ঢাকা, বুধবার 3 October 2018, ১৮ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিজেপি নেতার হুমকি

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও রাজ্যসভার প্রবীণ সদস্য সুব্রামনিয়াম স্বামী বাংলাদেশ দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর প্রচণ্ড দমন-নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি একদিকে অসংখ্য মন্দির দখল করা হচ্ছে এবং অন্যদিকে জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তর করিয়ে মুসলিম বানানো হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশিদের ‘পাগলামি’ বলে উল্লেখ করে মিস্টার সুব্রামনিয়াম স্বামী বলেছেন, অবিলম্বে হিন্দু বিরোধী এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ না করা হলে বাংলাদেশ দখল করতে হবে। সরকারকে তিনি সে পরামর্শই দেবেন। বিজেপির এই প্রবীণ নেতা প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু গায়ের জোরে ধর্মান্তরকরণ এবং মন্দির ভাঙার ও দখলের তান্ডব বন্ধ করতে হবে। না হলে বাংলাদেশকেই দখল করে নেবে ভারত।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে সেদেশের সেনাবাহিনীর ‘চাপরাশি’ বলে সম্বোধন করে দেশটিকে চার খণ্ড করার হুমকি উচ্চারণ এবং বিভিন্ন সময়ে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া মন্দির উদ্ধারের অঙ্গীকার ঘোষণার পাশাপাশি মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক আরো অনেক কথাও বলেছেন বিজেপির নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয়মন্ত্রী সুব্রামনিয়াম স্বামী। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রাধান্যে এসেছে তার বাংলাদেশ দখলের হুমকি। এর পেছনে রয়েছে বিজেপির অন্য নেতাদের বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য ও কার্যক্রম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংলগ্ন অপর রাজ্য আসামে চলমান নাগরিক তালিকা তৈরির কার্যক্রমকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন সময়ে, এমনকি মাত্র দিন কয়েক আগেও বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ এবং প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবসহ নেতারা ঘোষণা করেছেন, আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে নাকি লাখ লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে বসবাস করছে! এসব বাংলাদেশির ব্যাপারে সরকার তিনটি ‘ডি’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। প্রথম ‘ডি’র মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত অবৈধ বাংলাদেশিদের শনাক্ত করা হবে, যা বর্তমানে আসামে করা হচ্ছে। এরপর দ্বিতীয় ‘ডি’র মাধ্যমে অবৈধ বাংলাদেশিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার বা ডিলিট করার কার্যক্রম শুরু হবে, যাতে তারা আর কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে না পারে। সবশেষে তৃতীয় ‘ডি’ হিসেবে আসবে ডিপোর্ট করার বা আসামসহ ভারত থেকে বের করে দেয়ার পালা। অবৈধভাবে বসবাসকারীদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হবে বলেও ঘোষণা করেছেন বিজেপির ওই নেতারা।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুখের কথায় বিদেশিদের কথা বললেও বিজেপির নেতারা অবৈধভাবে বসবাসরত সকলকেই শুধু বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার ঘোষণা দিয়েছন। যার অর্থ, তারা মনে করেন, ভারতে কেবল বাংলাদেশিরাই অবৈধভাবে বসবাস করছে। করছেও নাকি বছরের পর বছর ধরে! অন্যদিকে খোদ ভারতেরই বিভিন্ন দল ও সংস্থার জরিপ ও তথ্যনির্ভর পর্যালোচনায় দেখা গেছে এবং প্রমাণিতও হয়েছে, যাদের ‘অবৈধ ও অনুপ্রবেশকারী’ বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা এবং বহিষ্কারের পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে তারা জন্মসূত্রসহ সকল বিচারেই ভারতীয় নাগরিক।
এ ব্যাপারে বিলম্বে হলেও স্পষ্ট করে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান উপলক্ষে নিউইয়র্ক অবস্থানকালে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ভারতে কোনো অবৈধ বাংলাদেশি থাকার খবর ভিত্তিহীন। গত ১ অক্টোবর বিভিন্ন দৈনিকে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা বোধহয় ভারতীয়দের ‘পলিটিক্স’। তারা বলছেন, কিন্তু আমি মনে করি না, কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। নিজের এই ধারণার কারণ জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী এবং মজবুত। এমন অবস্থায় বাংলাদেশিরা কেন ভারতে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করবে? ভারতীয়দের কেউ যদি এটা বলেন তবে সেটা তাদের ব্যাপার। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আমার যখন কথা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, এ ধরনের বাংলাদেশিদের ফেরৎ পাঠানোর মতো কোনো চিন্তা তাদের নেই।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এসব কথার ভিত্তিতে ধরে নেয়া যায়, বিজেপির নেতারা হয়তো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্য থেকেই কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের ব্যাপারে বলে চলেছেন। তাই বলে মিস্টার সুব্রামনিয়াম স্বামীর বাংলাদেশ দখলের ঘোষণাটিকে কিন্তু নিতান্ত ‘পলিটিক্স’ হিসেবে ধরে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এবারই প্রথম নয়, ২০১৪ সালের এপ্রিলেও তিনি খুলনা থেকে সিলেট পর্যন্ত সমান্তরাল রেখা টেনে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূখন্ড ভারতের দখলে নেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। সেবার তিনি বলছিলেন, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বাংলাদেশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম নাকি ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে! একই কারণে বাংলাদেশকে তার এক-তৃতীয়াংশ ভূখন্ড ভারতের কাছে তুলে দিতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বর্তমান রাজ্যসভার প্রবীণ ও প্রভাবশালী সদস্য বলেই মিস্টার সুব্রামনিয়াম স্বামীর বাংলাদেশ দখলের ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একে হাল্কাভাবে নেয়ার পরিণতি দেশের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সরকারের উচিত, কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গের পাশাপাশি এ বিষয়টি নিয়েও ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে অনতিবিলম্বে আলোচনা করা এবং মিস্টার স্বামীর মতো বাংলাদেশ বিরোধীদের সংযত করার উদ্যোগ নেয়া। একথাও বুঝিয়ে দেয়া দরকার যে, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশকে দখল করার কল্পনাবিলাস পরিত্যাগ করার মধ্যেই সকলের জন্য মঙ্গল নিহিত রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ