ঢাকা, শনিবার 6 October 2018, ২১ আশ্বিন ১৪২৫, ২৫ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাছের কাঁটার রফতানি আয়

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক রিপোর্টে প্রকাশ, মাছের কাঁটা রফতানি করে বছরে আয় হচ্ছে সাড়ে তিনশত কোটি টাকা। কর্তৃপক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মাছের কাঁটা, আঁশ, বায়ুথলিসহ ফেলে দেয়া বর্জ্যই হতে পারে রফতানি আয়ের একটি বড়খাত। মৎস্য অধিদফতর জানিয়েছে, মাছের আঁশ, ফুলকা, পিত্ত ও চর্বি, চিংড়ি মাছের মাথা ও খোসা, কাঁকড়ার খোলস রফতানি হচ্ছে ইতালি, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, চিন, জার্মানি, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। উল্লেখ্য, এসব বর্জ্য দিয়ে স্যুপ তৈরি হয়। এ স্যুপের চাহিদা সবচেয়ে বেশি পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের দেশসমূহে। প্রতিমাসে চিন ও ভিয়েতনামে প্রায় ১০০ টন চিংড়ির মাথা ও খোসা এবং প্রায় ৫০ টন কাঁকড়ার খোলস রফতানি হয়। কোরাল, বোয়াল, রুই, কাতলা, লাক্কা, আইড়সহ বিভিন্ন মাছের বায়ুথলি, পিত্ত এবং চর্বি যায় ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। গড়ে প্রতিমাসে দেড়শত টন মাছের বর্জ্য রফতানি হয়; যা থেকে বছরে ২০ থেকে ২৫ লাখ ডলার আয় হয়। এ ছাড়া প্রায় ২০০ থেকে আড়াই শত টন মাছের আঁশ, ৮০ টন হাঙ্গরের হাড়, কানকো, ফুলকা, চামড়া ইত্যাদিও রফতানি হয়। এতেও আয় হয় প্রায় ১৫ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। শুধু স্যুপই নয়, মাছের চামড়া থেকে বেল্ট, জুতা, ব্যাগ এবং বিভিন্ন ওষুধের কভার বা ক্যাপসুলের খোলস, লিভার থেকে ওমেগা-৩ ক্যাপসুল, রাসায়নিক সেল থেকে ওষুধ ও প্রসাধনী পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব। তবে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতের জন্য বাংলাদেশে এখনও যথেষ্ট দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তি নেই বললেই চলে। এ কারণে মাছের কাঁটা, ফুসফুস, আঁশ ও চিংড়ির খোলস রফতানি হলেও নাড়ি-ভুঁড়ি, পাখনা, ফুলকা, চামড়া ইত্যাদি ফেলে দেয়া হয়। ফলে বড় অঙ্কের  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।
বাংলাদেশ চিংড়ি ও মৎস্য ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন মাছের বর্জ্য উৎপাদন হলেও প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে মাত্র ২০ শতাংশ রফতানি করা হয়। বাকি ৮০ শতাংশই ফেলে দেয়া হয়। মাছের আঁশ, চিংড়ির খোসা থেকে পাওয়া বর্জ্যরে বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় চার হাজার কোটি টাকা; যা দেশের পুরো মৎস্যখাত থেকে অর্জিত আয়ের সমান। এ ব্যাপারে মৎস্য অধিদফতরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিত্যরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, মৎস্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু মাছ রফতানি করছে। নতুন উদ্যোক্তারা প্রক্রিয়াজাত করা মাছের বর্জ্য রফতানি করতে পারেন। সূত্রমতে একটি মাছ প্রক্রিয়াজাত করার পর মূল ওজনের ৪০ শতাংশ মাছ আর ৬০ শতাংশ বর্জ্য থাকে। এ ৬০ শতাংশ বর্জ্যরে মধ্যে ১০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বাকি ৫০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি মূল মাছের দামও কমবে। মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে মৎস্যবর্জ্য প্রক্রিয়া এখনও তেমন বিকাশ লাভ করেনি। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদার কারণে এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় মৎস্যবর্জ্যরে রফতানিযোগ্য বাজার খুব সহজেই পাওয়া যেতে পারে।
মাছের বর্জ্য মানে কাঁটা, কানকো, ফুলকা, আঁশ, বায়ুথলি বা ভটকা, পিত্ত ইত্যাদি সাধারণত ফেলে দেয়া হয়। কাক-পক্ষি ও কুকুর-বেড়ালে খায়। অথচ এসব মাছের বর্জ্য বিদেশে প্রায় সোনার দামে বিক্রি হয়। গরু-মোষ ও ছাগলের নাড়ি-ভুঁড়ির কিয়দংশ মহিলারা বেছে নিয়ে জিগড়ি হিসেবে খাদ্যোপযোগী করলেও এর সিংহভাগ ফেলে দেয়া হয়। পশুদেহের বর্জ্য অর্থাৎ নাড়ি-ভুঁড়ি থেকেও উপাদেয় এবং মূল্যবান স্যুপ বা পানীয় প্রস্তুত হয় উন্নত দেশগুলোতে। আমরা আসলে রতœ চিনি না। মাছ ও জবাই করা পশুর বর্জ্য যা আমরা অবহেলায় ফেলে দেই, তা কিন্তু রফতানিযোগ্য পণ্যরূপে গণ্য হতে পারে। আমরা দেখছি, আজকাল পাড়ামহল্লায় মেয়েদের চুল, সেলুনের চুল এক শ্রেণির লোক কিনে নিয়ে যায়। এ চুল থেকেও ব্রাস, চিরুনিসহ নানা পণ্য প্রস্তুত হয়। চুল থেকে পণ্য প্রস্তুতের কারখানা স্থাপিত হয়েছে দেশে। তবে এগুলো করছেন বিদেশিরা। আমাদের কেউ কেউ এসব কারখানায় শ্রমিক হিসেব কাজ করছেন। ফেলে দেয়া বা উপেক্ষিত ও অপ্রচলিত পণ্যের প্রতি আমাদের উদ্যোক্তারা মনোযোগ দিতে পারেন। এসব উপেক্ষিত বর্জ্যই হতে পারে আমাদের মানিক-রতন। একটা পুরনো প্রবাদ সবারই হয়তো জানা আছে। সেটি হচ্ছে, ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো মানিক-রতন।’ আসলে অনেক কিছুকেই আমরা ছাই ভাবি। উপেক্ষা করি। অবহেলায় দূরে ঠেলে দেই। কিন্তু ছাইয়েও যে মূল্যবান হিরা-মানিক থাকতে পারে সেদিকে নজর দেবার সুযোগ আমাদের কমই হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ