ঢাকা, শুক্রবার 5 October 2018, ২০ আশ্বিন ১৪২৫, ২৪ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান

মুহম্মদ মতিউর রহমান : বিশিষ্ট কবি ও গীতিকার আজিজুর রহমান (জন্ম : ১৮ জানুয়ারি ১৯১৭-মৃত্যু : ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ সাল) কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলার হাটশ হরিপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু শৈশবে পিতৃবিয়োগ ঘটায় তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারেন নি। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চা ও নাটকের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। ঐসময় থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নাট্যাভিনয়, খেলাধুলা, ক্লাব, সমিতি, সংঘ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়েন।

স্কুলে পাঠ্যাবস্থায় আজিজুর রহমান গান রচনা শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি কবিতা রচনা ও নাট্যাভিনয়ে অংশগ্রহণ করেন। নাটকের প্রয়োজনে তিনি অনেক গান  লেখেন। একপর্যায়ে তিনি যাত্রা দল গঠন করে তাতে অভিনয়  করেন। যাত্রার প্রয়োজনেও তিনি গান লিখেছেন। তাছাড়া, খেলাধুলা, সভা-সমিতি-ক্লাব ইত্যাদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে এসময় তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। 

আজিজুর রহমান ১৯৩৮ সাল থেকে সাহিত্যসাধনায় বিশেষভাবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। এসময় তিনি নিয়মিত তৎকালীন বিখ্যাত সাময়িকী মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর ‘মোহাম্মদী’, সজনীকান্ত দাশের ‘শনিবারের চিঠি’, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের ‘সওগাত’, হাবীবুল্লাহ বাহারের ‘বুলবুল’, কাজী  নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’, ‘আনন্দবাজার’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বাঙালি’, ‘অরণী’, ‘নবশক্তি’ ইত্যাদি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। কবি ও গীতিকার হিসাবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।

আজিজুর রহমান ১৯৫০ সালে তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তান ঢাকার নিজস্ব শিল্পী হিসাবে যোগদান  করেন। এ সময় বেতারশিল্পীদের জন্য তিনি অসংখ্য গান লিখেছেন। বিশেষ করে ইসলামি ও দেশাত্মবোধক গান রচনায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ইসলামি আদর্শ, ঐতিহ্য ও চেতনার পাশাপাশি তিনি বাংলার শ্যামল প্রকৃতির সৌন্দর্য  অনবদ্য ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। গীতিকার হিসাবে তিনি সমধিক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা দু’হাজারের অধিক। বাণীর অপরূপ মাধুর্যে এগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। লোকসঙ্গীত স¤্রাট আব্বাস উদ্দীন আহমদসহ সমকালীন বিশিষ্ট শিল্পীগণ তাঁর রচিত গানে সুরারোপ ও  কণ্ঠ দান করেছেন। তাঁর রচিত এবং শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে গীত ‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত/সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে’, গানটি একসময় সর্বত্র ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আজিজুর রহমানের লেখা ‘পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা/আমার এ দেশ ভাইরে’ প্রভৃতি জনপ্রিয়, অর্থবহ ও সুমধুর সঙ্গীত একসময় রেডিও, টিভি ও শিল্পীদের কণ্ঠে নিয়মিত শোনা যেত। গীতিকার হিসাবে তিনি অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

১৯৬০ সালে আজিজুর রহমান কিশোরদের পত্রিকা মাসিক আলাপনীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৬৪-৭০ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক পয়গামের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বড়দের জন্য যেমন লিখেছেন, তেমনি ছোটদের জন্যও লিখেছেন।  তাঁর রচিত শিশুতোষ ছড়া-কবিতা বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত তাঁর গ্রন্থাবলীর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো : ১. ডাইনোসরের রাজ্যে (১৯৬১), ২. জীবজন্তুর কথা (১৯৬২), ৩. ছুটির দিনে (১৯৬৩), ৪. এই দেশ এই মাটি (১৯৭০) ইত্যাদি। তার রচিত গানের সংকলন : উপলক্ষের গান (১৯৭০)। তবে তাঁর রচিত অধিকাংশ গানই অগ্রন্থিত রয়েছে। 

জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও উপযুক্ত তত্ত্বাবধান, অভিভাবকত্বের অভাব ও অমিতব্যয়িতার কারণে আজিজুর রহমান শেষ জীবনে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত ও নিদারুণ অর্থকষ্টে দুঃসহ জীবনযাপনে বাধ্য হন। সঙ্গীত ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে তাঁকে ‘একুশে পদকে’ (মরণোত্তর) ভূষিত করা হয়। বাংলা কাব্য ও গানের ভুবনে আজিজুর রহমানের মূল্যবান অবদান রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ