ঢাকা, শুক্রবার 5 October 2018, ২০ আশ্বিন ১৪২৫, ২৪ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

একটি মেস বৃত্তান্ত

মোহাম্মদ অংকন : অপুদের মেসের বর্তমান ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাসিবুল হাসান। ইতোপূর্বে তিনি সাধারণ বোডার হয়েই ছিলেন। সম্প্রতি তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদটি পেয়েছেন। এতে তিনি খুশি না হলেও বড় অংকের টাকার গাট্টি নিয়ে সমস্ত মাস অতিক্রম করতে পারেন বলে তিনি নতুন বউয়ের কাছে খুব সচ্ছল ব্যক্তি বলে পরিচিত। বাড়ি থেকে বিলম্ব করে টাকা নিলেও কিংবা অফিসের বেতন দেরিতে পেলেও কোনো প্রবলেম ফেস করতে হয় না। কেননা, তিনি যথা সময়ে মালিককে বাসার ভাড়া দিতে অভ্যস্ত নয়। তার ধারণা- ‘মাত্র ১৩০০০ টাকা ভাড়া দিয়ে মালিকের কিচ্ছু হবে না। না হয় আমরা ক’জন ফ্রি-ই থাকি।’ 

কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। মাসের যখন ৫ তারিখ অভার হয়ে যায়, তখন মালিক একটা স্লিপ নিয়ে হাসিব সাহেবের পিছনে পিছনে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কখনই যথাসময়ে নাগাল পায় না। হাসিব সাহেব বাসায় ফেরে প্রায় ১২টার দিকে আবার কোনো দিন ফেরে না। ততক্ষণে মালিকের ঘুম অর্ধেক হয়েই যায়। তবে তিনি ১০ টার দিকে এসে একবার টহল দিবেন তার সিওরিটি হান্ডড্রেট পার্সেন্ট। 

‘কি খবর অপু সাহেব, হাসিব মিঞার দেখা নাই যে?’ 

অপু সাহেব একজন ব্যস্ত লোক। একটা কোম্পানিতে গো খাটা খেটে যাচ্ছেন। ভাল বেতনও পান। বাসার দায়িত্বে তিনি যেন থেকেও নেই। 

‘হাসিব ভাই তো, শশুর বাড়ি গেছে।’ 

হাসিব সাহেব কয়েকমাস আগে প্রেম করে মিরপুরে একটি বিয়ে করেছেন। কিন্তু এখনও ঘর সংসার সাজানো হয় নাই। মেসে তার মন বসে না। অফিস শেষে তাই শশুরবাড়ি ছুটে যায়। তাই মালিক রিপ্লে করে, ‘হাসিব সাহেব বিরহের দিনগুলোই কী মেসে কাটায়? বাসার দায়িত্ব না নিতে পারলে ছেড়ে দিন। আমি অন্যদেরকে ভাড়া দিবো।’ 

এনগ্রি মেজাজে মালিক এসব বলতে বলতে স্লিপটা দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে যায়। অপু সাহেব স্লিপটা নিয়ে হাসিব সাহেবের ড্রয়ারে সযতেœ রেখে দেয়।

এ মেসের সিনিয়র সভাপতি হিসাবে মান্য করা হয় জিল্লুর পাটোয়ারি সাহেবকে। তার বয়স নায়ক সাকিব খানের চেয়ে সামান্য বেশিই বলে তিনি দাবি করে আসছেন মেসে পা রাখাকালীন থেকে। দুটো পুত্রও রয়েছে। তাদের ছেড়ে ২৩ বছর ধরে বিবাহিত ব্যাচেলর হয়ে ঢাকায় থেকে কোম্পানির চাকুরি করে বেড়ায়। কিন্তু কোনো দিন প্রমোশন পায় না আবার চাকুরীও ছুটে যায় না। এত অফিস ফাঁকি দিলে আবার প্রমোশন! সকালে ঘুম থেকে উঠে সিগারেট ধরিয়ে সবাইকে ডেকে তুলবে আর বলবে, ‘কি হইছে?’ 

অথচ মেসে কিছুই হয় নাই। তারপর চিরাচরিত কথাটি তিনি অকপটে বলবেন, ‘বাজারে তো ইলিশ বেশ সস্তা। কার বাজার? আজ রাতে সর্ষে ইলিশ হবে।’ 

এই লোকটা হেলপেলানো। নাড়িও চিকন। পেটে ভাত খুব একটা লোড করতে পারে না। কিন্তু সকাল দুপুর কি খেলাম না খেলাম তা দেখার নাই, তবে রাতের বেলা ইলিশ অথবা পাকিস্তানি মুরগি চাই! বুয়া বিকালে রান্না করে যায়, সেগুলো রেখে তিনি নতুন রান্না চড়ায় আর সাল্লু খানের হিন্দিগান ছেড়ে দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করে কখন গ্যাসের স্পিড বাড়বে আর কমপ্লিটলি সুস্বাদু রান্না হবে। 

 

মেসের আরেক সদস্য বিখ্যাত বরিশালের ইমরান হোসেন। মেসের বিষয়ে তার কোনো বোধোদয় নেই। তার হাতে সময় কম। তিনি এক অফিস করতে করতে দুদিন লাগিয়ে ফেলে। বুঝলেন না তো বিষয়টা। যদি তিনি রবিবার বিকাল ৫ টায় ডিউটি শুরু করেন, তবে বাসায় ফিরেন সোমবার রাত ৩ টায়। বিমানবন্দরে চাকুরি বলে কথা! সকালে সবাই যখন অফিস ছোটে তিনি তখন ভোরের স্বপ্ন দেখেন- ‘জীম করে করে বডিটা ফিটই রয়েছে।’ 

ছুটির দিন ছাড়া তার সাথে মেসের অন্যান্যদের মিট হওয়াটা বড়ই কষ্টকর। তবে মেসের হিসাব-নিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সব পাওনা পরিশোধ করে দেয়। হিসাব শেষে হাসিব সাহেব সবাইকে জানায়, কার কত বিল হয়েছে। ইমরান সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তা দিয়ে দেয়। টাকার পরিমাণ যদি ৩০২১ টাকাও হয়, তবুও তিনি এক টাকাও কম দেন না। হাসিব সাহেব এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার বান্দা নয় এটা সবাই বুঝে উঠেছে। কিন্তু হাসিব সাহেবের লেনদেনের আচরণ এখনও বুঝে উঠেনি নতুন বোর্ডার মুস্তাফিজ সাহেব। 

এই লোকটা দারুণ কিপটে স্বভাবের ও বড়ই চাপাবাজ লোক। আজ একজনকে বলে ঢাবির ছাত্রীকে বিয়ে করেছি, কাল আরেকজনকে বলে জবির ছাত্রীকে বিয়ে করেছি। অথচ তিনি একটি বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয় থেকে নয় বছর লাগিয়ে ইভিনিং শিফটে বিএসসি করেছেন। কাজ করেন টাওয়ারের মেকানিক্যাল পোষ্টে আর ছড়িয়ে বেড়ায়, ‘আমি চিফ ইঞ্জিনিয়ার।’ 

এমন চাপাবাজের বিষয়ে মেসে কারও কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ একটাই তিনি মেসের সবাইকে তুমি করে বলে বেড়ায়। তার ভাষ্য, ‘এ মেসের আমি সহসভাপতি আর জিল্লুর ভাই সিনিয়র সভাপতি।’

তুমি করে ডাকতেই অপু সাহেব ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। 

‘ওর থেকে আমি শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকুরির পদপদবি ও অভিজ্ঞতায় বড়, আর ও কী-না তুমি বলে। হাসিব ভাই, সামনের মাসে কান ধরে ওকে বের দিন না!’ 

হাসিব সাহেব অপু সাহেবকে সান্তনা দিয়ে বলেন, ‘যাক গা, আর কয় দিন ই-বা মেসে আছি। আমি তো বিয়ে করেছি। শশুরের নতুন বিল্ডিংটা উঠলেই চলে যাব। মিরপুরে ১০ কাঠা জমি কিনেছে আমার শশুর। আর আপনি বিয়ে করলে তো নতুন বাসা নিচ্ছেনই।’ 

হাসিব সাহেবের ভুত-ভবিষ্যৎ গেইজ করে ইউটিউব দেখতে দেখতে মনে মনে অপু সাহেব বলেন, ‘আপনার আর মেস ছাড়া হইছে। আজ থেকে ৫ বছর ধরে কমন ডায়লগটা শুনে আসছি।’

ছয় সদস্য বিশিষ্ট মেসে আরেকজন বোর্ডারের কথা এ প্রসঙ্গে না আনলেই নয়। তিনি নামে শিমুল হলেও দেখতে মাকাল ফলের মতই। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিচ্ছু মানে না, হেঁটে হেঁটে অফিসে যায়। একটি টাকাও খরচ করতে রাজি না। মেসে তো কোনো খাবার খায় না; বরং কাউকে কোনো দিন এককাপ চাও খাওয়ায় নাই। অফিসে সকালের নাস্তা, দুপুরের নাস্তা ও রাতে অভার টাইমের নাস্তা খেয়েই দিনটা কাটে। ভাত আর মুখে তোলে না। রাতে যখন ক্ষুধা লাগে, তখন দুটো পেঁয়াজ কেটে মাথায় লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। যখনই রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ নেয় তখনই সভাপতি জিল্লুর ধরে বসে সে মনে হয় খাবার চুরি করে খাচ্ছে। 

কিন্তু এর থেকেও বড় সন্দেহ হল- সে যেহেতু ভাত বাইরেও খায়না, তাহলে তার রুমমেট মুস্তাফিজ ভাগ করে খাওয়ায়? কেননা, মুস্তাফিজের কোনো গেস্ট আসলে এ প্রক্রিয়ায় আপ্যায়ন করে থাকে বলে সবাই তার গতিবিধি লক্ষ্য করে। 

এরকম খামখেয়ালীপনা ও ছয় কিসিমের সদস্য নিয়ে মেসটি আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। ইদানীং বিবাহ ব্যাচেলরের আধিক্যের কারণে মেসটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কিন্তু আসল সমস্যা হল, বিবাহিত তিনজন বাসাবাড়িতে বউ তুলছেন না আর অবিবাহিত তিনজন বিয়ের কোনো পরিকল্পনাই করছেন না।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ