ঢাকা, সোমবার 24 September 2018, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চরের মানুষ

আখতার হামিদ খান : [বাংলাদেশের অতীতের উন্নয়ন নদী শিকস্তি এলাকায়। গ্রাম, নগর, জনপদ অর্থাৎ সভ্যতার ক্রমবিকাশ হয়েছিলো নদীর ব্যবহারে। অথচ আমাদের দেশে তার উল্টো চিত্র। অসংখ্য নদ-নদীর এই বাংলাদেশ এগিয়েছে নদীকে বাদ দিয়ে। নদীও এসেছে ভয়াল রুদ্রমূর্তি নিয়ে। এমনই একটি অবহেলিত এবং প্রকৃতির খেয়ালে বন্দী পদ্মাপারের নর্থ চ্যানেল। নর্থ চ্যানেল একটি চর। চরের মানুষের জীবন-জীবিকা যেন মানবেতরের অচ্ছুত। সেই অচ্ছুত মানুষেও একটি জীবন আছে। যতোই আমরা “চৈরা” বলে গালি দেই না কেন তারা বেঁচে থাকে। যুদ্ধ করে। সংগ্রাম করে। ব্যবহৃ হয়।]
বৃষ্টি মাথায় ছুটতে হয়। অবিরাম ঝরে পড়ছে ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি। আশ্বিনে এমন মেঘ কেউ কখনও দেখেনি। যেন আষাঢ়ের ‘সাত কন্যার বিয়ে।’ সকালেই সিএন্ডবি ঘাটে পৌঁছে গেলো। গন্তব্য নর্থ চ্যানেল। জানা গেলো ফরিদপুরের সঙ্গে নর্থ চ্যানেলের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম নৌকা। গত দু’দিনের অবিরাম বৃষ্টির জন্য যে যোগাযোগেরও ছন্দ পতন হয়েছে। খুব প্রয়োজন ব্যতীত তেমন কোনো নৌকা যাওয়া আসা করছে না। অথচ নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নটি ঘাট থেকে মাত্র এক মাইলের জলপথ।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যান চলে স্কুল বন্ধু মোশারফের। স্কুলের খুব মেধাবী ছাত্র। ছিলো বেজায় ত্যাঁদড়। বিএন্ডবি ঘাট সংলগ্ন বাড়ি। ঘাট এলাকায় বাড়ি বরে বাবা তাঁর মাতবরের দুঃশ্চিন্তার খোরাক ছিলো সে। ফরিদপুর শহরে হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করতো মোশারফ। বাড়ি গেলে এবং বাইরে বের হলে মাতবর পিতা সব  সময় টিকটিকি লাগিয়ে রাখতো। ছেলে কি উল্টা-পাল্টা কিছু করছে।
সৌভাগ্যক্রমে মোশারফ এলাকাতে অবস্থান করছে। এক সময়ের দুর্দান্ত ছাত্র, প্রিয় বন্ধুর খোঁজ চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হতে হয়। বাড়িতে নেই। কেউ অনুসন্ধান করছে জানতে পেরে নিজেই খুঁজে নেয়। মোশারফ বিয়ে করেছে। এক সন্তানের জনক। পড়ালেখা অসমাপ্ত রেখে বাড়িতে চলে আসতে হয়েছে। বাবার পুরো ব্যবসার দায়িত্ব তার কাঁধে। উদ্দেশ্য জানতে পেরে বলে কোনো অসুবিধা নেই। নর্থ চ্যানেল তার হাতের তালু। ইউনিয়নটির নদী আর খালগুলো যেন হাতের রেখা। ঠিক হয় পরের দিন বাইশ সেপ্টেম্বর সকালে নর্থ চ্যানেলে যাবার। কেননা আবহাওয়া তখনও প্রতিকূলে। বৃষ্টির আক্রোশ অযথা ভিজিয়ে দিচ্ছে সবকিছু। পরদিনের সকালটিও মেঘে ঢাকা বৃষ্টির। টেলিফোনে মোশারফ জানায়, নৌকা ঠিক। দ্রুত বৃষ্টির মধ্যে যাত্রা। সিএন্ডবি ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে বৃষ্টিছটা কমে আসে। তবুও জলযাত্রার আয়োজন। সঙ্গী হয় মোশারফ আর নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের ভূমি অফিসের তহসিলদার নিলয় রঞ্জন সরকার। তহসিলদার সাহেব যাবেন ফিল্ড ভিজিটে। তিনি জানালেন, বর্তমানের ভূমি অফিসটি অন্যের জায়গা দখল করে আছে। তাও আবার ইউনিয়নের বাইরে। এজন্য কাজে বিশেষ করে ভূমি কর আদায়ে ভীষণ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়।
নৌকা ছাড়ে সকাল এগারোটায়। চ্যানেল ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। বৃষ্টির শব্দ ক্রমশ ¤্রয়িমাণ হয়। বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের উঠানামা বৃদ্ধি পায়। অলস অথচ দাম্ভিকতায় এগিয়ে যায় একটি খোলা নৌকা। পথিমধ্যে বৃষ্টি থামে। রাশি রাশি জল। চারদিকে জল। বৃষ্টি আর বরফ গলা জল। নর্থ চ্যানেলের চর দৃশ্যমান হয়। দূরে দেখা যায় অসংখ্য দ্বীপ। ঠিক দ্বীপ নয়, পানির উপর জেগে থাকা এক একটি গ্রাম। গ্রামগুলো নিয়ে নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন। অথচ তা যেন যোজন যোজন দূরের। শহর ছাড়িয়ে গ্রামও গ্রামও নয়। চরের মানুষ। অধিবাসীরা “চৈরা’ বলে পরিচিত। চৈরা একটি গালি হিসেবেও শহরের লোকেরা ব্যবহার করে। নৌকা এগিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হতে থাকে গ্রাম। হতে থাকে চরবাসির জীবন-জীবিকা এবং প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ কে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সে জীবন মানুষের। মানবেতর। সে জীবনেও কষ্ট আছে। আছে আহলাদ আর হাসির ফোয়ারা। নৌকা এগিয়ে যেতে থাকে। ক্রমাগত।
নর্থ চ্যানেলের অবস্থান
ফরিদপুর সদর থানার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে একটি হলো নর্থ চ্যানেল। নামের সঙ্গে দু’টি ইংরেজি শব্দ থাকলেও ইউনিয়নটি সবচেয়ে অবহেলিত এবং পশ্চাৎপদও বটে। ফরিদপুর শহর থেকে উত্তরে এর অবস্থানজ্জমাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। সড়ক যোগাযোগ ঐতিহাসিক সিএন্ডবি ঘাট পর্যন্ত। এর পর শুধু নৌকাই একমাত্র যোগাযোগের বাহন। অবশ্য শুকনো মৌসুমে পদ্মার শাখা নদী এবং খাল শুকিয়ে গেলে পায়েচলা পথও তৈরি হয়। তখন সৌভাগ্যক্রমে দু’য়েকটি গাড়ি ইউনিয়ন পর্যন্ত যেতে পারে।
জানা যায়, এই শতাব্দীর শুরুর দিকে একটি চরটি জেগে উঠে। তবে শুরুতে তা পদ্মার ভাঙা-গড়ার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করেও যুদ্ধ করেছে। এক সময় নিজের অস্তিত্ব পুরোপুরি টিকিয়ে রাখে। তবে ভাঙা-গড়ার যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। প্রতি বছর মূল পদ্মা ইউনিয়নটির কিছু অংশ কেড়ে নেয়। ধ্বংস করে দেয় জনপদ। আবার কয়েক বছর পর তা ফিরিয়েও দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় সংশ্লিষ্ট এলাকাটি জমিদারী প্রথায় কাঞ্চনপুর স্টেট এবং জমিদার মোহন মিয়ার এলাকাধীন ছিলো। ১৯৫০ সালের জমদিারী প্রথা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তা সরকারি জমি হিসেবে চিহ্নিত হয়। সে সময় এটি একটি ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিলো। স্বাধীনতার পূর্বে ইউনিয়নটি ভেঙে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। চর মাধবদী, ডিগ্রির চর এবং নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন। ফরিদপুর শহরের উত্তর দিকে চ্যানেলটি তৈরি হবার পর মূল ভূ-খণ্ড থেকে পদ্মা নদীর সমান্তরালে বিচ্ছিন্ন হয়। মাত্র একটি চ্যানেল দিয়ে বিচ্ছিন্ন ছিলো বলে নাম হয় ‘নর্থ চ্যানেল’। বর্তমানে এই ইউনিয়নটির মোট জমির পরিমান আঠার হাজার ২শ’ ৯৬ একর। যার মধ্যে নদী শিদকস্তি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৪শ’ ৫৩ একর। পয়স্তি জমির পরিমাণ ৭ হাজার ৮শ’ ৪৩ একর। তবে এই পুরো ইউনিয়নটি একটি ভূ-খণ্ডে সংযুক্ত নেই। ফরিদপুর শহরের ভূ-খণ্ড থেকে যেমনি বিচ্ছিন্ন; তেমনি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নটি মূল তিনটি খণ্ডে বিভক্ত। একটি অংশ মূল পদ্মার অপর তীরের কাছাকাছি অংশে অবস্থিত। অপর দু’টি অংশ পুরনো ভূ-খণ্ডের; দবে পদ্মার শাখা নদী দিয়ে বিভক্ত। পুরো ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৩ হাজার ৭শ’ ৮০ জন বলে জানা গেছে।
স্বভাব এবং সংগ্রামী জীবন
চর টেপুরাকান্দির খাল পাড়ে ৪২ রশি গ্রামে নতুন বাড়ি করেছেন আমিন খান। নতুন বাড়ি বললে ভুল হয়। সব কিছুই পুরনো। গত বন্যায় বাড়ি ভেঙে যাবার পর কেবল জায়গা বদল। চারদিকে অথৈ পানির মধ্যে কেবল আমিন খানের বাড়ি। খালের উপর দিয়ে যাবার সময় দেখা যায় কয়েকজন শিশু বসে একটি ছাগলকে টে ঘাস খাওয়াচ্ছে। নৌকা থেকে নেমে জিজ্ঞেস করতেই বেরিয়ে আসে আমিন খানের স্ত্রী তছিরুন নেসা। কোলে পাঁচ বছরের ছোট এবং শেষ সন্তান সেলিনা। প্রত্যেক শিশুর অবস্থা তছিরুন নেসার। জানা গেলো, তাদের পাঁচ সন্তান। তিন মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে, নাম আমেনা। বয়স ১৩ বছর। ক্লাস ফোর-এ পড়ালেখা করতো। দশ মাস আগে নতুন বাড়িতে আসার পর পড়ালেখা বন্ধ। শুধু আমেনার নয়। ঝরনা খাতুন (১১), আনোয়ার (৯), আজিজ (৭) সবারই স্থান বদলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ। আমিন খান কৃষি কাজ করেন। বিঘা দুই ভুঁই। তার অর্ধেক গিরবি (বন্ধক) দেয়া আছে ১২ হাজার টাকায়। সে জমি বন্ধকী ছাড়ানোর আশা করেন না তছিরুন নেসা। কারণ নদীর পারে বলে মূল্য অনেক কমে গেছে। বাকি এক বিঘা জমিতে আর কিছু ফলানো হয়নি। পুঁজি নেই। তাই আমিন খান দিনমজুরির কাজ করেন। অন্যের ক্ষেতে কিংবা কখনও কখনও মাছ ধরে দিন চালান। তবে এ দিয়ে সংসার আর চলে না। মাঝে মাঝে কিছু সরকারি সাহায্য উৎসব নিয়ে আাসে পরিবারটিতে।
এর মধ্যে শোনা যায় পিলে চমকানো খবরটি। এমন একটি হতদরিদ্র সংসারেও ডাকাতি হয়। হাতের কড়াগুনে তছিরুন নেসা জানায়, গত বাইশ দনি আগের এক রাতে তার ঘরে ডাকাতি হয়েছে। গভীর রাতে ডাকাত এসে আমিন খানের হাত-পা বেঁধে বিছানায় কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখে। ডাকাতরা এরপর ৩ বস্তা ধান, ২ বস্তা রসন, ৩টি কাসার থালা, বদনা, পালা-পাথর, তছিরুন নেসার স্বর্ণের নাক ফুল, রূপার হাড়, একটি দা ইত্যাদি সাংসারিক জিনিসপত্র নিয়ে যায়। খালি অবস্থাটিকে আরও শূন্য করে দিয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের সংসার কিভাবে চলছে তছিরুন নেসা জানেন না। তবুও তার সম্বল কিছু আছে। আছে দু’টি বাছুর, ৩টি ছাগল, ৩টা মুরগি এবং ৭টি আহারের মুখ। সে মুখগুলোর জন্য প্রতিদিন ৪ কেজি চালের দিয়েছিলো। সে চাল দিয়ে ৩দিন চালিয়েছেন তছিরুন নেসা। আগামীকাল কিভাবে চলবে তা আর বলতে পারেন নি তিনি। জানালেন, এসবের মধ্যেও আমেনার পাতলা পায়খানা হচ্ছে। ওষুধ কিংবা স্যালাইন খাওয়ানো হয়নি। ডাক্তার দেখানো তো বিলাসিতার মতো ঘটনা। সেলিনার জ্বর। তার জন্যেও আলাদাভাবে কিছু বরাদ্দ হয়নি।
ডাকাতির পথ থানায় জিডি করা হয়নি। থানা অনেক দূর। যাবারও একটি খরচ আছে। নর্থ চ্যানেলে চুরি, ডাকাতি, কিংবা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও তা আইন-আদালত পর্যন্ত গড়ায় না বলে জানা গেছে। এখানে পুলিশও আসে কদাচিৎ। তবে পুলিশের উপস্থিতি তারা চায় না বলে একাধিক চরবাসী জানিয়েছেন। তেমন ঘটনা ঘটলেও স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হয়। এই অবস্থায় নর্থ চ্যানেলে চুরি-ডাকাতি অহরহ ঘটে। ডাকাতরা আসে নদীর অপর তীর থেকে। অন্য জেলা থেকে। ডাকাতরা ঘরের বউ কিংবা মেয়েও ডাকাতি করে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। ডাকাতি করা মেয়ে কিংবা বউকে আবার কিছুদিন পর ফিরিয়ে দেয়া হয়। এখানে মেয়ে মানুষ ডাকাতি করা হয় শুধুমাত্র আদিম কারণে। ফিরে আসা মেয়েটি আপাত স্বাভাবিক জীবনও ফিরে পায় বলে জানা গেছে। তবে অনুসন্ধান করে এমন ডাকাতি হওয়া কোনো মেয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
চলে আসবার সময় তছিরুন নেসা শুধু জিজ্ঞেস করে -এগুলো জাইন্যা কি করবেন? প্রশ্নটির কোনো উত্তর দেয়া হয় না। তছিরুন নেসাও আর কথা বাড়ায়নি। এমনকি কোনো সাহায্য কিংবা প্রতিশ্রুতি চায়নি। অথচ গোলডাঙ্গি হাটের ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে ছবি তুলতে গেলে অনেক কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। প্রশ্ন আসে-আমাদের কি দেবেন? এমন স্বভাবজাত ব্যবহার আরও অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। সবার মধ্যেই একটি আশা-সাহায্যের। সরকারি সাহায্যের। এ বিষয়ে তহসিলদার বাবু জানালেন, আসলে এরা না পেতে পেতে অর্থাৎ সংগ্রাম করতে কতে এমন হয়ে গেছে বাইরের কেউ এলেই ভাবে সাহায্য পাওয়া যাবে। তিনি জানালেন, ’৯৩ সালের দিকে প্রায় ৯৪ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয় নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নে। সে ঋণের অর্ধেক টাকা এখনো পর্যন্ত ফেরৎ পাওয়া যায়নি। তবে ঋণের টাকা অযথা ভেঙে ফেলার আরও একটি কারণ হলো-অভাব। তাদের খাদ্যের সংস্থান করতে দিনমান ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই প্রজেক্ট বিহীন এমন ঋণের টাকা দিয়ে অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতা উৎপাদন কিংবা বিনিয়োগ না করে সরাসরি খাদ্যের সংস্থান করেছে বলে জানা গেছে।
ইউনিয়নটির দক্ষিণ দিকের অংশে চলে নদী ভাঙা-গড়ার খেলা। সেজন্য দক্ষিণ জনপদের মানুষগুলোও অধিক সংগ্রামী। তাদের পেশাও বিচিত্র। যা বারবার বদলে যায়। তাদের অধিকাংশই দ্রুত পেশার পরিবর্তন ঘটায়। দেখা যায় কেউ এক বছর কৃষি কাজ করে জীবিকা চালাচ্ছে। পরের বছর সে হয়তো জেলে, নৌকার মাঝি অথবা শহরের রিক্সা চালক। পুরো ইউনিয়নটিতে আগে চরের লাঠিয়াল দেখা গেলেও তা এখন স্মৃতি। ভূমি রেজিস্ট্রেশনের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা বিলুপ্ত হয়েছে লাঠিয়াল সন্ত্রাস।
বিচ্ছিন্ন কৃষি ব্যবস্থা
ফরিদপুরের অন্যান্য এলাকার চেয়ে নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নটির কৃষি মাটি বেশ উর্বর বলে জানালেন থানা কৃষি বিভাগের বিষয়বস্তু কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ। সংশ্লিষ্ট এলাকার পয়স্তি জমির পুরো অংশই চাষযোগ্য। আর অধিবাসীদের একমাত্র উৎপাদনশীল পণ্য হলো কৃষি ফলস। ইউনিয়নের ১২টি মৌজায় ২ হাজার ২শ’ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য। যা বর্ষা মৌসুমে ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এখানে চাষীর সংখ্যা ৩ হাজার ৭শ’ ৩৬ জন। যা ইউনিয়নটির মোট অধিবাসীর ২৭.১১ শতাংশ।
এলাকাটি অচ্ছুত, অবহেলিত হলেও এর জমি খুবই উর্বর। আধুনিক কোনো চাষাবাদ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি এখানে। যা আছে তা অবস্থাপন্ন দু’য়েক ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোনো ডিপ টিউবয়েলও বসেনি। স্যালো মেশিন দিয়ে নদী বা খাল থেকে পানি টেনে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করা হয়। তবে কৃষকদের মধ্যে অনুধুনিক পদ্ধতিতে সারের ব্যবহার প্রচলিত বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। অধিকাংশ জমি বাদাম চাষের উপযোগী। উৎপাদন ব্যয় কম এবং জমিতে কীট পতঙ্গের আক্রমণও কম হয় বলে জানা গেছে। এই এলাকায় বর্তমানে ৪১০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় আউশ ধানের চাষ করা হয়। বাদাম হয় ৩৮০ হেক্টর জমিতে। ২৩৫ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো এবং ৬৮ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড বোরো উৎপাদিত হয় বলে থানা কৃষি অফিস জানায়। রসুন ১৬৪ হেক্টর, গম ৮৩৫ হেক্টর, পাট ২৫ হেক্টর এবং পেঁয়াজ ১৯৫ হেক্টর জমিতে চাষ হয় বলে জানা গেছে। উৎপাদিত এই ফসলের মধ্যে হেক্টর প্রতি ধান এবং পেঁয়াজ সবচেয়ে বেশি হয়। ধান হয় ৯ টন করে এবং পেঁয়াজের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৮.১ টন। অথচ চাষের আয়তন হিসেবে নর্থ চ্যানেলের কৃষক হারেজ মিয়া তা চাষস করতে পারেন না। তার মতে বীজের দাম খুব বেশি। সে সামর্থ্যও তার নেই। আর ঋণ নিয়ে চাষ করার সাহসও তিনি পান না বলে জানান। কেননা এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্য সঙ্গী। ঋণের টাকা পরিশোধ না করতে পারলে জমি হাত ছাড়া হয়ে যাবে যে। এ সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কৃষি কর্মকর্তা জানান, এজন্য নর্থ চ্যানেলের কৃষকদের ফসলভিত্তিক ঋণ দেয়া শ্রেয়। যেখানে জমি বন্ধকীর ঝামেলাও থাকে না।
সার্বিক বিবেচনায় নর্থ চ্যানেলে কিংবা এমন চর এলাকায় বিশেষ শস্যের জোন গড়ে তোলা উত্তম বলে আব্দুল লতিফ জানান। তার মতে নর্থ চ্যানেলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এখানকার জমিতে বছরে দু’বার বাদাম চাষ সম্ভব। হেক্টর প্রতি বাদামের উৎপাদনও ভালো। যা লাভজনক। এজন্য নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাদাম কিংবা পেঁয়াজ চাষের জোন গড়ে তোলা যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিমত দিয়েছেন।
স্কুলের পথ দুর্গম
নর্থ চ্যানেলে প্রাথমিক স্কুল আছে মাত্র ৪টি। আর রেজিস্টার্ড হাই স্কুল মাত্র একটি। এছাড়াও আছে দু’টি মক্তব। এলাকা গুনে শুনে জানালেন ১৯ নম্বর চর টেপুরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ। স্কুলের পরিসংখ্যান বিষয়ে থানা শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করা হলে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। থানা শিক্ষা অফিসার নুরুল নাহার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে তা জানাতে ব্যর্থ হন। বর্ষা মৌসুমে চরের স্কুলের পথগুলো হয়ে যায় দুর্গম। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। কাঁচা রাস্তাগুলো মাঝে মাঝে ভাঙা, নয়তো পানির নীচে ডুবে যায়। তখন ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে আসার একমাত্র অবলম্বন থাকে নৌকা আর ভেলা। আবার কোনো কোনো শিশু জামা-প্যান্ট এবং বই-খাতা উঁচুতে ধরে একহাত সাঁতার কেটেও স্কুলে আসে। আসে পানি-কাদা ডিঙ্গিয়ে। বন্যার মাত্রা বেশি হলে স্কুল ঘরই ডুবে যায় বসে জানা গেছে। এ সময় শিক্ষা কার্যক্রম পুরো বন্ধ হয়ে যায়। তখন ছাত্র-ছাত্রীদের জলকেলিতে সময় কাটে দিনমান। যেন জলজ সন্তান। কাজের বিনিমেয় খাদ্য কর্মসূচির আওতায় নর্থ চ্যানেলে কিছু মাটির সড়ক নির্মিত হলেও প্রতি বছর ভেঙে যায়। ভেঙে যায় পানির তোঁড়ে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর পুরো নর্থ চ্যানেল ঘুরে কিছু উঁচু মাটির তৈরি সড়ক দেখা গেলেও তা ছিলো খণ্ড বিখণ্ডিত। একমাত্র উঁচু মাটির সড়ক গোলডাঙ্গি নৌ-ঘাট থেকে গোলডাঙ্গি বাজার ছাড়িয়ে হাইস্কুল পর্যন্ত গিয়েছে। এই সড়কটিও বাজার পর্যন্ত আধা কিলোমিটারে তিন স্থানে ভাঙা। এমন যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ পরিচালিত গত মে মাসের শিশু-শিক্ষা ও সাক্ষরতা জরিপ থেকে জানা যায়, নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নটির মোট জনসংখ্যা ১৪ হাজার ৭শ’ ৯৯ জন। তার মধ্যে চিঠি লিখতে ও পড়তে পারে মোট ২ হাজার ৬শ’ ২৬ জন। অর্থাৎ শিক্ষিতের হার ১৭.৭৪ শতাংশ মাত্র। আর পনের বছরের নীচে শিক্ষিত শিশু আছে ৯৯৫ জন। অর্থাৎ ইউনিয়নটির মোট জনসংখ্যার ৬.৭২ শতাংশ শিশু পড়লেখা করছে। যা মোট শিশুর শতাংশ ৩১.১৪।
একটি স্কুল
নৌকা থেকে দূরে দেখা যায় স্কুলটি। চারদিকে টিন শেড। সামনে ফাঁকা মাঠ। ঠিক মাঠ নয়, যেন এক চিলতে জমিন। সদ্য পানির নীচ থেকে জেগে উঠেছে। উপরে নরম কাদার আস্তরণ। মাঠের শেষ প্রান্তে স্কুল ঘরের মাঝ বরাবর একটি জাতীয় পতাকা। গ্রামীণ অবয়বে এই পতাকায় স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য জানান দেয় স্কুলটির। ফাঁকা জমিন পেরিয়ে স্কুলে আর যাওয়া হয় না। ঘুরে খাল পাড়ে যেতে হয়। নৌকা থেকে খালি পায়ে কাদা আর হাঁটু পানি ডিঙ্গিয়ে পৌঁছা গেলো ১৯ নম্বর চর টেপুরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
পুরো টেপুরাকান্দি একটি মাত্র ঘর। বাম পাশে একটি টেবিল। টেবিল ঘিরে ৩টি চেয়ার। টেবিলের পেছনে এক মাত্র আলমিরা। এই নিয়ে স্কুল শিক্ষকের এলাকা। রুম নয়।
শিক্ষকদের বসার স্থানের ডানপাশে তিনটি ভাগে দুই সারিতে বেঞ্চ বসানো। এই তিনটি ভাগ কাজ করছে তিনটি ক্লাস রুম হিসেবে। অর্থাৎ ৩টি ক্লাসের এলাকা। দুই শিফটে  স্কুল চলে। মর্নিং শিফটে ক্লাস ওয়ান এবং টু। ডে শিফটে থ্রি, ফোর এবং ফাইভ-এর ক্লাস চলে। স্কুলটির শিক্ষক মাত্র ৩ জন। প্রধান শিক্ষক ওবায়দুর রহমান। সহকারী প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ এবং শিক্ষিকা ফিরোজা বেগম। পাঁচটি শ্রেণীতে মোট ছাত্র-ছাত্রী অর্থাৎ খাতা-কলমে ১৯৪ জন। প্রথম শ্রেণীতে ৫৫ জন, দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৫০ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩৬ জন, চতর্থ শ্রেণিতে ৩৩ জন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ২০ জন ছাত্র-ছাত্রীর রেকর্ড পাওয়া যায়।
১৯৪৫ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর হয় সরকারিগণ। জানা যায় স্কুলটির ৩ জন শিক্ষকের বাড়িই ইউনিয়নটির বাইরে। শিক্ষকদের বর্ষা মৌসুমে দুর্গম জলজপথ অতিক্রম করে আসতে হয়। গত ২২ সেপ্টেম্বর সকাল বেলা চর টেপুরাকান্দি স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায় ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকের উপস্থিতি মারাত্মক কম। ৩ জনের মধ্যে একজ শিক্ষক নেই। প্রথম শ্রেণিতে ৫৫ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপস্থিত মাত্র ১০ জন। অর্থা প্রথম শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ছিলো মাত্রা ১৮.১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উপস্থিতির হার ছিলো মাত্র ১৬ শতাংশ। ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি সম্পর্কে শিক্ষিকা ফিরোজা খানম বলেন, শিক্ষার ব্যাপারে চরের মানুষদের অসচেতনতা তো আছেই। আর বর্ষা মৌসুমে পানির কারণে এমনিতেই উপস্থিতির হার কমে যায়। মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, এমন একটি স্কুল ঘরে এক সঙ্গে দুই/তিনটি ক্লাস নিতে খুব সমস্যা হয়। যা মাত্র দুটি চটির বেড়া দিয়ে তিনটি ক্লাস রুমকে পৃথক করা সম্ভব। অথচ সে উদ্যোগটি প্রশাসনিক কিংবা সামাজিকভাবে কখনও নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এছাড়াও আরও একটি অভিযোগ পাওয়া যায় খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি নিয়ে। ফরিদপুর সদর থানার তিনটি ইউনিয়ন খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচি চালু হলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে নর্থ চ্যানেলকে। অথচ অবহেলিত এবং দুর্গত যাতায়াত ব্যবস্থায় স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার কম বলে খাদ্যের বিনিমেয় শিক্ষা কর্মসূচি ফলদায়ক হতো। তবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নর্থ চ্যানেলকে বাদ দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান। কেননা নর্থ চ্যানেল থেকে এমন কোনো নেতা বা বলিষ্ঠ চেয়ারম্যান নেই যে প্রশাসনিক শিক্ষার এ সুযোগ আদায় করতে পারেন। তবুও চরের জীবনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়ালেখা থেকে থাকেনি। সামান্য হলেও উপস্থিতি ঘটে ছাত্র-শিক্ষকের। যেমন প্রথম শ্রেণীর ফয়সাল। ফয়সাল প্রতিদিন প্রায় এক মাইল জলজপথ অতিক্রম করে এই স্কুলে আসে। পড়ালেখা করে। ইচ্ছে শিক্ষার মাধ্যমে জীবনকে দেখে নেয়ার।
তের হাজার মানুষ ডাক্তার নেই একজনও
তছিরুন নেসার পাঁচ সন্তানের মধ্যে ৩ জনকে পাওয়া যায় অসুস্থ। অথচ তাদের জন্য নেই কোনো এমবিবিএস ডাক্তার কিংবা কোনো ডাক্তারি সেবা। এমনকি নর্থ চ্যানেলে তের হাজার অধিক অধিবাসীর জন্য নেই কোনো মেডিকেল অফিসারের সেবা পাবার সৌভাগ্য। তছিরুন নেসার বাড়ি থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে নর্থ চ্যনেল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। গ্রামে যা সবুজ ছাতা বলে পরিচিত। কিন্তু সবুজ ছাতার ছায়া পাবার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। এ সম্পর্কে তছিরুন নেসা কিছু জানে না বলে জানান। তবে কোনো সন্তান খুব বেশি অসুস্থ হলে সদর হাসপাতালে নেয়া হবে বলে জানান।
আরো কিছু এবং শেষ কথা
নর্থ চ্যানেলে কয়েকটি এনজিও কাজ করছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে আছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের একটি পারিবারিক তথ্য কেন্দ্র। যদিও ইতোমধ্যে এনজিওটি সমগ্র ফরিদুরে বিতর্কিত জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। আছে ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি এন্ড রিচার্স সেন্টার সংক্ষেপে ডার্ক নামের একটি স্থানীয় এনজিও। তাদের কাছে নর্থ চ্যানেলে।
বিষয়ক কোনো গবেষণার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে ডার্ক চরের মানুষের সেনিটেশন এবং সমিতি গঠনের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এই ডাইরেক্টর মোহাম্মদ হায়দার আলী খান জানালেন, এই চরের নিরানব্বই ভাগ মানুষের কোনো স্বাস্থ্যসমম্মত সেনিটেশন ব্যবস্থা নেই। আর সে লক্ষ্যেই ডার্ক কাজ করে যাচ্ছে। ডার্কের আছে একটি ভিলেজ সেনিটেশন সেন্টার। সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত সেনিটারি ল্যাট্রিন তৈরি হয়। গত এক বছরে মাত্র দুশ’টি সেনিটারি ল্যাট্রিন বিক্রি হয়েছে বলে হায়দার আলী খান জানান। তার মতে স্থানীয় মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে চায় না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ