ঢাকা, মঙ্গলবার 25 September 2018, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঢাকার বর্জ্য পরিণত হবে সম্পদে

* দুটি কারখানায় দৈনিক ৪০ টন ডি কম্পোস্ট বা জৈব সার উৎপাদন সম্ভব
* বর্তমান বাস্তবতায়  জৈবসার রাসায়নিক সারের বিকল্প হতে পারে
* দেশে নতুন করে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে
মুহাম্মদ নূরে আলম : কোনো কিছুই ফেলনা নয়, এ রকম একটি কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। কথাটি উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সত্যতা প্রমাণিত। আমরা সাধারণত আবর্জনাকে অপ্রয়োজনীয় বলেই গণ্য করে থাকি। তা যে কোনো ভালো কাজে আসতে পারে এবং সেই কাজের মাধ্যমে আমরা নানা দিক নিয়ে লাভবান হতে পারি, এটা ভাবনায় আশ্রয় দিতে চাইনে। অথচ উদ্ভাবক বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে দিয়েছেন আবর্জনা ফেলনা বা অকেজো নয়। তা থেকে সার তৈরি হতে পারে, যা কেবল মানসম্পন্নই নয়, পরিবেশ সহায়কও। বর্তমান বাস্তবতায় জৈবসার রাসায়নিক সারের বিকল্প হতে পারে। ঢাকা শহরের ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন বর্জ্য ডেমরার মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে আনা হয়। দুটি সার কারখানা স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে আমরা দুটি জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে, একটি নগরীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মাতুয়াইলে এবং অন্যটি উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার এলাকায়। দুটি কারখানায় দৈনিক ৪০ টন জৈব সার উৎপাদন সম্ভব। যার ফলে দেশে নতুন করে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ঢাকায় আবর্জনা থেকে জৈবসার তৈরির ৪টি প্রকল্প রয়েছে। মিরপুর, ধলপুর, গ্রীনরোড ও বেইলি রোডে স্থাপিত এই প্রকল্প ৪টিতে দৈনিক ৩ টন আবর্জনা থেকে ৭৫০ কেজি সার উৎপাদিত হচ্ছে। ১০০ একর আয়তনের এ ভাগাড়ের যেদিকে চোখ যায়, শুধু আবর্জনার স্তূপ। সারা দিন এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ চলে। যন্ত্রের পাশাপাশি খালি হাতে কাজ করে চলেছেন শ্রমিকেরা। এই বর্জ্যের ওপর অনেকেরই জীবিকা নির্ভর করে। প্রতিদিন একদল লোক আবর্জনার স্তূপ থেকে কাগজ, হাড়, কাচ, লোহা, প্লাস্টিক, নারকেলের মালা (খোসা) ইত্যাদি বর্জ্য আলাদা করেন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। একেকজন প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। ল্যান্ডফিলে থাকা বিভিন্ন কারখানায় এসব বর্জ্য চলে যায়। সেখানে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলে। কারখানায় নিয়োজিত একেকজন শ্রমিক মাসে ৯ হাজার থেকে সাড়ে ১০ হাজার টাকা বেতন পান। তবে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ও পদ্ধতি স্বাস্থ্যসম্মত নয়। নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই তাঁরা এখানে কাজ ও বসবাস করছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রে এইসব তথ্য জানাযায়।
আবর্জনা থেকে  জৈব সার: রাজধানীর আবর্জনাকে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তর এরই মধ্যে দুটি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে। এ দুটি প্ল্যান্টের মাধ্যমে নগরীর সব বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তরিত করা হবে। ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ জৈব সার কারখানা দুটি স্থাপন করা হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নেওয়া এই সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজম্যান্ট ফোকাস প্রকল্পটি মূলত ‘ থ্রি আর’ (রিডিউস, রিইউজ এবং রিসাইকেল) নামে পরিচিত। ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ডের সহায়তায় পরিবেশ অধিদপ্তর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
থ্রি আর প্রজেক্টের পরিচালক রাহিদ হোসাইন বলেন, ‘দুটি সার কারখানা স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে আমরা দুটি জায়গা নির্ধারণ করেছি। একটি নগরীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মাতুয়াইলে এবং অন্যটি উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার এলাকায়। প্রতিটি কারখানা দৈনিক ২০ টন সার উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন হবে উল্লেখ করে রাহিদ হোসাইন বলেন, ‘শিগগিরই কারখানা দুটি স্থাপনের জন্য আমরা দরপত্র আহ্বান করব। আশা করছি আগামী বছরের শুরুর দিকেই আমরা আবর্জনা থেকে সার উৎপাদনে যেতে পারব।’
বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘বর্তমান সরকারের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা হবে। প্রথমে এই প্রকল্পটি আমরা পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু করছি। এখানে সফল হলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে পরবর্তী সময়ে এই কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।’
এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের ৬৪টি জেলায় বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনের লক্ষ্যে আরো একটি প্রকল্প ‘ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম)’ বাস্তবায়ন করছে। আর এই প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে রংপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ এবং কক্সবাজার জেলায় সার কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। ওয়েস্ট কনসার্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল পরামর্শক মাকসুদ সিনহা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সারা দেশে সার কারখানা স্থাপন করা যেখানে মূলত বর্জ্য ব্যবহার করে সার উৎপাদন করা হবে। এতে আমাদের কৃষিকাজে সারের চাহিদা শতভাগ পূরণ হবে।’
 দেশে উৎপাদিত বর্জ্যের প্রায় ৭০ ভাগেরও বেশ জৈব বর্জ্য উল্লেখ করে সিনহা বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবহার করে সার উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আর এতে বাংলাদেশ যেমন, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে তেমনি পরিবেশগত দিক থেকেও লাভবান হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাইভেট সেক্টরকেও সরকার উৎসাহ দিতে পারে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক সহযোগিতা যেমন, লিজ ভিত্তিতে জমি দিয়ে যাতে তারাও স্বল্প খরচে সার কারখানা স্থাপন করতে পারে। তা ছাড়া যদি বাণিজ্যিকভাবে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটিকে লাভজনক করা না যায় তবে উদ্যোক্তারা কখনোই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হবে না। তিনি আরো বলেন, ‘ মেগা সিটি ঢাকাতে  দৈনিক প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টনেরও বেশি বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যকে একটি সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।’
সিনহা আরো বলেন, ‘আমেরিকা, ইউরোপ অথবা জাপানের দিকে তাকালে দেখতে পাই তাদের তুলনায় আমাদের বর্জ্য উৎপাদন অনেক কম। পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে জনপ্রতি প্রায় তিন কেজি বর্জ্য উৎপাদন করছে সেখানে আমাদের মাথা পিছু বর্জ্য উৎপাদন মাত্র ০.৫ কেজি। কিন্তু তারা তাদের উৎপাদিত এসব বর্জ্যকে সঠিক উপায়ে পুনরুৎপাদনের কাজে ব্যবহার করছে- যা আমরা পারছি না।’
বিজ্ঞানীদের উদ্যোগে এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ঢাকায় আবর্জনা থেকে জৈবসার তৈরির ৪টি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অল্প শ্রমে ও অল্প খরচে জৈব সার উৎপাদন সম্ভব এবং তুলনামূলকভাবে এ সারের দামও কম। বলা যায়, সব দিক দিয়েই লাভ। আরও একটি বড় লাভ এই যে, এতে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। জানা গেছে, সারাদেশে আবর্জনা থেকে সার উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে অন্তত ৯০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। ঢাকা শহরেই হবে ১৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। শুধু শহরে নয়, গ্রামেও এ প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। গ্রামের কৃষকদের বিশেষ করে গ্রামের ভূমিহীন ও দিনমজুরদের উদ্বুদ্ধ করে ও উপযুক্ত প্রশিক্ষিণ দিয়ে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহী করে তোলা হলে এবং এ ক্ষেত্রে তাদের কাম্য সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে জৈব সারের উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি অন্যদিকে অনেকের কর্মসংস্থান হবে এবং পারিবারিক আয় বাড়বে।
ঘরের বিভিন্ন আবর্জনা হতে পারে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরির চমৎকার উপকরণ। শাকসবজি বা ফলের অবশিষ্টাংশ, ঘাস লতাপাতা, অব্যবহৃত কাঠের ব্রাশ, চা বা কফির ফেলে দেয়া গুড়ো, ঘুনে ধরার ফলে সৃষ্ট কাঠের গুঁড়ো, গৃহপালিত পশুর বর্জ্য, এসব দিয়ে তৈরি করতে পারেন কম্পোস্ট সার। তবে কোনভাবেই রোগাক্রান্ত গাছ কিংবা মাংসজাতীয় পদার্থের বর্জ্য কম্পোস্ট সার তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এদের থেকে রোগ-ব্যাধি ছড়াতে পারে। কি পরিমাণ সার তৈরি করবেন, কতদিন ধরে এগুলোকে স্তূপীকৃত করে রাখবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার ঘরে কি পরিমাণ আবর্জনা জমা হচ্ছে বা আপনার কি পরিমাণ মিশ্র সার দরকার তার উপর। ভারতের দিল্লীতে বিশ্ব জৈব কৃষি কংগ্রেস ২০১৭ তে বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি কৃষকরা অংশ গ্রহণ করেন। যেসব ফসল বা উদ্ভিদ তুলনামূলক ভাবে উপেক্ষিত তাদের গুরুত্ব নিয়ে বিজ্ঞানী ও কৃষকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এখানে কৃষকরা যাতে রাসায়নিক সার কম ব্যবহার করে জৈবসার বেশি করে ব্যবহার করেন তার প্রতি গরুত্ব দেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ