ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 September 2018, ১২ আশ্বিন ১৪২৫, ১৬ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

লঘু অপরাধের বন্দীমুক্তির নামে খালি করা হচ্ছে কারাগার !

তোফাজ্জল হোসেন কামাল :  দেশের ছোট-বড় ৬৮ কারাগারই বন্দীতে ঠাসা। ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণ বন্দী এখন দেশের কারাগারগুলোতে। আইনশৃংখলাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার নিয়মিতসহ বিশেষ বিশেষ অভিযানে যে ধরপাকড় চলছে তাতে করেই কারাগারগুলো বন্দীতে ঠাসা হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আগামী দিনের বন্দীদের জন্য কোন ঠাই থাকবে না কারাগারগুলোতে।

এদিকে সামনের রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে দেশের অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠলে রাজনৈতিক যে ধরপাকড় শুরু হবে তাতে সেসব লোকজন কোথায় থাকবে-সেটাও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কারাকর্তৃপক্ষ এখন কারাগারগুলো ফাঁকা করার উপায় খুঁজছে। এরই প্রেক্ষিতে লঘু অপরাধে দণ্ডিত বন্দীদের মুক্তির কর্মসূচি নিয়েছে কারাকর্তৃপক্ষ। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।

জানা গেছে, লঘু অপরাধে দণ্ডিত প্রায় ৬ হাজার কারাবন্দীকে মুক্তি দিচ্ছে কারাকর্তৃপক্ষ। কারাসূত্রে জানা গেছে, মুক্তি দেয়া হবে, এমন বন্দীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তালিকায় আছেন ৮ জেলার ৫ হাজার ৭৭৫ জন কারাবন্দী। তবে মানবধিকার কর্মীরা বলছেন, সাধারণ চোখে বিষয়টা ভাল মনে হলেও, এর পিছনে থাকতে পারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

কারাসূত্র বলছে, লঘু অপরাধে কারাবন্দীদের মুক্তির অংশ হিসেবেই (১৬ সেপ্টেম্বর)  সিলেট কারাগার থেকে ১৪৮  জনকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। বাকি কারাগারগুলোর মধ্যে, এখন পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে ১ হাজার ২৪৩ জনকে, রাজশাহী থেকে ১ হাজার ৩২৩ জনকে, খুলনা বিভাগে ৬০৪ জনকে  এবং  রংপুরে ৩৭৫ জনকে মুক্তি দেয়া হবে। বাকিগুলোর কাজ চলছে।

চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া অন্য বন্দীদের কবে নাগাদ মুক্তি দেয়া হবে জানতে চাইলে, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল  সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন একাধিক গণমাধ্যমকে বলেন, তালিকা প্রস্তুত করার কাজ শেষ হয়েছে। তবে তালিকাটা আবারও যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। আমরা দেখছি, এদের মধ্যে কোন বড় ধরনের আসামী আছে কিনা। সব কিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরে, পর্যায়ক্রমে তালিকার সবাইকে ছেড়ে দেয়া হবে।

কারাগারের এই মহাপরিদর্শক বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং কারা আইন মেনেই তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া যারা লঘু অপরাধে কারাগারে আছে, এমন বন্দীর কেউ যদি অপরাধ স্বীকার করে নেন। সেক্ষেত্রে আমরা ন্যূনতম সাজা দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি। 

অন্যদিকে নির্বাচনের আগে হঠাৎ এমন কারাগার ফাঁকা করে দেয়ার বিষয়টি সন্দেহের চোখে দেখছেন মানবধিকার কর্মী নূর খান লিটন। তিনি বলেন, আগামী ৩ মাস পর যে জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে।  সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারাগার ফাঁকা করা হচ্ছে, এমন আশঙ্কা করছে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ। তাই আমার কাছে এই কারাবন্দীদের মুক্তি পাবার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।

কারা মহাপরিদর্শক বলছেন, এটা মানবধিকার কর্মীদের ভুল ধারণা। আমরা শুধু লঘু অপরাধে অপরাধীদের বিবেচনায় এনেছি। যারা বড় অপরাধ করেছেন বা দাগি আসামী তাদের কিন্তু এই তালিকায় রাখা হয়নি।

অন্যদিকে জানা যায়, দেশের কারাগার গুলোতে বন্দী ধারণক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিন্তু অবস্থান করছে প্রায় ১ লাখের মত বন্দী। কারা সদরদফতরের তথ্য বলছে, মোট বন্দীর মধ্যে ৬৫ ভাগই চলমান মাদক বিরোধী অভিযানে, দায়ের করা মামলার আসামী।

মানবাধিকার কর্মীসহ অনেকের আশঙ্কা, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। তখন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেফতার করা হতে পারে। এ কারণে কারাগার খালি করা হচ্ছে।

এদিকে বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, সারা দেশে কারাগারগুলোর বন্দী ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার। কিন্তু এ মুহূর্তে দেশের ৬৮টি কারাগারে এক লাখের বেশি বন্দী অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৭৭৫ জন কারাবন্দীকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে এরই মধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এক হাজার ২৪৫, রাজশাহী থেকে এক হাজার ৩২৩, খুলনা থেকে ৬০৪, রংপুর থেকে ৩৭৫ জন এবং কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৬০ জনের তালিকা কারা সদর দফতরে এসেছে।এসব কারাগারসহ অন্যান্য কারাগার থেকে আসা তালিকা আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালতের মাধ্যমেই তাদের মুক্তি দেয়া হবে।  সিলেট কারা সূত্র জানায়, আদালতের নির্দেশে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৪৮ জন কারাবন্দী মুক্তি পান। এদের মধ্যে ৩৬ জনকে খালাস দেয়া হয়। বাকিদের জামিনে মুক্তি দেয়া হয়।

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার আবু সায়েম বলেন, লঘু বা বিনা অপরাধে অনেকে কারা ভোগ করছিলেন। অনেকের মামলা চালানোর সামর্থ্য নেই। সাজা হলে তাদের বেশিদিন কারা ভোগ করতে হতো না। কিন্তু মামলা চালাতে না পারার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা কারান্তরীণ ছিলেন। আইনি প্রক্রিয়ায় এদের ছেড়ে দিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়।নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বন্দীদের বিষয়ে আদালতে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে আদালত কিছু আসামী খালাস দিয়েছেন। আর কিছু আসামীকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দিয়েছেন।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, বয়স্ক, রোগী এবং বিনা অপরাধে বন্দীদের ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি একটি মহতী উদ্যোগ। কিন্তু প্রতিনিয়ত যেভাবে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে, সেটি দেখে এই মহতী উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক ধরপাকড় হবে।

যাদের ধরা হবে তাদের কারাগারে রাখতে হবে। তাই বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কারান্তরীণ করতেই কারাগার খালি করা হচ্ছে বলে অনেকে ধারণা করছেন। নূর খান লিটন আরও বলেন, আমাদের দেশে দুর্নীতির কারণে অনেক ভালো উদ্যোগ নষ্ট হয়ে যায়। ‘লঘু অপরাধে’ যেসব বন্দীকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে তাদেরকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাড়তে হবে। না হলে দুর্নীতির মাধ্যমে অনেক দাগি আসামীও বেরিয়ে যেতে পারে। এমন কোনো আসামী ছাড়া যাবে না, যারা মুক্তি পাওয়ার পর আবার অপরাধ কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে পারে। রাজনৈতিক বিবেচনায় যেন কোনো আসামী ছাড়া না পায়, সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী বলেন, বিচারাধীন মামলায় কারা কর্তৃপক্ষ কাউকে ছেড়ে দিতে পারে না। কোনো সাজাপ্রাপ্ত বন্দীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এর বাইরে অবশ্যই আদালতের নির্দেশ লাগবে। এ কারণে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বন্দীদের তালিকা আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, কারা কর্তৃপক্ষ সে অনুযায়ী কাজ করবে।

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ বলেন, ‘লঘু অপরাধে’ যেসব বন্দী কারাবাস করছেন, তাদের একটি তালিকা কারা সদর দফতর চেয়েছিল। ৫-৬ দিন আগে আগে ৫০-৬০ জনের একটি তালিকা দিয়েছি। এখনও সদর দফতর থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন মঙ্গলবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, যাদের তালিকা করা হয়েছে, তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে ছেড়ে দেয়া হবে।তবে তালিকায় কোনো দাগি আসামী আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইজি (প্রিজন্স) বলেন, যারা লঘু অপরাধে কারাগারে বন্দী আছে, তাদের মধ্যে যদি কেউ অপরাধ শিকার করে নেয়, তাহলে ন্যূনতম সাজা দিয়ে বা হাজতবাসকালীন সময়কে সাজা হিসেবে গণনা করে ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।এটা করতে পারলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বন্দীকে ছাড়তে পারব। আমরা কোনো দাগি অপরাধীকে বিবেচনায় আনছি না। ছিনতাই, জুয়াখেলা বা এ ধরনের ছোটখাটো অপরাধীদের তালিকা করেছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ