ঢাকা, শুক্রবার 28 September 2018, ১৩ আশ্বিন ১৪২৫, ১৭ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মহামূল্যবান ভেষজ জাফরান চাষ করে আপনিও হতে পারেন কোটিপতি 

 

মুহাম্মদ নূরে আলম: জাফরানের আরেকটি নাম কুঙ্কুম বা কেশর, ইংরেজীতে বলে স্যাফরন saffron। এর আরো একটি নাম কুমকুম। অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় জাফরানকে বাণিজ্যিক অঙ্গনে বলা হয় লাল সোনা ( রেড   গোল্ড)। বাংলাদেশে আমদানিকৃত জাফরান বাইতুল মোকাররম মার্কেট, গুলিস্তানের খদ্দর মার্কেট, স্বপ্ন সুপার স্টোর পাওয়া যায়। অটাম ক্রকাস নামের আইরিশ  গোত্রের একটি ফুলের গর্ভদন্ড থেকে উৎপাদন করা হয় জাফরান । ১পাউন্ড বা ৪৫০ গ্রাম শুকনো জাফরানের জন্য ৫০ থেকে ১লাখ ফুলের দরকার হয়, এক কিলোর জন্য ১০ লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ফুল, ৪০ ঘন্টা সময় লাগে ১ লাখ ৫০ হাজার ফুল তুলতে । জাফরান' প্রতি কেজি’র মূল্য প্রায় ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। স্পেনের ‘লা মাঞ্চা’ অঞ্চলের জাফরানের সুবাস সবচেয়ে ভাল। এদের জাফরান দুইটি ক্যাটাগরীতে পাওয়া যায় ‘মাঞ্চা’ আর ‘ক্যুপে’ । অতি সহজেই আমাদের দেশে এই গাছটির চাষাবাদ সম্ভব হলেও এর কোন পরিকল্পনা বা বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই। অতি মূল্যবান এই গাছটি আমরা বাড়ির আঙিনায়, ক্ষেত্রের আইলে এবং অল্প জমিতে জন্মিয়ে নিজের জাফরান বা জরদার রঙের প্রয়োজন মেটাতে পারি খুব সহজেই । ২০০০ সালে বাংলাদেশের ৯ টি বিএডিসি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে জাফরানের চাষ শুরু হয়। প্রায় এক যুগ আগে দেশের ৯টি বিএডিসি উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে জাফরানের চাষ শুরু হয় । এগুলো হচ্ছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা,গাজীপুরের কাশিমপুর,পাবনা,রংপুর,বান্দরবান, জামালপুর,লামা এবং খুলনার দৌলতপুর বিএডিসি সার্ভিস সেন্টার । প্রতিটি বাগানে ১৫ থেকে ২০টি করে গাছ লাগানো হয়। তৎপরবর্তীতে প্রতিটি গাছের পুষ্পমন্জুরীতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ টি করে ফুল ফোটে । বীজ তৈরী হতে সময় নেয় ৭০ থেকে ৮০ দিন। মটরশুটির ন্যায় ছোট গোলাকার লাল রংঙের গাছ প্রতি ২০ থেকে ৩০ টি করে বীজ হয় । প্রতিটি ফুটন্ত ফুলের পুংকেশর এবং স্ত্রী কেশর কাঁচা অবস্থায় কেটে আলাদা করে শুকিয়ে নিয়ে সংরক্ষণ করা হয় । ৬ থেকে ৭ ঘন্টা ভিজিয়ে রং সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতার কারণে ময়মনসিংহে এক যুগেও বিস্তার ঘটেনি বিশ্বের সবচাইতে দামি মসলার ফসল জাফরানের ।

এ ফসলের আদিস্থান গ্রীস। এই উদ্ভিদ বেশি জন্মে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় স্পেনে বাণিজ্যিকভাবে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি জাফরান উৎপাদন হয় স্পেনে। দেশটি বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ জাফরান রপ্তানি করে থাকে। এ ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, ইরান ও চীনে জাফরান চাষ হয়। জাফরানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ধীরে ধীরে কান্দাহার, খোরাসান, কাশ্মীরের বনেদী মহলে ব্যবহারের প্রয়োজনে ভারত উপমহাদেশে এর বিস্তার ঘটে। বিশ্বের সবচাইতে দামী মসলা বাংলাদেশে ১৮ বছর ধরে চাষ হচ্ছে পরীক্ষামূলকভাবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতার কারনে ময়মনসিংহসহ দেশের ৯টি বিএডিসি উদ্যানে পরীক্ষামূলক চাষ হলেও আজো সম্প্রসারিত হয়নি বলে দাবী করেছেন অনেকেই। 

কৃষি সম্প্রসাররণ অধিদপ্তর সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ এম এনামুল হক বলেন, জাফরান চাষের ধারাবাহিকতা থাকলে দেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হতো। জাফরানী রঙ অনুষ্ঠানাদিতে বনেদী পোলাও,বিরিয়ানি,জর্দা, কালিয়াতে ব্যবহার করা হয়। আনেক পান বিলাসী এর পাপড়ি পানের সাথে চর্বণ করেন। জাফরানী রঙ বিভিন্ন হারবাল ওষুধ প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হয় । এর রঙ নান্দনিক সাজসজ্জায় তথা বনেদী পার্লারগুলোতে মেহেদিও সাথে সংমিশ্রণে মোহনীয় উজ্জ্বল রং এর উৎকর্ষতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাফরানী সরবত যে কোন অনুষ্ঠানে পরিবেশন যোগ্য । বাংলাদেশের মাটি জাফরান চাষের বিশেষ উপযোগী। তাই নতুন করে হলেও এর দিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আমাদের দেশে জাফরান মূলতঃ ব্যবহার হয় জরদা নামের মিষ্টান্ন ও পায়েস তৈরিতে। বিরিয়ানির সুন্দর রঙ আনার জন্যও জাফরান ব্যবহার করা হয়। জাফরান যেমন অর্থকরী একটি মসলা তেমনি এটি স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক উপকারী। এটি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ও অন্য অনেক শারীরিক সমস্যা নির্মূলে ঔষধি হিসেবে কাজ করে থাকে। একসময় দেহসৌষ্ঠব বাড়ানোর জন্য গায়ে মাখা হতো জাফরান। ত্বকের লাবন্য বাড়াতে জাফরানের জুড়ি নেই। এটি ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং অবসাদের চিহ্ন দূর করে ত্বককে সতেজ ও সজীব করে তোলে। এর ভেষজ গুণ এতই সমৃদ্ধ যে, এটি মানবদেহে অন্তত ১৫টি সমস্যা দূর করতে সক্ষম। জাফরানে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদপিণ্ডের সমস্যা দূর হয়। হজমজনিত সমস্যা নিরাময়ে জাফরান প্রয়োগের নজির আছে। পরিমাণমত জাফরান নিয়মিত খেলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ দূর হয়ে যায়। অনিদ্রা দূর করে জাফরান। যে কোন ধরণের ব্যথা নিরাময়ে জাফরান অত্যন্ত কার্যকরী। স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি বেশ সহায়ক। প্রসাধন সামগ্রীতে জাফরানের বহুল ব্যবহার রয়েছে।

আসল জাফরান চেনা জরুরি: জাফরান কেনার সময় ক্রেতাদের অনেক ক্ষেত্রে ঠকিয়ে দেন বিক্রেতারা। কারণ, বাজারে নকল জাফরান বিক্রি হয়। কুসুম নামের ফুলের পাপড়ি দিয়ে নকল জাফরান তৈরি করা হয়। কুসুম ফুল থেকে তৈরি গুড়ার রঙ লাল টকটকে হওয়ার কারণে নকল আর আসল জাফরানের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। জাফরান কেনার সময় ক্রেতাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। 

বংশ বিস্তার: গাছের মোথা বা বালব (অনেকটা পেঁয়াজের মত) সংগ্রহ করে তা বংশ বিস্তারের কাজে ব্যবহার করা হয়। এক বছর বয়স্ক গাছ থেকে রোপন উপযোগী মাত্র দু’টা মোথা (Bulb) পাওয়া যায়। তবে ৩-৪ বছর পর একেক গাছ থেকে ৫-৭টা মোথা পাওয়া যেতে পারে। নূতন জমিতে রোপন করতে হলে ৩-৪ বছর বয়স্ক গাছ থেকে মোথা সংগ্রহ করে তা জমিতে রোপন করতে হবে। একই জমিতে ৩-৪ বছরের বেশি ফসল রাখা ঠিক নয়। মোথা বা বালব উঠিয়ে নূতন ভাবে চাষ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

জমি নির্বাচন: প্রায় সব ধরনের জমিতে জাফরান ফলানো যায়। তবে বেলে- দোঁআশ মাটি এ ফসল চাষে বেশি উপযোগী। পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত উঁচু বা মাঝারী উঁচু জমি এ ফসল চাষের জন্য নির্বাচনে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত রোদ ও আলো-বাতাস প্রাপ্তি সুবিধা আছে এমন স্থানে এ ফসল আবাদ ব্যবস্থা নিতে হবে।

চাষ পদ্ধতি:তৈরী বীজ তলার জন্য প্রায় ১৫০টা জাফরানের মোথার প্রয়োজন হয়। বর্ষা শেষ হওয়ার পূর্বক্ষণে জুলাই- আগষ্ট মাসে এ ফসলের মোথা বা বালব (Bulb) রোপন করা হয়। শুরুতে বেশি গভীর ভাবে জমি চাষ করে তৈরী কালে প্রতি শতক জমিতে পঁচা গোবর/আবর্জনা পঁচা সার ৩০০ কেজি, টিএসপি ৩ কেজি এবং এমওপি ৪ কেজি প্রয়োগ করে ভালোভাবে মাটির সাথে সমস্ত সার মিশিয়ে হালকা সেচ দিয়ে রেখে দিয়ে দু’সপ্তাহ পর জাফরান বালব রোপন উপযোগী হবে। বসতবাড়ি এলাকায় এ ফসল চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

পরিচর্যা:এ ফসল আবাদ করতে হলে সব সময় জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। মাঝে মাঝে নিড়ানী দিয়ে হালকা ভাবে মাটি আলগা করে দেয়া হলে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুবিধা হবে এবং গাছ ভালোভাবে বাড়বে। শুকনো মৌসুমে হালকা সেচ দেয়া যাবে। তবে অন্য ফসলের তুলনায় সেচের প্রয়োজনীয়তা অনেক কম। বর্ষায় পানি যেন কোন মতে জমিতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পানি জমে থাকলে রোপিত বালব পঁচে যাবে।

আপদ ও রোগ বালাই:এক প্রকারের ইঁদুর, চিকা ও খরগোস জাফরানের পাতা, ফুল এমনকি গাছের মোথা খেতে পছন্দ করে, মোথা যত খায় নষ্ট করে তার দ্বিগুণ। এ জন্য এ ধরনের উপদ্রব দেখা গেলে প্রয়োজনীয় ফাঁদ ব্যবহার করে অথবা মারার জন্য ঔষুধ ব্যবহার করে তা দমন ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিকড় পচা রোগ:এটা জাফরানের খুব ক্ষতিকর রোগ। এ রোগের আক্রমণে শিকড় পঁচে গাছ মারা যায়। এ রোগ যথেষ্ট ছোঁয়াচে, এ জন্য বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করা দরকার এবং আক্রান্ত জমিতে দু-এক বছর জাফরান চাষ করা যাবে না। 

জাফরান সংগ্রহ: রোপনের প্রথম বছর সাধারণত ফুল আসে না। তবে জাফরানের রোপিত বালব আকারে বেশ বড় হলে সে বছরই জাফরান গাছ থেকে মাত্র একটা ফুল ফুটতে পারে। পরের বছর প্রতি গাছে পর্যায়ক্রমে ২-৩ টা ফুল আসবে। দু’বছরের গাছে ৪-৫টা এবং তিন বছরের গাছে ৭-৮টা ফুল দিবে। জাফরানের স্ত্রী অঙ্গ ৩টা থাকে এবং পুরুষ অঙ্গ ও ৩’টা থাকে। গাছে অক্টোবর মাস থেকে ফুল দেয়া আরম্ভ করে এবং নভেম্বর মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

জাফরানের অনেক গুণ : আকারে ছোট হলেও সবচেয়ে মূল্যবান এ সুগন্ধী বিশ্বব্যাপী রান্নার উপকরণ হিসেবে খ্যাত। এর বাইরে জাফরানের কিছু ঔষধী গুণও রয়েছে। শরীরের মেদ কমানো, কামোদ্দীপক, পেট ফাঁপা নিরাময়, নারীদের মাসিক নিয়মিত করার কাজে ব্যবহার হয় জাফরান। এ ছাড়া জাফরানের আরো কয়েকটি গুণ তুলে ধরা হল। ক্যান্সার থেকে রক্ষা, জ্ঞান আহরণ ও স্মৃতিশক্তির স্থায়ীত্ব বাড়ানো, বিলম্বিত বয়ঃসন্ধি, যৌনশক্তি বাড়ানো,  টাক মাথায় চুল গজানো, ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা, খাবার মুখরোচক করা : খাবারকে সুগন্ধী ও মুখরোচক করতে জাফরানের জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া খাবার আকর্ষণীয় ও রঙিন করার কাজটিও করে জাফরান। জাফরানের ঝলমলে রং মানুষকে খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করে। বিভিন্ন ধরনের কেক ও বিস্কুট তৈরি, মাছ মেরিনেট করতে, পোলাও ও বিরিয়ানি রান্না করতে জাফরান ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া কফি, বিভিন্ন ধরনের ফলের শরবত, দই, লাচ্ছি তৈরি করতেও এটি কাজে লাগে। সতর্কতা : অনেক গুণসম্পন্ন এ জাফরান অতিমাত্রায় খাওয়া যাবে না। নারীদের ক্ষেত্রে অন্তঃস্বত্বা অবস্থায় এটি কোনো খাবারে ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া এক বা দুই চামচের বেশি খেলে যেকোনো মানুষ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ