ঢাকা, শুক্রবার 5 October 2018, ২০ আশ্বিন ১৪২৫, ২৪ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শেকস্পিয়র : কবি ও নাট্যকার

মাখরাজ খান : শেকস্পিয়রকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। গত চারশ’ বছর ধরে তাকে নিয়ে এত লেখা এত বলা হয়ে গেছে যে, এখন কিছু বলতে গেলে তা চর্বিত চর্বন হয়ে যাবে। তবু কিন্তু নাটকের কথা বলতে গেলে যার নাম প্রথম উচ্চারিত হয়, তিনি শেকস্পিয়র। উইলিয়াম শেকস্পিয়র ১৫৬৪ সালে ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র অর্ধশতাব্দী জীবনকালে তিনি ৩৮টি নাটক, ১৫৪টি সনেটসহ ২টি দীর্ঘ আখ্যায়িকা রচনা করেন। মূলত নাট্যকার হলেও তাঁর পরিচয় বার্ড অব অ্যাডন বা অ্যাডনের চারণ কবি হিসাবে।

নাট্যকারের চেয়ে কবি হিসেবে খ্যাতির কারণ তিনি কাব্যনাট্যকার। অভিনেতা হিসেবেও তিনি তার জীবিতকালে নাম করেছিলেন। শেকস্পিয়রের নাটকগুলো পৃথিবীর প্রধান সব ভাষায়ই অনূদিত হয়েছে। বাংলা ভাষাভাষিদের কাছেও তিনি অপরিচিত নন।

মূলত: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তার অধিকাংশ নাটক রচিত, কিন্তু তাঁর অতুলনীয় শিল্প সৌকর্যও অমর কাব্য ভাষার গুনে প্রতিটি নাটকই স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। শেকস্পিয়র কেন ট্রাজিডি এবং কমিডি নাটকের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে রইলেন এ নিয়েও গবেষণা কম হয়নি। এ ব্যাপারে গবেষকদের অনুসন্ধানে জানা যায় শেকস্পিয়রের জীবনে যে অস্থিরতা হতাশা এবং স্বজন বিয়োগের ঘটনা ঘটেছে এরই প্রতিফলন পড়েছে তার নাটকে। শেকস্পিয়রের দাম্পত্য জীবন শুরু হয় একটি অসম বয়সী মহিলাকে বিবাহের মাধ্যমে, যার গর্ভে বিবাহের আগেই তার সন্তান অঙ্কুরিত হয়েছিলো। শেকস্পিয়রের বয়স যখন ১৮ তখন তিনি ২৬ বছর বয়সী হ্যানি হ্যাথাওয়েকে বিয়ে করেন। বিয়ের ৬ মাস পর তাদের ঘরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

এরপর ১৫৮৫ সালে হ্যানি হ্যাথাওয়ে হ্যামলেট নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এগার বছর বয়সে শেকস্পিয়রের পুত্র সন্তানটি পরলোক গমন করলে তিনি শোকে মুসড়ে পড়েন। ১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ সাল পর্যন্ত ৭টি বছর ছিলো শেকস্পিয়রের হারানোর বছর অথচ এই বছরগুলোতেও তার সৃষ্টি কর্ম থেমে থাকেনি। নাট্যকারের সঙ্গে অভিনেতার খ্যাতিও এই সময় তিনি অর্জন করেন।

শেকস্পিয়র নাট্যকার, অভিনেতা এবং কবি অভিধার সাথে থিয়েটার কোম্পানীর স্বত্বাধিকারীও ছিলেন। ১৬১৩ সালে তিনি নাট্যজগত থেকে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যান আর এরপর তিন বছরের মধ্যেই মুত্যুবরণ করেন।

শেকস্পিয়রকে নিয়ে গত চারশ বছরে প্রচুর লেখালেখি হলেও তার ব্যক্তিগত জীবনের কথা সেখানে খুব বেশি আলোচিত হয়নি। তিনি ধর্মবিশ্বাসে ক্যাথলিক খ্রিস্টান হলেও তার জীবন যাপন এবং পিতা-মাতাও পরিবারের সাথে সম্পর্কের বিষয়গুলো অনুল্লেখ্য থেকেছে প্রায় সব আলোচনায়। এমন কি শেকস্পিয়রের নামে যে সব নাটক প্রকাশিত হয়েছেÑ সেগুলো সব যে তার লেখা নয় কোনো কোনো আলোচক এ প্রসঙ্গটি টেনে আনলেও এর তথ্যগত সমাধান দেননি। তবে শেকস্পিয়রকে নিয়ে যত সমালোচনার ঝড় উঠুক আর তার নাটক নিয়ে যত বির্তকেরই সৃষ্টি হোক না কেন, ভিক্টোরিয়ান যুগে তিনি যেমন পূজনীয় ছিলেনÑ এখনো তেমনি প্রাণবন্ত আছেন। এর কারণ হলো শেকস্পিয়রের সাহিত্য কর্মে অসামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আরোপের সক্ষমতা। তার নাটক এবং কবিতাগুলো যেন নিজের মধ্যে ধারণ করে পরিবেশন করেছেন। তিনি একই সঙ্গে যেমন অভিনেতা, নাট্যকার এবং ব্যবসায়ী ছিলেন তার সাহিত্য কর্মেও এ সকল চরিত্রের সমাবেশ দেখা যায়। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সংমিশ্রণে তিনি নিজেই শুধু কালজয়ী পুরুষ হয়ে ওঠেনিনÑ কালজয়ী সাহিত্য কর্মও সৃষ্টি করে গেছেন। আমরা এখানে শেকস্পিয়রের সমগ্র নাটক নয়, গোটা ক’টি নাটক নিয়ে আলোকপাত করবো। এ নাটকগুলো ১৫৯৫ থেকে তার মৃত্যুর আগের বছরগুলোতে লেখা, উল্লেখ্য শেকস্পিয়র ১৬১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে শেষের দুই বছর তিনি কোন নাটক রচনা করেননি। অভিনয়ও করেননি। ১৬০০ সালে রেজিস্টারিভুক্ত Mydsommer nightes Dreameস নাটকটি রচিত হয়েছিলো মূলত: আমাদের দেশের যাত্রাপালার আদলে নাটকের দ্বিতীয় কোয়াটো সংস্করণ থেকে জানা যায়। নাটকটি লেখা হয়েছিলো বিয়ে বাড়িতে আনন্দ অনুষ্ঠানের জন্য এবং এর প্রথম সংস্করণে নাম ছিলো Mydsommer nightes Dreame।

নাটকটির কাহিনী মনোমুগ্ধকার হলেও এটা শেকস্পিয়রের মৌলিক নাটক নয় কারণ আখ্যানাট তার নিজস্ব নয়, বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে তিনি নিজস্ব আদলে একটি আখ্যান তৈরি করেছেন। মুন্ডের Johan and kent, প্লুটাকের লাইফ of thesias ওডিদের Metamorphoses  এবং গ্রীনের জেমস্ থেকে আখ্যান বিন্যাস এবং নাটকের চরিত্র গঠনের ইশারা পেয়েছিলেন। শেকস্পিয়রের এ নাটকটি প্রথম প্রথম অনেক পন্ডিত এবং রাজমহলের আমত্যগণ নিঃসংকোচে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা মনে করেছিলেন এতে অশ্লীলতা আছে। পরবর্তীতে তাদের এ ধারণা বদলে যায়। এক সময় সমালোচকেরা এর প্রশংসা করেছেন। এদের মধ্যে ত্রোচে এবং কোলরিজের মন্তব্য থেকে এর প্রমাণ মিলে। শেকস্পিয়রের কমিডি মতে ইংল্যান্ডবাসীর এত সময় নেয়ার কারণটি আজও গবেষণার বিষয়। যাই হোক শেকস্পিয়র উইন্টার টেল রচনা করেন ১৬১০-১১ এর মধ্যে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ এ নাটকের কেন্দ্রবিন্দু। সিসিলিয়ার রাজা লিওন্টাস এবং রানী হার্মিয়োনের মধ্যে অবিশ্বাসের অহেতুক চিন্তা থেকে এ নাটকের বিস্তার। রাণী অনৈতিক কোনো কাজ না করেও রাজার চোখে বিশ্বাস ঘাতকিনী এবং কূলটা বলে সাব্যস্ত হন। বোহেমিয়ার রাজাকে তার স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য দায়ী করেন। রানীর কারাবাস হয় এবং কারাগারে রানী একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। মেয়েটির নাম রাখা হয় পার্ডিটা। যাকে জন্মের পরই সমুদ্রতটে ফেলে দেয়া হয় কন্যাটিকে মেষশাবকেরা প্রতিপালন করে এরপর শুরু হয় নাটকের নতুন মোড়Ñ শেষে পার্ডিটার রাজা আর রানীর সাথে মিলন হয়। নাটকটিতে পুনঃ মিলনে রোমান্স, উচ্ছ্বাস এবং আনন্দ থাকলেও এর কাহিনী বিন্যাস এমনই বিষাদময় যে, বিষাদের ছায়ায় আনন্দ হারিয়ে যায়। শেকস্পিয়রের ‘হেনরি দ্য ফোর্থ’ ঐতিহাসিক নাটক হলেও ট্র্যাজিডিক নাটক। এ নাটকেও ফলস্টাস চরিত্রে বিচিত্র কাহিনী স্থান পেলেও শেষ পর্যন্ত হেনরির করুণ মৃত্যু এবং ফলস্টাফের কারাবরণ নাটকটিকে বিষাদময় করে তোলে। 

শেকস্পিয়রের সবচেয়ে আলোচিত ট্র্যাজিডি নাটক হচ্ছে হ্যামলেট। এই নাটকটির কাহিনীও শেকস্পিয়রের নিজস্ব নয় নানা সূত্র থেকে সংগৃহিত। ঐতিহাসিক ম্যাক্সের ল্যাটিন ভাষায় রচিত ডেনমার্কের রাজাদের বিবরণ থেকে তিনি এর সারভাগ সংগ্রহ করেছেন। হ্যামলেটের আখ্যানটি Historie of Hamlet Primce of Denmarke এ যে ভাবে পাওয়া যায় তা নি¤œরূপÑ

হারোয়োন্ডি ডেনমার্কের রাজ কন্যা গারুথাকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম হয় পুত্র আমলেথের। হারোয়োন্ডি চক্রান্ত করে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ফেঙকে হত্যা করে এবং গারুথাকে বিবাহ করে। গারুথার স্বামী ঘাতক দেবরকে বিয়ে করতে একটু বাঁধেনি। ফেঙ আমলেথকে রাজ্য থেকে বিতাড়ন ও বিনাশ করার নানা ষড়যন্ত্র করে কিন্তু সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমলেথ তার মায়ের সহযোগিতায় পিতৃঘাতি পিতৃব্যকে হত্যা করে- এরপর সে নিজেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। শেকস্পিয়র এই কাহিনীটিই তার হ্যামলেট নাটকে গ্রহণ করেছেন, শুধু রানীর চরিত্রটি ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। হ্যামলেটের জননীর চরিত্রে নতুন ভাবের আমদানী করে, শেকস্পিয়র এটাকে সম্পূর্ণ নতুন অবয়ব দিয়েছেন তিনি। আর শেকস্পিয়র বিশ্বে আলোচিত হয়েছেন তার এই অমর নাটকটির জন্য, অবশ্য শেকস্পিয়রের অন্যান্য নাটক ও যে তার বিশ্ব জোড়া খ্যাতির পিছনে কোনো অবদান রাখেনি, তা কিন্তু নয়, কিন্তু হ্যামলেটের দ্যুতি ও খ্যাতির কাছে সেগুলো ম্লান। সমালোচকেরা বলেছেন মনোজগত এবং বহির্জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের অক্ষমতা নয় বরং অদেখা সক্ষমতাই এই নাটকটির প্রতি দর্শককে দুর্বল করে দেয়। কর্তব্য আবেগ দ্বিধার মধ্যে সংশয় এবং নাটকের শেষ পরিণতি মানব জীবনের বাস্তব নির্দয় নিয়তির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই সমালোচকদের ধারণা হ্যামলেটের অন্তর্নিহিত ভাবনা শুধু হ্যামলেটের ভাবনা নয় এর সাথে নাট্যকারের নিজস্ব ভাবনাও একাকার হয়ে গেছে। এক সুগভীর রহস্যবোধ ও স্বতন্ত্র জীবনদর্শন এ নাটকটিকে অনন্য করেছে।

শেকস্পিয়রের আর একটি প্রথমদিকে লেখা কমিডি হচ্ছে ‘লাভস লেবারস লস্ট’। এখানেও রাজা এবং লর্ডদের প্রতিজ্ঞা। লাভারারের রাজা এবং লর্ডগণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন- তারা তিন বছর বিদ্যা অর্জন করবেন এবং ঐ সময় কোনো নারীর মুখ দর্শন করবেন না এমন কি নারীর সঙ্গে মুখ ঢেকে কথাও বলতে পারবেন না।

তাদের এই প্রতিজ্ঞা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেননি, কারণ ফ্রান্সের রাজ কুমারী আর তার দুই সখীকে দেখার পর রাজা আর লর্ডগণ তাদের অজান্তেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে। কিন্তু কেউ স্বীকার করতে চাননি যে তারা শপথ ভেঙ্গেছেন। শেষ পর্যন্ত, তারা বুঝতে পারে, এটা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ নয়Ñ ভালবাসা ফরাশি রাজ কুমারী আর দুই সখি রাজা আর লর্ডদের বশ করে ফেলেছে। সুতরাং বাজুক বিয়ের বাদ্য। ট্রয়লাস এন্ড ক্রেসিনা নাটকটি যখন প্রকাশিত হয়। তখন এটি নিয়ে বিতর্ক উঠে। নাটকটি শেকস্পিয়রের রচনা কিনা? এর কারণ হলো ডেকর এবং চেটল চ্যাপমানের শেকস্পিয়রের নাটকের উপর কলম চালানোর ফল। অবশ্য এ কথাও অনেক সমালোচক বলে থাকেন যে, Troillas and cressida শেকস্পিয়রের লেখা বই নয় এটা তার নামে চালানো হয়েছে। সমালোচকদের এ দাবির কোনো জোরালো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। Troillas and cressida’র মূল কাহিনী হচ্ছে রাজপুত্র ট্রয়নাম এবং পুরোহিত কন্যা ক্রেসিডার প্রণয় এবং ব্যর্থতার কাহিনী। ক্রেসিডা তার ভালবাসার মূল্য না দিয়ে গ্রীক যুবককে প্রণয়ী রূপে গ্রহণ করে শুধু ভালবাসার অমযার্দা করেনি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। এই নাটকে কিছু লঘু এবং অনাবশ্যক ঘটনার সমাবেশ ঘটায়, নাটকটি শেকস্পিয়রের অন্যান্য নাটকের ন্যায় তীব্র এবং ধারালো হয়নি।

Timor of Athens নাটকটিও শেকস্পিয়রের নিজস্ব রচনা কিনা, এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে। অন্যের রচনাকে তিনি কিছুটা অদলবদল এবং সংশোধন করে নিজের বলে চালিয়েছেনÑ কেউ কেউ এমন ও বলেছেন এটা মূলত উলকিনস এর রচনা। সে যাই হোক এখানে সংক্ষিপ্ত এবং বিক্ষিপ্তভাবে শেকস্পিয়রের রচনার যে পরিচয় তোলে ধরা হলো সেটা আলোচনার সূত্রপাত মাত্র ভবিষ্যতে বিস্তারিত আলোচনার ইচ্ছা রইলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ