ঢাকা, সোমবার 24 September 2018, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গত ৫ বছরে কয়রা সেতুতে আদায়কৃত টোলের দুই কোটি টাকা আত্মসাত!

খুলনা অফিস : গত পাঁচ বছরে খুলনার কয়রা সেতুর আদায়কৃত টোল অন্তত দুই কোটি টাকা জমা হয়নি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে! এমনি অভিযোগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ডিও (ডিমান্ড অব অর্ডার) লেটার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। ইজারাদারকে দিয়ে মামলার ফাঁদে ফেলে; আবার সেই ইজারাদার দিয়ে টোল তুলে গত পাঁচ বছর সমুদয় অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে অভিযোগ উঠেছে। অবশ্যই ডিও লেটারের শেষাংশে রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরূপকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সুপারিশও করেছেন ড. মশিউর রহমান।

ডিএ লেটারে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘বেতগ্রাম-তালা-পাইকগাছা-কয়রা সড়কে ৫১তম কিলোমিটারে অবস্থিত কয়রা সেতুতে অনির্ধারিত হারে টোল আদায় এবং অনিয়মের জন্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। আদায়কৃত টোল সরকারি কোষাগারে জমা হয় না ফলে টোল আদায় সরকারের কোন কাজে আসছে না। বিষয়টি আশু সুরাহা আবশ্যক।

খুলনা সড়ক বিভাগের সাথে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আলোচনা করে জানতে পেরেছেন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সেতুটি ৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য ইজারা দেয়া হয়। তারপর থেকে সেতুটি নিয়মিত ইজারা দেয়া হয়নি। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের জন্য ইজারা কোটেশন আহ্বান করা হয়েছিল, সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় দ্বিতীয় ইজারা কোটেশন আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয় ইজারা কোটেশনের সময়ে পূর্বের ইজারাদার মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে খুলনা সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন; মামলাটি চার বছর চলমান। মামলার প্রেক্ষিতে সরকারি কৌশুলি (জিপি) খুলনার সড়ক বিভাগকে পরামর্শ দেন যে, মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবছর ১০ শতাংশ বর্ধিত হারে মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে ইজারা বাবদ অর্থ আদায় করা যেতে পারে। বাদী ইজারাদার ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইজারা বাবদ কোন টাকা সরকারি খাতে জমা দেননি। অর্থাৎ এ বাবদ সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তি শূন্য।’

তিনি ডিও লেটারে আরও উল্লেখ করেন, ‘ইজারাদার টোল আদায় করছে, জনগণের মনে এজন্য চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ বছর নাগাদ রাজস্ব বাবদ সরকারি খাতে জমা শূন্য। আদালত কোন আদেশ দেয়নি। জিপি’র পরামর্শ কোর্টের আদেশ এবং সরকারের সিদ্ধান্ত হিসেবে কাজ করছে। সেতু ব্যবহারকারীর কাছ থেকে টোল আদায় এবং সরকারি খাতে জমা না দেয়ায় তছরূপের পর্যায় পড়ে।’

ডিও লেটারের শেষাংশে অর্থ উপদেষ্টা সুপারিশ করে লিখেছেন, ‘কয়রা সেতুর টোল আদায় আপাততঃ স্থগিত রাখা বা বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত বাদী মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বকেয়া ইজারার অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জনগণের কাছ থেকে টোল আদায় এবং সরকারি খাতে জমা না দেয়া তছরূপ বিবেচিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। (ডিও নং-২৪.৩৯.১৬.০০.০০.০১.২০১৮-১৩০)।

সূত্র জানিয়েছেন, ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতি অর্থ বছর সেতুটি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে অন্তত আট লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থ বছরে সেতুটি থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। তারপর রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির লক্ষে সেতুটির রাজস্ব বর্ধিত করে ইজারা কোটেশন আহ্বান করেছিল খুলনা সড়ক বিভাগ। প্রথম কোটেশনে সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়া দ্বিতীয় কোটেশন আহ্বান করে সড়ক বিভাগ। এ সময় দ্বিতীয় কোটেশন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজ। এরপর সরকারি দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ছত্রছায়ায় ও সড়ক বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে সেতুটির টোল আদায় করছে মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. নূর উদ্দিন। টোল আদায়কে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সাথে কয়েকবার বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল।

এ সব ব্যাপারে জানতে গত দু’দিন তার ব্যবহৃত মোবাইলে অসংখ্যবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় নগরীর দিলখোলা রোডে তার বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। আর সড়ক বিভাগের কেউ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট বিজন কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। রাজস্ব দিচ্ছে কি না, তা সড়ক বিভাগ বলতে পারবে।’

খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট শেখ মো. নূরুল হক বললেন, ‘কয়রা সেতুর টোল মুক্তকরণের দাবিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও নিয়ে হাজির হয়েছি। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে রাজস্ব দরকার; তাই টোল মওকুফ করার অনুরোধ কেউ করবেন না। পরে ডিও লেটারটি আমি ফিরিয়ে নিয়েছি। কয়রা সেতুতে কে বা কারা টোল আদায় করে তাকে আমি চিনিও না। তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই। তবে শিবসা সেতুর টোল আদায়কারী আমাদের যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ