে আনা হবে। দেশরক্ষা বিভাগের স্থল বাহিনীর সদর দফতর পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌ বাহিনীর সদর দফতর পূর্ব বাংলায় স্থাপিত হবে, পূর্ব বাংলাকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসস্পূর্ণ করার জন্য প্রদেশে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা স্থাপন করা হবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হবে।
ঐতিহাসিক সে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী এবং পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আহবায়ক ও অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই দু’জনের পাশাপাশি ছিলেন ‘শেরে বাংলা’ ফজলুল হক। তিনিও অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী’র নেতৃত্বেই যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অন্যদিকে ছিল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বা চিফ মিনিস্টার নূরুল আমীনের নেতৃত্বে তৎপর ক্ষমতাসীন দল মুসলিম লীগ।
১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলার প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিল। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট জিতেছিল ২২৩টিতে। এর মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৩, কৃষক-শ্রমিক পার্টি ৪৮, নেজামে ইসলাম পার্টি ১৯ এবং গণতন্ত্রী দল ১৩টি আসন পেয়েছিল। অমুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত ৭২টি আসনের মধ্যে গণতন্ত্রী দল তিনটি এবং কমিউনিস্ট পার্টি চারটি আসন পাওয়ায় যুক্তফ্রন্টের সর্বমোট সদস্য সংখ্যা হয়েছিল ২৩০। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পেয়েছিল মাত্র ১০টি আসন।
বিজয়ের পর ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় ‘শেরে বাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হককে যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছিল। পরদিন ৩ এপ্রিল ফজলুল হক যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধান বা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। কোন দল থেকে কতজনকে মন্ত্রী করা হবেÑ সে প্রশ্নে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রথমে মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়া থেকে বিরত থেকেছে। ফলে ৩ এপ্রিল ফজলুল হক মাত্র তিনজনকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করেন। তারা ছিলেন কৃষক-শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকার ও সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং নেজামে ইসলাম পার্টির আশরাফউদ্দিন চৌধুরী।
আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মন্ত্রী নেয়া হয়েছিল ১৯৫৪ সালের ১৫ মে। মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আবদুস সালাম খান, হাশিমউদ্দিন আহমদ এবং শেখ মুজিবুর রহমান। কেএসপির নেতা হলেও ডা. বি চৌধুরীর পিতা কফিলউদ্দিন চৌধুরীকেও আওয়ামী মুসলিম লীগের কোটা থেকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক ছাড়া মোট ১২ জনকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা। এই মন্ত্রিসভা অবশ্য বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আদমজীতে সংঘটিত দাঙ্গা এবং পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করা হবে বলে কলকাতায় ‘শেরে বাংলা’র কথিত ঘোষণা প্রভৃতির অজুহাতে ২৯ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে বাতিল করা হয়। একই সাথে পূর্ব বাংলায় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ১২-ক ধারা জারি করে গভর্নরের শাসন প্রবর্তন করা হয়েছিল। গভর্নর পদে নিযুক্তি দেয়া হয় মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জাকে। এর মধ্য দিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের সে রাজনীতিরই বাস্তবায়ন ঘটেছিল, যার কারণে প্রতিষ্ঠাকালেই পাকিস্তান থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছিল।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে কয়েকটি তথ্যের উল্লেখ করা দরকার : ১. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপর ১৯৪৯ সালে অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইলের একটি আসনের উপনির্বাচনে প্রথমে মওলানা ভাসানীর কাছে এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকের কাছে করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী পরাজিত হয়েছিলেন। জমিদার পন্নী ছিলেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী। এই পরাজয়ের কারণে সরকার ১৯৫৪ সালের আগে পূর্ব বাংলা প্রদেশে আর কোনো নির্বাচনের আয়োজন করেনি। ফলে ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট নির্বাচিত পাকিস্তান গণপরিষদে পূর্ব বাংলা সত্যিকার অর্থে প্রতিনিধিত্বহীন অবস্থায় ছিল। কারণ, ৭৯ সদস্যের গণপরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধির সংখ্যা ৪৪ জন থাকলেও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের মতো মোহাজের ব্যক্তিরা প্রতিনিধিত্ব করে আসছিলেন- যারা পূর্ব বাংলা বা বাঙালীর পক্ষে কোনো ভূমিকা রাখেননি।
২. যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার জন্য সম্ভাবনার সৃষ্টি হলেও বানোয়াট অভিযোগে শেরে বাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রিসভাকে বাতিল করার পাশাপাশি ৯২-ক ধারার আড়ালে বিশেষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতাকে গ্রেফতার করেছিল সরকার। দলের সভাপতি মওলানা ভাসানীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা। সুইডেনের রাজধানী স্টকহমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেয়ার কারণে মওলানা ভাসানী সে সময় দেশে ছিলেন না। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে করাচীকেন্দ্রিক ক্ষমতাসীন চক্র ও ষড়যন্ত্রকারীরা সাফল্যের সঙ্গে যুক্তফ্রন্টে ভাঙন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্টের সংসদীয় দলের সভায় আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘শেরে বাংলা’ ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং তার ফলে যুক্তফ্রন্টে ভাঙন ঘটে। উল্লেখ্য, কলকাতা থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্টের ঐক্য টিকিয়ে রাখার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিব অনমনীয় থাকায় যুক্তফ্রন্ট ভেঙে গিয়েছিল।
৩. যুক্তফ্রন্টের এই ভাঙনে দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। এর কারণ, ৯২-ক ধারা প্রত্যাহারের পর ১৯৫৫ সালের ৬ জুন আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় গঠিত মন্ত্রিসভা ‘যুক্তফ্রন্ট’ নাম নিয়েই শপথ নিয়েছিল। অর্থাৎ যুক্তফ্রন্ট সরকারই ক্ষমতায় ফিরে এসছিল। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরিক আওয়ামী মুসলিম লীগ এতে সুযোগ পায়নি। এরই পাশাপাশি দলত্যাগ করেছিলেন আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সদস্য, যার ফলে দলটির পরিষদ সদস্য সংখ্যা কমে হয়েছিল ১০৪। ওদিকে গণপরিষদের ৩১টি মুসলিম আসনের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ পেয়েছিল ১৬টি। বড় দল হলেও আওয়ামী লীগের ভাগে এসেছিল মাত্র ১২টি আসন। পরবর্তীকালে উপনির্বাচনের মাধ্যমে একটি আসন পাওয়ায় দলটির সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ১৩।
এত বছর পর ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট নিয়ে যারা উল্লসিত হয়ে উঠেছেন, তাদের উচিত হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্টের ইতিহাস এবং পরিণতি স্মরণ করা। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দলের নেতাদেরই প্রধান দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে এবারের যুক্তফ্রন্টকেও সেবারের যুক্তফ্রন্টের মতো অশুভ পরিণতি বরণ না করতে হয়।
ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে নিবন্ধের বর্তমান পর্যায়ে পাঠকদের অন্য একটি বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। হঠাৎ শুনলে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে বিশেষ করে বিএনপির অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত ১৯৬০-এর দশকে বিপন্ন আওয়ামী লীগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। পাঠকরাও কিছু ঘটনা স্মরণ করতে এবং বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন। ৬ দফা উপস্থাপনার এবং এর ভিত্তিতে আন্দোলন প্রচেষ্টার প্রাথমিক পর্যায়ে, ১৯৬৬ সালের ৯ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে, ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আইয়ুব সরকার তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী হিসেবে অভিযুক্ত করে এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় পর্যন্ত তিনি কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দী অবস্থায় ছিলেন। তিনি বন্দী থাকাকালেই তাকে সভাপতি করে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়েছিল। প্রচন্ড দমন-নির্যাতনের কারণে দল হিসেবে শেখ মুজিবের ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ সে সময় অত্যন্ত দুর্বল ও বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। এর কারণ, একদিকে ৬ দফা প্রভাব সৃষ্টি করার মতো জনসমর্থন অর্জন করতে পরেনি, অন্যদিকে ৬ দফার প্রশ্নেই আওয়ামী লীগ দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। ১৯৬৭ সালের ২৩ ও ২৭ আগস্ট গঠিত হয়েছিল যথাক্রমে ‘পিডিএমপন্থী’ এবং ‘৬ দফাপন্থী'’ নামে পরিচিতি পাওয়া পৃথক দু'টি আওয়ামী লীগ। বন্দী নেতা শেখ মুজিবকে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের সভাপতি বানানো হয়। ‘পিডিএমপন্থী’ আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ- যিনি এর আগে শেখ মুজিবের দলেরও সভাপতি ছিলেন।
আওয়ামী লীগের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে দুটি মাত্র তথ্যের উল্লেখ করলে। প্রথম তথ্যটি হলো, ১৯৬৬ সাল থেকে তো বটেই, দলের সভাপতি শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী বানানোর পরও ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়ার সাহস পায়নি। দলের ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রস্তাবে অভিযুক্ত নেতাকে ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য’ সরকারের প্রতি ‘আবেদন’ জানানো হয়েছিল (২১ জানুয়ারি, ১৯৬৮)।
দ্বিতীয় তথ্যটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ঘোষিত ১১ দফার সমর্থনে এগিয়ে আসার পরিবর্তে ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগ ৮ জানুয়ারি গঠিত আটদলীয় জোট ড্যাক বা ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটিতে যোগ দিয়েছিল। ড্যাক-এর ৮ দফা কর্মসূচিতে সেকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি স্বায়ত্তশাসন শব্দটিরও উল্লেখ ছিল না, অনুপস্থিত ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রসঙ্গও। শুধু তাই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের দুই নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং খান আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে তৃতীয় নেতা হিসেবে শেখ মুজিবের মুক্তি চাওয়া হয়েছিল পঞ্চম তথা ‘ঙ’ দফায়। অন্য একটি কারণেও শেখ মুজিব অসম্মানিত হয়েছিলেন। ড্যাক-এর আহবায়ক ছিলেন পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান। অর্থাৎ, ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের অবস্থা সে সময় এতটাই শোচনীয় ছিল যে, দলটিকে শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বাধীন এবং পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক সাতটি দলের সমন্বয়ে গঠিত জোট ড্যাক-এর শরিক হতে হয়েছিল। উল্লে-খ্য, মওলানা ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এই জোটে যোগ দেয়নি বরং স্বাধীন অবস্থানে থেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান নির্মাণেও ৬ দফাপন্থী আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল না। বন্দী নেতা শেখ মুজিব তেমন অবস্থাতেই ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। স্বায়ত্তশাসন, প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী ঐতিহাসিক ‘ঘেরাও’ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং পল্টন ময়দানের জনসভায় আগত লক্ষাধিক মানুষকে নিয়ে সেদিনই ঘেরাও করেন গভর্নর হাউস (বর্তমান বঙ্গভবন)। ঘেরাওকারী ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানী পরদিন ঢাকায় হরতাল আহ্বান করেন।
১৯৬৮ সালের ৭ ডিসেম্বর হরতাল পালনকালে পুলিশের গুলিতে দু'জনের মৃত্যু ঘটলে মওলানা ভাসানী ৮ ডিসেম্বর সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালনের ডাক দেন। তিনি নিজে সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন এবং লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবানা জানাযা নামাজে ইমামতি করেন। মওলানা ভাসানীর ঘেরাও আন্দোলন স্বল্প সময়ের মধ্যে সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মূলত এই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় তিনটি ছাত্র সংগঠনের সমন¦য়ে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি। ১১ দফা ঘোষিত হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। ১১ দফাভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন স্বল্প সময়ের মধ্যে ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল, যার প্রচন্ড চাপে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান নতিস্বীকার না করে পারেননি। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবসহ সকল রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। আইয়ুবের পতন ঘটেছিল ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ।
দীর্ঘ সে ইতিহাসের গভীরে যাওয়ার পরিবর্তে সেকালের নির্যাতিত দল আওয়ামী লীগ এবং বর্তমান বিএনপির মধ্যে তুলনা করা যেতেই পারে। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিও লক্ষ্য করা যেতে পারে। কোনো মন্তব্য করার পরিবর্তে এখানে বরং সম্ভাবনার কথাটাই জানিয়ে রাখা হলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ