ঢাকা, রোববার 30 September 2018, ১৫ আশ্বিন ১৪২৫, ১৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা ॥ থামছে না দরপতন মূলধন হারাচ্ছে শেয়ারবাজার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : শেয়ারবাজার টানছে না বিনিয়োগকারীদের। ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না দেশের শেয়ারবাজার। কোনোভাবেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো যাচ্ছে না শেয়ারবাজারের প্রতি। শেয়ারবাজারের মহাধসের পর বাজার ভালো করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু তাদের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ধসের পর পুনর্গঠনের অংশ হিসাবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগই যেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষত সারাতে পারছে না। বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার বিমুখ থাকায় লেনদেন ও সূচক সেই তিমিরেই থেকে যাচ্ছে। এখনো উত্থান-পতনের মধ্যদিয়েই চলছে শেয়ারবাজারের লেনদেন। একদিন ঊর্ধ্বমুখী তো পরের কার্যদিবসগুলোতে টানা পতনের ঘটনা ঘটছে। ফলে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারমূল্য নিম্নগামী হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, শেয়ার কারসাজির সাথে জড়িতরা বাজারে সক্রিয় থাকায় তারা বাজারের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা শেয়ারবাজারের দরপতনের অন্যতম কারণ। আর দরপতন অব্যাহত থাকায় মূলধন হারাচ্ছে শেয়ারবাজার। গত এক মাসের ব্যবধানে শেয়ারবাজারে মূলধন কমেছে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে মহাধস নামে। যে ধস আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে ১৯৯৬ সালের ধসের ঘটনাকেও হার মানায়। বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে শেয়ারবাজারের মহা কেলেঙ্কারির ঘটনায় নি:স্ব হয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী কুচক্রিমহল ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। পুঁজি হারানোর শোক সইতে না পেরে সেই সময়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী। এখনো অনেক বিনিয়োগকারী মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পূরণে সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শেয়ারবাজার কারসাজির সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি জড়িতদের শাস্তির সুপারিশ করে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করে। কমিটি পুরো ঘটনা জোগসাজসের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে। দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুপারিশ করে। কিন্তু কারসাজির সাথে যারা জড়িতরা তারা চিহ্নিত হলেও তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি সরকার। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। ফলে দেশের শেয়ারবাজার আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। 
বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পতনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের শেয়ারবাজার। প্রায় প্রতিদিনই দরপতন ঘটছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে। বিদায়ী সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে দেশের দুই শেয়ারবাজারের মূলধন কমেছে প্রায় সোয়া ৯ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার সাড়ে ৮০০ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে উভয় শেয়ারবাজার।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী সপ্তাহে পাঁচ দিনে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৮৯৪ কোটি ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ৩৫৩ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই দুই শেয়ারবাজার মিলে পাঁচ কার্যদিবসে মোট বাজার মূলধন কমেছে ৯ হাজার ২৪৭ কোটি ৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে ডিএসই-সিএসই মিলে গত এক মাসে বাজার মূলধনের পরিমাণ কমেছে ১৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৮৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
ডিএসইর তথ্য বলছে, সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯২৭ কোটি ৪০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। যা এর আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩ হাজার ৮৯৪ কোটি ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা বা ১ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৮২১ কোটি ৪২ লাখ ৬১ হাজার টাকা। সদ্য সমাপ্ত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের প্রতিদিন গড়ে ৭৭৮ কোটি ৮০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা মূলধন হারিয়েছে ডিএসই। এদিকে গত এক মাসের হিসাবে (২৭ আগস্ট-২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৮ হাজার ৪৭৭ কোটি ৫০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। গত ২৭ আগস্ট ডিএসইতে বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৪০৪ কোটি ৯০ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
সিএসইর তথ্যে দেখা যায়, সপ্তাহ শেষে সিএসইর বাজার মূলধন ৩ লাখ ১৬ হাজার ১৫ কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে এই বাজারের মূলধনের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইর বাজার মূলধন ৫ হাজার ৩৫৩ কোটি ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা বা ১.৬৭ শতাংশ কমেছে। আলোচ্য সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে গড়ে প্রতিদিন বাজার মূলধন কমেছে ১ হাজার ৭০ কোটি ৬১ লাখ টাকার ওপরে। আর গত এক মাসের হিসাবে এই বাজারের মূলধন কমেছে ৯ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। গত ২৭ আগস্টের লেনদেনে শেষে সিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৭৯৫ কোটি ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা।
এদিকে চলতি মাসের ৪ তারিখে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাথে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা কনসোর্টিয়ামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়াম (জোট) ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ারের বিপরীতে ৯৬২ কোটি টাকা জমা দেয়। এর মধ্য থেকে সরকারের কোষাগারে স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ ১৫ কোটি টাকা জমা দিয়েছে ডিএসই। বাকি ৯৪৭ কোটি টাকা ডিএসইর সদস্য ব্রোকারদের শর্তহীনভাবে ভাগ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সবার প্রত্যাশা ছিল চীনের অংশী দারিত্বে শেয়ারবাজার ভালোর দিকে যাবে। কিন্তু সে আশায়ও গুড়ে বালি।  
এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেরর (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়াম (জোট) যে অর্থ দিয়েছে তা পুঁজিবাজারে বিয়োগের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেই কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা হবে। অর্থমন্ত্রীর এ আশ্বাসেও বাজারে গতি ফিরে আসেনি। 
বিশেষজ্ঞরা জানান, শেয়ারবাজার কারসাজির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সাথে যারা জড়িত তারা চিহ্নিত হলেও তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে পারেনি সরকার। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। এতে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার বিমুখ হয়ে পড়ে। ফলে দেশের শেয়ারবাজার আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আর বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে শেয়ারবাজারের দরপতন থামানো যাচ্ছে না।
কয়েকজন বিনিয়োগকারী জানান, শেয়ার কারসাজির সাথে জড়িতরা এখনো বাজারে সক্রিয়। আবারও যে কারসাজির ঘটনা ঘটবে না তার কোনো গ্যারান্টি আমরা পাচ্ছি না। একবার নি:স্ব হয়েছি। যারা আমাদের নি:স্ব করেছে, কারসাজির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তাদের বিচার হয়নি। সেই সব হোতাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে শেয়ারবাজার। এজন্য আমরা বাজারের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিনা। বারবার প্রতারিত হতে চাই না। বাজারে সক্রিয় হতে বিভিন্ন লোভ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা আর ফাঁদে পা দিতে চাচ্ছি না। যখন মনে করবো বাজার আমাদের জন্য নিরাপদ তখন ভালোবাসা থেকেই শেয়ার ব্যবসা করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ