ঢাকা, বৃহস্পতিবার 4 October 2018, ১৯ আশ্বিন ১৪২৫, ২৩ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে গরীবের বন্ধু হারিকেন 

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলতো গ্রামের পর গ্রামে। বৃদ্ধরা রাতে বের হলেই হাতে থাকত এই হারিকেন। যাকে তখনকার সময়ে রাত্রিকালীন বন্ধু হিসাবে অখ্যায়িত করেছিল অনেকেই। হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হতো রেলগাড়ি ও বিভিন্ন যানবাহনে। রাতের আঁধারে হারিকেন জ্বালিয়ে পোষ্ট অফিসের ডাক নিয়ে ছুটতেন ডাক হরকরা। কিন্তু সভ্যতার আধুনিকায়ণে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স লাইটে বাজার ভরপুর ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের আলোর একমাত্র উৎস হারিকেন।

জানা গেছে, হারিকেন হচ্ছে জ্বালানি তেলের মাধ্যমে বদ্ধ কাচের পাত্রে আলো জ্বালাবার ব্যবস্থা। এর বাহিরের অংশে অর্ধবৃত্তাকার কাচের অংশ থাকে যাকে গ্রামীন জনপদে চিমনি বলে আর এর ভিতরে থাকে তেল শুষে অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে আলো জ্বালাবার জন্য কাপড়ের সলাকা। আর সম্পূর্ণ হারিকেন বহন করবার জন্য এর বহিরাংশে থাকে একটি লোহার ধরুনি। আলো কমানো বা বাড়ানোর জন্য নিম্ন বহিরাংশে থাকে একটি চাকতি যা কমালে বাড়ালে শলাকা ওঠা নামার সাথে আলো কমে ও বাড়ে। মোঘল আমলে হারিকেনের প্রচলন শুরু হয়। রাতের আঁধারে বিকল্প আলোর উৎস হিসাবে ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও বাজারে আধুনিক ইলেকট্রনিক্স লাইটের সরবরাহ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে কমতে থাকে হারিকেনের ব্যবহার। তবে এখনো গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে রিক্সার নিচে হারিকেন বেধে চলাচল করতে দেখা যায়। একসময় রাস্তায় হারিকেন ছাড়া রিক্সা চালাচালে জরিমানা করত পুলিশ। 

জানা যায়, তখনকার সময়ে হারিকেন মেরামতের জন্য সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে মিস্ত্রী বসতো। এদের স্থানীয় ভাষায় ডাকা হতো মেরামতি বলে। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি বাজারে ছিল হারিকেন মেরামতির অস্থায়ী দোকান। এরা বিভিন্ন হাট বাজারে ঘুরে ঘুরে হারিকেন মেরামতের কাজ করতো। এছাড়া অনেকে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে হারিকেন মেরামত করতো।  শুকলাল হাটের বৃদ্ধ নিখিল জানান, তিন যুগেরও অধিককাল যাবৎ হাট, বাজারে বসে হারিকেন মেরামতির কাজ করেছি। তখনকার সময় গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল হারিকেনের ব্যবহার। এতে কাজও হতো প্রচুর। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক ইলেকট্রনিক্স লাইটে বাজার ভরপুর হওয়ায় হারিকেনের প্রচলন বন্ধ হয়ে গেছে।

সীতাকুণ্ড পৌরসদর বাজারের মেরামতি ফয়েজ বলেন, হারিকেন এক সময়ে গ্রামাঞ্চলের আলোর একমাত্র উৎস হলেও বর্তমানে চায়না লাইট ব্যবহারের কারণে এখন কেউ হারিকেন ব্যবহার করে না। পূর্বের পেশাকে আকড়ে ধরে বাজারে বসলেও পাওয়া যায় না হারিকেন মেরামতের কাজ। 

সীতাকুণ্ড কলেজ রোডস্থ গৃহিণী পারভীন আখতার জানান, এক সময় সন্ধ্যা হওয়ার আগেই কেরোসিন ভরে হারিকেন ও সিমনী মুছে রেডি করার কাজটা প্রতিনয়িত করতে হয়ত। আর রাতে ঘুমানোর আগে ডীম করে রাখাটাও এখন শুধু স্মৃতি।  

 ভোলাগিরির রাসেদা আখতার জানায় রাতে পড়তে বসার আগেই হারিকেন নিয়ে টানা টানি করতে হত। আর রাতে স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার সময় সবাই একটা করে হারিকেন নিয়ে স্যারের বাসায় যেতে হত। রাতে রাস্তা দিয়ে হাটার সময় ঝুনাকি পোকার মত মিট মিট করে জ্বলত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ