ঢাকা, শুক্রবার 5 October 2018, ২০ আশ্বিন ১৪২৫, ২৪ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘পথ জানা নেই’ এক চকিতে মানবালেখ্য

মীম মিজান : মানবতা আজ পালিয়েছে মঙ্গলগ্রহে। পৃথিবীময় আজ লাশের স্তুপ। একটি বন্যা এসে যেমন সুখে বাসরত পিঁপড়াদের বাসা ভেঙেচূরে পানির ঢলে বয়ে নিয়ে চলে। অনুরূপ বিশ্বমোড়লদের ক্ষমতার দাপটে এখন অনেকেই বানের পানির ভাসমান পিঁপড়ার মতই ভেসে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত। আর মোড়লগণ বসে বসে মজা নিচ্ছেন। আওড়াচ্ছেন মানবতার বড় বড় ফাঁকা বুলি। যারা আজ মানবতার লাইসেন্স নিয়ে সাড়াবিশ্বে ‘মানবতা’, ‘মানবতা’ বলে ফেনা তুলছে তারাই একসময় প্রায় সারাবিশ্বকে ঔপনিবেশিক বানিয়ে মানবতার কসাইখানা খুলেছিল। তারাই শাসনের নামে, কালো আইনের আওতায়, রাষ্ট্রদ্রোহিতার দোহাই দিয়ে কত দেশপ্রেমিক নিরীহ মানুষকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে কৃষ্ণাঙ্গ নিধন করে বসত করে দিয়েছিল শাদা চামড়ার মেকি মানবদের। জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রসংঘের মাধ্যমে দেখাচ্ছে মায়াকান্না। 

এসব নিপীড়িত, নির্যাতিত, নিজ বাসভূম থেকে উচ্ছেদকৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিম পরিচয়ধারী জনগোষ্ঠীই প্রধান। ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, চিনের উইঘুর সম্প্রদায়, কাশ্মীর ইত্যাদি দেশ ও ভূখ-ে মানবতা আজ ধুলোয় মলিন। মানবতা নামক শব্দটি বা প্রত্যয়টি কিছুদিনপর শুধু অভিধানেই খুঁজে পাওয়া যাবে।

এরকম অবস্থায় মানবতা কোথায় যাবে? মানবতার কী জানা আছে কোন পথ বা গন্তব্য? আসলেই মানবতার পথ আজ জানা নেই। এই মানবতার পথ আজ থমকে দাঁড়িয়েছে।

‘পথ জানা নেই’ নামে একটি গল্পগ্রন্থ লিখে মানবতার এ দুর্দিনে মানবতার পক্ষে পথ করে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন তরুণ কবি, কথাশিল্পী, সম্পাদক ও সমাজসেবক শেখ বিপ্লব হোসেন। আমরা জানি যে ‘পথ জানা নেই’ নামে একটি বিখ্যাত ছোটগল্পের বই আছে সমাজসচেতন গদ্যশিল্পী আবুল কালাম শামসুদ্দীন (১৯২৬-১৯৯৭) এর। 

প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন এর গল্পের বইটির সর্বশেষ গল্পের নাম 'পথ জানা নেই'। আর ১৫ টি গল্পের সমন্বয়ে রচিত শেখ বিপ্লব হোসেন'র গল্পগ্রন্থেরও শেষ গল্পের নাম বা নামগল্পটিও ‘পথ জানা নেই'। তবে দুই ‘পথ জানা নেই' এর মধ্যে ফারাক আছে। প্রথম ‘পথ জানা নেই’ গল্পে আবুল কালাম শামসুদ্দিন গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায়-পাড়ায় আধুনিকতার ছোঁয়া যার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল। আর এই উন্নয়নের ধারায় এক সময় গ্রাম্য সরল মানুষ গফুর আলী ওরফে গহুরালী তার জমি দান করে রাস্তা তৈরির জন্য। রাস্তা তৈরির কিছু বছর পর গহুরালীর ব্যবসায়ীক বন্ধু তার বউকে নিয়ে ঐ শহরের দিকে পালিয়ে যায়।

পক্ষান্তরে শেখ বিপ্লব’র ‘পথ জানা নেই’তে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমারের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রোহিঙ্গাদের নিধনের সময় এক রোহিঙ্গা তরুণী জীবন বাঁচাতে বঙ্গোপসাগরে ঝাপ দিয়েছিল। আসলে তার কোনো পথ জানা ছিল না। সাইফুল নামের এক যুবক তার বন্ধুদের সাথে নিয়ে কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে গিয়ে সৈকতে পড়ে থাকতে দেখে সুমাইয়া নাম্নী সেই রোহিঙ্গা তরুণীকে। তাকে সৈকত থেকে তুলে সাইফুল ও তার বন্ধুরা হাসপাতালে ভর্তি করালে চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরলে তার ধাম জানতে চাইলে সে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আর মনে মনে ভাবে প্রকৃতই তার কোন পথ জানা নেই।

১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার কলাগাছি গ্রামে জন্মনেয়া মানবদরদী তরুণ কবি ও কথাশিল্পী শেখ বিপ্লব হোসেন ২০১৭ সালের অমর একুশে বইমেলায় ‘প্রবর্তন প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশ করেন তার গল্পগ্রন্থটি। গল্পগ্রন্থটি তিনি তার প্রয়াত ছোট ভাই রাজু আহমেদকে উৎসর্গ করেছেন। মানবতার মূল সুরনিয়ে গ্রন্থটি লিখলেও কথাশিল্পী বিপ্লব এখানে প্রায় দশটি বিষয়কে তুলে ধরার প্রয়াস করেছেন। বিষয় বিন্যাসে সেগুলি হচ্ছে,

১. ভাষা আন্দোলনভিত্তিক । যেমন: ‘ভাষা ও ভালোবাসা’ গল্পটি।

২. মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। যেমন: ‘কখন ভোর হবে’ গল্পটি।

৩. মানবতাবাদী। যেমন: ‘পথ জানা নেই’ গল্পটি।

৪. স্মৃতিকাতরতা বা শৈশবকালীন। যেমন: ‘আমার বাবা’ গল্পটি।

৫. অরাজকতা নিয়ে গল্প। যেমন: ‘অপেক্ষা’ ও ‘নীরব কান্না’ শীর্ষক গল্প দুটি।

৬. আধুনিকতার ছোঁয়ায় উন্নাসিকতা, প্রেম বা হৃদয় নিয়ে ছলচাতুরী করা বিষয়ক গল্প। যেমন: ‘সুদর্শিনী’ গল্পটি।

৭. প্রকাশক সেজে নবীন লেখকদের সাথে প্রতারণা করা(প্রতারণার বিষয়ে সচেতনমূলক) গল্প। যেমন: ‘বিজয়ের স্বপ্ন’ গল্পটি।

৮. সমাজের অনৈতিক লোকদের দুষ্টচক্রের কাছে নীতিবান মানুষের হেনস্তা(ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব) বিষয়ক গল্প। যেমন: ‘সাদা কালো’ গল্পটি।

৯. উপদেশমূলক। যেমন: ‘হঠাৎ এক রাতে’, ‘ভুলগুলো ফুল হলো’, ‘এ ভুলের কোনো ক্ষমা নেই’ শীর্ষক গল্পগুলি।

১০. যৌতুক ও পরকীয়া বিষয়ক। যেমন: ‘আদুরী’ নামক গল্পটি।

গত কয়েকদিন আগে সারাদেশকে কাঁপিয়ে দিল যে ঘটনার প্রেক্ষিত তা হল দুজন শিক্ষার্থীর উপর বাস তুলে দিয়ে হত্যার প্রতিবাদে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। এরকম অসংখ্য প্রাণ ঝরছে নিত্যদিনই। সেরকম একটি ঘটনা নিয়ে লিখা ‘নীরবকান্না’ গল্পটি। যাতে বেকারত্বের এক করুণ দৃশ্য প্রস্ফুটিত হয়েছে। উঠে এসেছে সংসারের বড় ছেলের উপর বাবা-মায়ের কত আকাক্সক্ষা তার চিত্র। ‘বড় ছেলে’ নাটকের খ-াংশের স্বাদ এখানে পাবেন পাঠক। তবে গল্পটি কিন্তু ‘বড় ছেলে’ নাটকের অনেক আগে লেখা। ‘রাজু’ নামক এক যুবকের মোটরবাইক এক্সিডেন্টের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে এ গল্পে।

সংসারধর্ম এক ত্যাগের জায়গা। একে অপরকে ছাড় দিয়ে না চললে মুখ থুবড়ে পড়বে সংসারের। আর অনেক বউয়ের সমস্যা তারা স্বামীর মা অর্থাৎ শাশুড়িকে তিল পরিমাণও সহ্য করতে পারেন না। এমনই এক বৌয়ের দুর্ব্যবহারে তার শাশুড়ি বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ঘটনা আশ্রিত করে গল্প লিখেছেন শেখ বিপ্লব। ‘এ ভুলের কোন ক্ষমা নেই’ শীর্ষক গল্পটি বর্তমান সমাজ বাস্তবতার এক করুণ চিত্র। আমরা যেন সেরকম ভুল না করি যেরকম ভুলের ক্ষমা নেই এমনই ইঙ্গিতবহ গল্পটি।

গল্পগ্রন্থটির সবথেকে ছোট্টগল্প ‘আমার বাবা’। এখানে কবি ও কথাশিল্পী শেখ বিপ্লব আমাদের জন্য পিতা বা মাতার যে অসামান্য ত্যাগ তা তুলে ধরেছেন বাবার রেডিও বিক্রির আখ্যান বর্ণনা করে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ‘কখন ভোর হবে’তে দাদুর কাছে এক মজার গল্প শুনেছেন দাদুর নাতিরা। শীতের রাতে বাসরঘর ছেড়ে বর-বধূ পাক মিলিটারির ভয়ে পুকুরে নেমে মাথায় কচুরিপানা দিয়ে সারারাত কেটে দেয়। আর অপেক্ষা করে আবির রাঙ্গা এক সুপ্রভাতের। এ গল্পের মাধ্যমে তিনি সমাজেরও এক সুপ্রভাতের অপেক্ষার আশা ব্যক্ত করেছেন।

সমালোচনায় আসলে, গল্পগুলোর আঙ্গিকগত পরিসর খুবইই স্বল্প, নাটকীয়তা বা মোড় ঘুরানো একদম অনুপস্থিত, পাঠককে গভীরে টেনে নেয়ার মতো কৌশলের ব্যবহারে দীনতা, শব্দের সন্ধিবদ্ধ ব্যবহার গৌণ, শোভিত বর্ণনা ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়। তবে তার গল্পগুলির ভাষা বেশ সাবলীল ও প্রাঞ্জল। নির্মেদ ও বাহুল্য বর্জিত।

গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন অহিদা খাতুন। প্রচ্ছদে আধারময় এক দিগন্তে চকিত আলোকে কাঁটাতারের বেড়ার জালে দুঃখী এক বালিকার মুখাবয়ব। ৪৮ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ১৪০ (একশত চল্লিশ টাকা)। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ