ঢাকা, বুধবার 26 September 2018, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমবে অর্থনীতিতে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব

এইচ এম আকতার : ব্যাংক আমানতের সুদের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি হওয়ায় তা কেনার হিড়িক পড়েছে। ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলন করে সঞ্চয়পত্র কিনছেন গ্রাহকরা। প্রতিদিন সঞ্চয়পত্র কিনতে গ্রাহকেরা ভিড় করছেন ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো ও ডাকঘরগুলোতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকার। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। এতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি অর্থ বছরে সজ্ঞয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু এক মাসে তা বিক্রি হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে ১২ মাস বিক্রি হয়ে সজ্ঞয়পত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াবে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। কি হবে এ টাকায়। এখাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার কথা রয়েছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকার কোথায় বিনিয়োগ করবে।
সরকার দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তাতে অনেক কম সুদ দিতে হয়। এতে সময়ও অনেক বেশি পাওয়া যায়। কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। কিন্তু সরকার তা না করে এ খাত থেকে ঋণ নেয়ায় সরকারের বাজেট ব্যয় বাড়ছে। আর এর দায় চাপছে জনগণের ওপর।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ বছর রেকর্ড পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হবে। কারণ ব্যাংকে আমানত রাখলে তুলনামূলক আগের চেয়ে মুনাফা কম পাওয়া যায়। অন্যদিকে ব্যাংকে আমানতের সুদ হারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি সুদ পাওয়া যায় সঞ্চয়পত্রে।
তাই যারা এ ধরনের আয়ের উপর নির্ভরশীল তারা সবাই আমানত না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। তবে এতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যাবে। সে জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর পরামর্শ দেন তারা।
জানা গেছে, দেশে অধিকাংশ ব্যাংক আমানতের সুদ হার চলতি বছরের জুলাই শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে সুদ দিয়েছে গড়ে ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলো সুদ দিয়েছে গড়ে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত ও সুদ হারের পার্থক্য (স্প্রেড) কমলেও গত মাসের চেয়ে বিশেষায়িত ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর স্প্রেডের হার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী আমানত-ঋণের সুদহার নীতি ভঙ্গ করছে ৩৪টি ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ শতাংশের নিচে থাকতে হবে সকল ব্যাংকের স্প্রেড হার। তা সত্ত্বেও ঋণের বিপরীতে বেশি সুদ গ্রহণ করে আমানতের বিপরীতে কম হারে সুদ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
উল্লেখ, বিভিন্ন প্রকার ঋণের সুদহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গত ৩০ মে আমানত-ঋণের সুদহার ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে সুদ নিচ্ছে ৭ দশমিক ০৬ শতাংশ। এবং আমানতের বিপরীতে সুদ দিচ্ছে গড়ে ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। যাতে গড় স্প্রেডের হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক এই নীতিমালা ভঙ্গ করেছে আগস্ট মাসে।
বিশেষায়িত ব্যাংকের আমানত-ঋণের সুদহার ৩ দশমিক ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশে। ঋণের বিপরীতে গড়ে ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং আমানতের বিপরীতে ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ সুদ দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী নয়টি বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ৭টি ব্যাংকের আমানত ঋণের সুদ হার রয়েছে ৪ শতাংশের উপরে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর গড় স্পেডের হার ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। স্প্রেড অতিক্রমকারী বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিযা, সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্সিয়াল ব্যাংক অব সিলন লিমিটেড, উরি ব্যাংক, হংকং এন্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড এবং ব্যাংক আল-ফালাহ লিমিটেড।
এদিকে বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদ হার রযেছে এখনো ৪ শতাংশের উপরে। গড়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্প্রেডের হার ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ৪ শতাংশের উপরে ঢাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলো হলো এবি ব্যাংক লিমিটেড, দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিযাল ব্যাংক লিমিটেড, পূবালী ব্যাংক লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড, সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, প্রাইম ব্যাংক লিমিডেট, ব্যাংক এশিয়া লিমিটেড,  ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক লিমিটেড, ব্য্রাক ব্যাংক লিমিটেড, এন আর বি কমার্সিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, সাউথ এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, মেঘনা ব্যাংক লিমিটেড, এন আর বি ব্যাংক লিমিটেড, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক লিমিটেড, মধুমতি ব্যাংক লিমিটেড এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড।
আগস্ট মাসের হালনাগাদ অনুযায়ী বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে নিচ্ছে গড়ে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং আমানতের বিপরীতে দিচ্ছে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমানতের চেয়ে অধিক হারে সঞ্চয়পত্রে মুনাফা যাওয়া। এছাড়া পেনশনভোগী ও স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য সঞ্চয়পত্র কেনার নিয়ম থাকলেও এখন তা কিনছেন বিত্তশালীরা। সেজন্য সঞ্চয়পত্রের বিক্রি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এমনকি এ বছর রেকর্ড পরিমাণে বিক্রি হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এতে সরকারের ব্যয় বাড়বে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর সালেহউদ্দিন বলেন, জুলাই মাসে সাধারণত বিক্রি বেশি হয়। তবে এবার একটু বেশি বিক্রি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ হলো, আমানতের সুদ হার কমে যাওয়া সবাই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন।
পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমানতের সুদ হার কমে যাওয়ায় মানুষ আমানত না রেখে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোতে আমানত কমছে। সেজন্য ঋণ বিতরণও কমেছে।
বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেল অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেহেতু আমানতে সুদ হার কমেছে, এখন সঞ্চয়পত্রেও সুদ হার কমাতে হবে। এতে মানুষ আমানতমুখী হবে।
তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের ‘নগদ ও ঋণ’ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে সঞ্চয়পত্রের ওপর আয়কর রেয়াত সুবিধা প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে একজন ব্যক্তি আয়ের ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারেন সঞ্চয়পত্রে। মোট বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে একজন বিনিয়োগকারী মোট ৫ হাজার টাকা মুনাফা পেলে সেখান থেকে ১৫ শতাংশ আয়কর কেটে রাখা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে সুদ দিয়েছে গড়ে ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকগুলো সুদ দিয়েছে গড়ে ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কিন্তু ৫ বছর ও ৩ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রগুলো থেকে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে সর্বোচ্ছ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত। সেজন্য অনেকে ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে মোট জমা হওয়া ৮ হাজার ২২৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা থেকে মূল ও মুনাফা পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১৯৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা (এর মধ্যে মুনাফা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৩২ লাখ টাকা)।
ফলে নিট ঋণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই মাসে আসা নিট ঋণের চেয়ে সামান্য কিছুটা কম। গত বছরের জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ ছিল ৫ হাজার ৫৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১২ মাসে মোট ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে মূল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। আর শুধু মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।
এ হিসাবে অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২ কোটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ