ঢাকা, বুধবার 3 October 2018, ১৮ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পলিব্যাগে বেগুন চাষ : বিষমুক্ত সবজির সম্ভাবনা

খুলনা : ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা নবদ্বীপ মল্লিক পলিব্যাগে বেগুন চাষ করতে ক্ষেতে পরিচর্যা করছেন

খুলনা অফিস : ‘আমার ছোট চাচার ক্ষেত থেকে ৮ মণ বেগুন তোলা হয়। তার মধ্যে প্রায় ২ মণ পোকা বেগুন আলাদা করা হলো। যা গরুকে খাওয়ানোর জন্য রাখা হয়। আর ভাল বেগুনগুলো বাজারে বিক্রি করা হয়। মূলত এ ভাল বেগুনগুলোতে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়েছে। এ বেগুনগুলো মারাত্মক বিষ বেগুনে পরিণত হয়েছে। ফলে এর ধারে কাছেও কোনো পোকা আসেনি। আপনারা বাজার থেকে বেগুন কিনছেন, নাকি বিষ কিনছেন, একটু ভেবে দেখুন।’ ‘চাষার ছেলে ফরহাদ’ তার ফেসবুকে এমন একটি স্ট্যাটাস দেন।
এমন একটি স্ট্যাটাস দেখে, বিষমুক্ত বেগুন চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে সফলতার মুখ দেখেছেন নবদ্বীপ মল্লিক। তিনি উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পলিব্যাগে বেগুন চাষ করছেন। পেয়ারার মতো বেগুনও পলিব্যাগে চাষ করে উপজেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাকে দেখে এখন উপজেলার অনেকেই এ পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন।
তারাও সফল হয়েছেন। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ শতক জমিতে পলিব্যাগে বেগুন চাষ শুরু করেন। সফলতা পেয়ে তিনি ১ বিঘা (৩৩ শতক) জায়গায় চাষাবাদ শুরু করেছেন। ক্ষেতের ওপর হালকা নেট দিয়েছেন। যাতে কোনো পাখি না বসতে পারে। গাছের বেগুন এক ইঞ্চি পরিমাণ হলে তিনি ৭/৬ ইঞ্চি মাপের পলিব্যাগে দিয়ে মুড়ে দেন। এভাবে প্রতিদিন সকালে তিনি পলিব্যাগ দিয়ে বেগুন মুড়ে দেয়ার কাজ করেন। সপ্তাহান্তে সেই বেগুন বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। এর পরই পলিব্যাগসহ বেগুন তুলে বাজারে বিক্রি করছেন। ক্ষেতে সার হিসেবে তিনি প্রয়োগ করেন কেঁচো কম্পোস্ট/ভার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার। এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো কীটনাশক প্রয়োগ করেন না। তাকে দেখে এখন এলাকার অনেক কৃষক এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
একই এলাকার কৃষক মো. ইমরান হোসেন মোড়ল জানান, আগে আমরা পেয়ারাতে পলিব্যাগ ব্যবহার করতাম। আর বেগুনে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করতাম। এখন তাকে দেখে আমরাও পলিব্যাগে বেগুন চাষাবাদ শুরু করেছি। আমরা কৃষকরা মানুষকে বিষযুক্ত নয়, বিষমুক্ত সবজির নিশ্চয়তা দিতে চাই।
নবদ্বীপ মল্লিক জানান, শতক প্রতি আমার সব খরচ মিলে ৫শ’ টাকা হারে খরচ হয়েছে। এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫-৬ হাজার টাকার বেগুন তুলে বিক্রি করি। ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস দেখে মনে হলো আমরা সাধারণ মানুষকে বেগুন খাওয়াচ্ছি নাকি বিষ খাওয়াচ্ছি। কৃষি অফিসের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে আমার যে জ্ঞান হয়েছে। সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আমি এ পদ্ধতি আবিষ্কার করি। ভাল ফল পাচ্ছি। আমাকে দেখে এলাকার অনেকেই এখন এধরনের চাষাবাদ শুরু করেছে। অনেকে দেখতে আসে। আমার ভাল লাগে যে, বিষমুক্ত বেগুন সবজি মানুষকে খাওয়াতে পারছি।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, বেগুন একটি চর্বিযুক্ত সবজি। ফলে এধরনের সবজিতে পোকা বেশি লাগে।
আমরা জরিপ করে দেখেছি, একটি বেগুনে ১৫০ বার পর্যন্ত কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। এ স্প্রে করতে যেয়ে কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যারা বেগুন খাচ্ছে তারাও স্বাস্থ্য ঝুঁিকতে থাকে। উভয়ই নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পলিব্যাগে বেগুন চাষ করলে তাতে কোনো ধরনের পোকামাকড় ঢুকতে পারে না। এ পদ্ধতিটি নবদ্বীপ মল্লিক নিজে নিজে আবিষ্কার করেছে। আমরা তাকে হাতে কলমে শিখিয়েছি পলিব্যাগে পেয়ারা চাষ। এ প্রশিক্ষণটা সে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করে বিষমুক্ত বেগুন চাষ শুরু করেছে।
এ ব্যাপারে খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল লতিফ জানান, এটি একটি ভাল উদ্যোগ। পলিব্যাগে বেগুন চাষ করলে তার মধ্যে কোনো ক্ষতিকারক পোকা ঢুকতে পারে না। ফলে কীটনাশকও প্রয়োজন হয় না। এভাবে চাষ করলে বিষমুক্ত সবজির নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এটি এই প্রথম। তাকে দেখে অনেকই এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করবে আশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ