ঢাকা, সোমবার 24 September 2018, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দর্শনা-মুজিবনগর সড়কের গলাইদড়ি ঘাটের সেতুটি মরণফাঁদ

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা : চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা-মুজিবনগর সড়কে মাথাভাঙ্গা নদীর উপর নির্মিত গলাইদড়িঘাট সেতুটি এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের নজরদারির অভাব আর অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্থ সেতুটি কয়েকবার মেরামত করা হলেও অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি বরং ক্রমান্বয়ে অবনতি হচ্ছে। বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে ছোটবড় শত শত যানবাহনসহ হাজার হাজার মানুষ পারপার হচ্ছে এ সেতুর ওপর দিয়ে। ভারি যানবাহনের ভারে জরাজীর্ণ সেতুটি যে কোন সময় ধ্বসে পড়ে জানমাল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়াসহ  বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা-মুজিবনগর সড়কে মাথাভাঙ্গা নদীর উপর গলাইদড়ি ঘাটে ভবিষ্যতে প্রশস্ত করার ব্যবস্থা রেখে বেইলি সেতু নির্মাণ করে। নির্মাণকাজ শেষ হলে ওই বছরই ১৯৯৫ সালের ২ আগষ্ট তৎকালীন সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী অলি আহম্মদ বীর বিক্রম এ সেতুটির উদ্বোধন করেন। তখন থেকে এ সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল ও যোগাযোগ শুরু হয়।

সরেজমিনে সেতু সংলগ্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, নির্মিত সেতুৃটির মোট প্রশস্ততা ১৩ ফুট। তার মধ্যে দুই পাশে রেলিংয়ের ২ফুট বাদ দিয়ে চলাচলের জায়গা মাত্র ১১ফুট। যেকোন দিক থেকে এই সেতুটির উপর একটি বাস বা ট্রাক উঠলে পাশে আর জায়গা থাকে না। ফলে দুদিকে থেকে যাতায়াতকারী বাস, ট্রাক বা অন্য কোন যানবাহন সেতু পার হওয়ার সময় যে কোন এক দিকের যানবাহন সেতুর সামনের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেতুর উভয় পাশে অবৈধভাবে রাস্তার জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট। এছাড়াও সেখানকার উভয় পাশের এ্যাপ্রোচ রাস্তার ফাঁকা জায়গার পাশ থেকে মাটি সরে গিয়ে খাদের সৃষ্টি হওার কারনে পারাপারের অপেক্ষায় মালবাহী গাড়ি গুলোকে একপাশে কাত হয়ে বিপদজনক অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এর ফলে একই সময়ে দুদিক থেকে আসা যানবাহনগুলোকে সেতু পারাপার হতে অনেক বেগ পেতে হয়। এতে করে নষ্ট হয় অনেক মূল্যবান সময়। 

এ ছাড়াও বর্তমানে সেতুটির পাটাতনের নিচের বেশ কয়েকটি লোহার বীমের বিভিন্ন স্থানে ফাঁটল ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাটাতনের বিভিন্ন স্থানে জং ধরে ফুটো হয়ে গেছে। ঢিলা হয়ে গেছে বীমের সঙ্গে পাটাতনের সংযোগস্থলের নাট-বোল্টগুলো। অনেক স্থানের নাটবোল্ট ভেঙে নষ্ট হয়ে পাটাতন আলগা হয়ে গেছে। ফলে ভারি যানবাহন সেতুর উপর উঠলে ওই স্থান দেবে যায় এবং বিকট শব্দ হয়। এতে যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সেতু পারাপার হয়। চোরচক্র সেতুর দুপাশের রেলিংয়ের অনেকাংশের পাইপ কেটে চুরি করে নিয়ে গেছে। ফলে ওই স্থান ফাঁকা হয়ে থাকায় সেতু পারাপারের সময় পথচারী বা যানবাহন সেতুর নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীর পশ্চিম পাশে সেতুর নিচ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার ফলে সেতুর শেষ প্রান্তের পিলারটি হুমকির মুখে পড়েছে। পশ্চিম পাশে সেতুর নিচে অবৈধভাবে নদীর জায়গা দখল করে ঘরাবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছে অনেকে। এছাড়াও সেতুর উভয় পাশের ডান-বামে নদীর নাম, সেতুর নাম, নির্মাণের সন, দৈর্ঘ, প্রস্থ ইতাদি লেখা সম্বলিত দুটি করে সাইনবোর্ড থাকলেও বর্তমানে সেগুলো দখল করে বিভিন্ন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির উপর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোন নজরদারি না থাকায় এভাবেই দখলদারিত্ব চলছে। 

বর্তমানে এ সেতুর উপর দিয়ে প্রতিদিন মুজিবনগর থেকে ছেড়ে আসা ৫-৬টি পরিবহন সংস্থার প্রায় অর্ধ শতাধিক ঢাকাগামী কোচ, আঞ্চলিক রুটের বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ শত শত যানবাহন ও পথচারীরা চলাচল করে থাকে। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, বরিশাল জেলার মানুষ বিভিন্ন যানবাহনযোগে এ সড়ক দিয়েই যাতায়াত করে থাকে ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে মুজিবনগরে বনভোজন ও শিক্ষাসফর করার জন্য প্রতিদিন কয়েক শত বিভিন্ন ধরনের যানবাহনযোগে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে থাকে। এ অবস্থা চলে মার্চ মাস পর্যন্ত। আবার এ সময়ের মথ্যে চুয়াডাঙ্গা দর্শনা কেরু এন্ড কোম্পানী চিনিকলের মাড়াই মৌসুমে আখবোঝায় শত শত পাওয়ারট্রলি, ট্রাক্টর ইত্যাদি যাতায়াত করে। এছাড়াও এই দর্শনা-মুজিবনগর সড়কের ধারে অবস্থিত ডজনখানেক হাট বাজার থেকে কৃষিপণ্যসহ নানারকম মালামাল ভর্তী ট্রাক এ সেতুর উপর দিয়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। 

স্থানীয়রা জানান, বছর তিনেক আগে সেতুর পাটাতনের নিচের গার্ডারের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরার ফলে কয়েক স্থানে পাটাতন দেবে যায়। অভিযোগ পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সড়ক ও জনপথ বিভাগ গত দু বছরে বেশ কয়েকবার জোড়াতালি দিয়ে সেসব স্থান মেরামত করে। সেইসঙ্গে সেতুর দুপাশে “ধীরে চলুন, সামনে ক্ষতিগ্রস্থ সেতু, ৫টনের বেশি মালামাল বহন করা নিষেধ” লেখা সম্বলিত লাল রঙের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। বর্তমানে সে সাইন বোর্ডেরও কোন অস্তিত্ব নেই। প্রতিদিন এ সেতু দিয়ে মুজিবনগর, কেদারগঞ্জ, আটকবর, কার্পাসডাঙ্গা বাজার থেকে অবাধে ১০ থেকে ২৫-৩০ টন পর্যন্ত ধান, ভূট্টা, কাঠ, পাটসহ বিভিন্ন মালামাল বোঝাই করে ঝুঁকিপুর্ণ অবস্থায় ছোট-বড় ট্রাক এ সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করছে। অতিরিক্ত পণ্য বহনের কারনে ক্ষতিগ্রস্ত এ সেতু যেকোন সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই বড় ধরনের কোন দুর্ঘটনার ঘটার আগেই সেতুটি মেরামত করে এ পথে যাতায়াতকারী যানবাহন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি মেরমতের ব্যবস্থা করবেন বলে দাবী করেছে এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে চুয়ডাঙ্গা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জিয়াউল হায়দার বলেন, জরুরী ভিত্তিতে সেতুটি মেরামতের জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আবেদনটি যাওয়ার পর সেখান থেকে বরাদ্দের অনুমোদন পাওয়া গেলে সেতুটির কাজ শুরু হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ