ঢাকা, মঙ্গলবার 9 October 2018, ২৪ আশ্বিন ১৪২৫, ২৮ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হেফাজত সর্বদলীয় সরকার ও নির্বাচনের বাস্তবতা

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যেমন উত্তপ্ত হচ্ছে তেমনি এই অঙ্গনে অনৈতিক কর্মকা-ও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে হয়। এই অনৈতিক কাজকে কেউ বলছেন রাজনৈতিক ভাড়ামী আবার কেউ কেউ একে রাজনৈতিক বেশ্যাবৃত্তি বলেও অভিহিত করেছেন। এর অধীনে সরকারি দল বিরোধী দলের প্রার্থী কেনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।
পয়সা কড়ি নিয়ে  দল বদল বা অবস্থান বদলের ক্ষেত্রে আমাদের আলেম সমাজের তৎপরতা খুব একটা ছিল না বললেই চলে। কয়েক বছর আগে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে আমাদের একজন শীর্ষ স্থানীয় আলেম আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার সাথে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। তার সহযোগী আলেমরা তার এই কাজ পছন্দ করেননি। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামীর প্রধান বিশিষ্ট আলেম মুফতি শফি সাহেবের একটি উক্তিকে ঘিরে আলেম সমাজের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী মুফতি শফি সাহেব বলেছেন যে তার আওয়ামী লীগ হতে কোন সমস্যা নেই কেননা আওয়ামী লীগ তাকে অর্থ সাহায্য দেয়। কথাটির তাৎপর্য অনেক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, অর্থ সাহায্য কি নীতি আদর্শ থেকে এতই শক্তিশালী যে একজন আলেম তা পেয়ে তার আদর্শের পরিপন্থী একটি দলের সাথে একাত্ম হবার ঘোষণা দিতে পারেন? এই আওয়ামী লীগের কাছে মুফতি শফি সাহেব হেফাজতের ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিলেন। তার একটিও আওয়ামী লীগ সরকার মানেনি বরং তাদের শাপলা চত্তরের লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশকে গভীর রাতে যৌথবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে উৎখাত করে দিয়েছিল। আলেমরা ইসলামের ধারক ও বাহক। এই ইসলাম সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রীদের ধারণা সুস্পষ্ট। এই দলের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মা দুর্গা গজে চড়ে এসেছিলেন বলেই দেশে ফলন ভাল হয়েছে। আরেকজন মন্ত্রী বলেছেন দেশে তথাকথিত আল্লাহর শাসন দিয়ে কিছুই হবে না। আমি হিন্দুও না মুসলমানও না।  আরেক জন মন্ত্রী বলেছেন, আগামী বার ক্ষমতায় আসলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামই তুলে দেব। আরেক মন্ত্রী বলেছেন, ধর্ম হলো নেশার মতো। হজ্জ্ব হচ্ছে আবদুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদের আয় রোজগারের ফন্দি। ধর্মমন্ত্রী বলেছেন, রাসূল (দ.) হিন্দুদের পূজার জন্য মসজিদের অর্ধেক ছেড়ে দিয়েছিলেন। আরেকজন বলেছেন, মেয়েদের বোরখার হাত থেকে রক্ষার জন্য নাচগানের শিক্ষা দিতে হবে (হাসান মামুদ) প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন বোরখার ব্যবহার ৫০০% বেড়ে গেছে। এটা বন্ধ করতে হবে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক বলেছেন কওমী মাদ্রাসা জঙ্গী প্রজনন কেন্দ্র। একজন ডেপুটি স্পীকার বলেছেন কুৎসিত চেহারা ঢাকতেই মেয়েরা বোরকা পরে। অন্য একজন মন্ত্রী বলেছেন, রাসূলকে কটূক্তি করা স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা নিয় হৈ চৈ করা ঠিক নয়। উপরোক্ত উক্তিগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতাদের ইসলাম বিদ্বেষই ফুটে উঠে। এই দলটি দেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি আল্লাহর উপর আস্থা বিশ্বাসকে বাতিল করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে। হেফাজত প্রধান মুফতি শফি একজন শীর্ষ স্থানীয় আলেম হিসাবে আওয়ামী লীগের এই কীর্তি এবং ধারণা বিশ্বাস গুলোকে জেনেই কি আওয়ামী লীগ হতে চান? এই প্রশ্ন সকলের। হেফাজতে ইসলামের দায়িত্ব কি প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে তিনি স্বস্তি পেতে চান?
দুই.
এখন মূল প্রসঙ্গে আসি। একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য যা যা দরকার তার কোনটাই দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকার এবং সরকারি দল এক হয় নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। দেশব্যাপী এখন ব্যানার ফেস্টুন, প্রতীক সবই তাদের। অন্য কোন দল আছে বলে মনে হয় না। শোনা যাচ্ছে সামনের মাসে নির্বাচনী তফসীল ঘোষণা হবে এবং তার সাথে সাথে অথবা আগে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকার ঘোষণা করবেন। সংসদ বহাল থাকছে। ইতিপূর্বে এই স্তম্ভে আমি বহুবার বলেছি যে আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি দু’টি ভাষাতেই বাংলাদেশ সংবিধানের প্রতিটি লাইন ও বাক্য পড়ার আমার সুযোগ হয়েছে। এছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, তুরস্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড সহ দুনিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সংবিধানও আমি পড়েছি। একমাত্র বাংলাদেশের সংবিধান ছাড়া আর কোথাও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের বিধান আমি পাইনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গত কয়েক বছর ধরে যে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলছেন বাংলাদেশের সংবিধানে তা কোথাও নেই। আমি পাইনি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে যে সংবিধানের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল তাতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল এবং নির্বাচনের পূর্বে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার বাধ্য বাধকতা ছিল। আওয়ামী লীগ ও তার জোট ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ১২৩ (৩) ক ও খ উপ-অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করে। এতে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তার স্থলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং বাকশাল আমলে প্রবর্তিত ও পরে বাতিলকৃত সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান পুনঃপ্রবর্র্তিত হয়। এর মাধ্যমে অসংখ্য জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে অর্জিত ক্ষমতা হস্তান্তর ও সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের নন্দিত ব্যবস্থাটিকেই আওয়ামী লীগ ধ্বংস করে দেয়। বিরোধী দলগুলোকে বোকা বানানোর জন্যই প্রধানমন্ত্রী এবং তার দল নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলছেন। ২০১৪ সালেও তারা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের কথা বলেছিলেন। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে তারা যে ক ও খ উপ-অনুচ্ছেদ তার সাথে সংযোজন করেছিলেন এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচন দিয়েছিলেন দেশের জনগণ তা মানেনি। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে কোনও ভোটার ভোট দিতে যায়নি। প্রার্থীদের বিনা ভোটে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল। অবশিষ্ট ১৪৬ টি আসনের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল সাড়ে চার শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। ভোটারদের এই অনুপস্থিতি এবং সর্বনি¤œ উপস্থিতি ছিল সরকারের প্রতি অনাস্থা এবং সংবিধান সংশোধন প্রত্যাখ্যান। সরকারের এই হঠকারিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে ঐ সময় ৬৭ জন লোক পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন দশ সহ¯্রাধিক এবং সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকার। কিন্তু সরকার তার অবস্থান থেকে নড়েননি এবং ম্যান্ডেটবিহীন অবৈধ সংসদ নিয়ে পূর্ণ মেয়াদ পার করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভার সদস্য এবং দলীয় নেতারা বার বার বলছেন যে তারা সংবিধান থেকে একচুলও নড়বেন না। নির্বাচনকালীন সরকারের যে কথা তারা বলছেন তাতো সংবিধানেরই লঙ্ঘন। এই সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগেরই সরকার। মন্ত্রীরা বার বার তা পরিষ্কার করে দিচ্ছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই হবেন এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনার লালিত অভিলাসও তাই। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হবার কথা ছিল। তখনকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হবার কথা ছিল। আওয়ামী লীগের কাছে এই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি কেএম হাসান গ্রহণযোগ্য হননি। কারণ, তার চাকরি জীবনের আগে প্রায় ৩২ বছর পূর্বে তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী সমিতির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বলাবাহুল্য, বিষয়টি ১৯৭৫ সালের, যখন বিএনপির জন্মই হয়নি। বিচারক হবার পর চাকরি জীবনে বা বিচারিক কার্যক্রমে কোথাও তার দলীয় আনুগত্যের, দলপ্রীতির অথবা বিএনপির প্রতি তার সহানুভুতির কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের কাছে সংবিধানের ৫৮(গ) ধারার ৩, ৪, ৫ উপ-ধারায় বর্ণিত প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ সংক্রান্ত কোন বিধানই গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ ৬ উপধারা বলে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বিএনপির সক্রিয় নেতা বা কর্মী ছিলেন না। যেমন বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ আওয়ামী লীগের একজন এমপি এবং স্পিকার ছিলেন। জনাব ইয়াজউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এটাই ছিল তার অপরাধ। এই অপরাধে শেখ হাসিনা একজন প্রবীণ শিক্ষক এবং দেশের রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে ব্যাঙ্গ করে সব সময় ইয়েসউদ্দিন বলে অভিহিত করতেন। তার এই অবজ্ঞা, উপেক্ষা ও অপমানের জন্য তখন কেউ তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেননি। এখন যেমন তার এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কেউ হাসি-তামাশা করলেও মানহানির মামলা ঠুকে দেয়া হয় এবং আদালত স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জেল-জরিমানায় দ-িত করে। শেখ হাসিনা ও তার দলের অনমনীয় অবস্থান, দেশব্যাপী হরতাল-অবরোধ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির এই ঘটনা বেশি দিন আগের নয়। তাদের এই আন্দোলন, এক এগারোর সৃষ্টি করেছিল এবং সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই সরকারকে তার আন্দোলনের ফসল বলে অভিহিত করে মঈনউদ্দিন, ফখরউদ্দিনের সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার আন্দোলনের ফসল এই সরকারই যখন তাকে গ্রেফতার করলো এবং দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে হুমকি বলে তাকে আখ্যায়িত করে প্রেস রিলিজ জারি করল তখনই তারা খারাপ হয়ে গেল। এর পর ভারতের সহযোগিতা, পরামর্শ, বস্তা বস্তা টাকা এবং মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের বৈধ-অবৈধ সকল কাজের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে তিনি ক্ষমতা প্রলম্বিত করার এবং বার বার ক্ষমতায় যাওয়ার পথ পরিষ্কার করার ব্যবস্থা হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উচ্চ আদালতের দোহাই দিয়ে রায় প্রকাশের আগেই তড়িঘড়ি সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সংযোজন করেন। ১৯৯৪-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এবং ২৭৩ দিন হরতাল করে দেশব্যাপী অবরোধ-নৈরাজ্য, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মাধ্যমে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার আদায় করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন দেশ-বিদেশের মানুষ তা এখনো ভুলেনি। কিন্তু এই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে তিনি যে দুঃশাসন, অত্যাচার, নির্যাতন ও দুর্নীতির রেকর্ড গড়লেন তাতে দ্বিতীয়বার নির্বাচনে দেশের মানুষ তাকে ক্ষমতায় পাঠায়নি। এ জন্য তিনি তারই পছন্দের নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুলিশবাহিনী, সেনাবাহিনী, বিডিআর বাহিনী সবাইকে পাইকারী হারে বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক বলে গালি দিলেন। এই গালি গোপনে ছিল না, প্রকাশ্যে ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে তার পরাজয়কে তিনি মানতে পারেননি এবং ২০০৭ সালের নির্বাচনে তার দলের ভরাডুবির আশঙ্কায় তিনি দেশে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য সৃষ্টি করে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারকে নিয়ে আসেন। ঐ সরকারের আমলে দুর্নীতি ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির অপচয়, খুন, হত্যা প্রভৃতি অপরাধে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তিনি গ্রেফতারও হন এবং তাকে নির্বাসিত করার চেষ্টাও চলে। ঐ সময়ে বেগম খালেদা জিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং বিরাজনীতিকরণের একটি অপচেষ্টা চলে। শেখ হাসিনার মধ্যে তখনই তত্ত্বাবধায়ক বিরোধী একটি শক্ত মনোভাব গড়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি যত অপকর্ম করেছেন বা করবেন তত্ত্বাবধায়ক আমলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং তাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীনও করা হতে পারে। আবার নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তার পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিনও হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় তিনি দলন-পীড়ন ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে এগুতে শুরু করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি-জামায়াত জোটে ভাঙ্গন এবং দল দুটিকে নিশ্চিহ্নকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় অত্যন্ত কাছাকাছি এসে পড়েছে। এই নির্বাচনকে নির্বিঘœ ও সহজ করার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। সংবিধান সংশোধন করে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান বাতিল করা, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার বিধান পুনরায় চালু করা, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনী মাঠ সকল দলের জন্য সমান, মসৃণ করাসহ সকল রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ। একটি নিরপেক্ষ অবাধ ও সকল দলের (শুধু ক্ষমতাসীন জোটভুক্ত দল নয়) অংশগ্রগহণে ফলপ্রসূ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই কাজগুলো অত্যন্ত জরুরি। ২০১৪ সালে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এই বছর তারা এই ভোটাধিকার প্রয়োগে উদগ্রীব, কিন্তু সরকার যে পথে অগ্রসর হচ্ছেন তাতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান নয় সংঘাত-সংঘর্ষই অনিবার্য হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীবর্গ দলীয় নেতা-কর্মী এবং আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলো সারাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন, ভোট ভিক্ষা করছেন। তারা জনসভা, পথসভা, রেডিও ও টিভি চ্যানেলসমূহের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে তারা দলীয় প্রচারণায় এমনভাবে ব্যবহার করছেন যা ইতোপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি। পক্ষান্তরে বিরোধী দলগুলোকে প্রচারণা চালানো তো দূরের কথা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান অথবা মানববন্ধনেও একত্রিত হতে দিচ্ছেন না। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রায় এক লাখ চৌদ্দ হাজার মামলা রয়েছে এবং এইসব মামলায় আসামীর সংখ্যা হচ্ছে ২৯ লাখেরও বেশি। এরমধ্যে দল দু’টির স্থায়ী কমিটি, নির্বাহী কমিটি বা কর্মপরিষদের এমন কোন সদস্য নেই যার বিরুদ্ধে সরকার মামলা করেনি। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৮৭টি, খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে ১৭টি, মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে ২৮টি, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৮৭টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা রয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলার সংখ্যা এক থেকে সতেরোটি পর্যন্ত বিস্তৃত। একইভাবে জামায়াতের আমীর ও বর্ষীয়ান নেতা জনাব মকবুল আহমেদের বিরুদ্ধে ২৮টি, নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবর রহমানের বিরুদ্ধে ২৬টি, অধ্যাপক গোলাম পরওয়ারের বিরুদ্ধে ২৪টি, সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ৩০টি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে ৮৮টি, হামিদুর রহমান আযাদের বিরুদ্ধে ৬৪টি, ডা: তাহেরের বিরুদ্ধে ২৪টি, নূরুল ইসলাম বুলবুলের বিরুদ্ধে ২৫টি, সেলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে ২৮টি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের বিরুদ্ধে ৮৯টি এবং ড. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা রয়েছে। বলাবাহুল্য, জামায়াত-শিবিরের মামলার সংখ্যা হচ্ছে ২৩,৫২৯টি এবং এতে আসামীর সংখ্যা এক লাখ চৌদ্দ হাজার। ওদের অনেকেই একাধিক মামলার আসামী এবং চক্রবৃদ্ধি ধরলে আসামীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। বর্তমানে এমন কোন দিন নেই যেদিন জামায়াত-শিবির, বিএনপি-ছাত্রদল, যুবদলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। তারা এমন এক সরকারের আমলে বাড়িঘরে থাকতে পারেন না। তারা কোথাও একত্রিত হলে বলা হয় যে তারা নাশকতার পরিকল্পনা করছেন এবং তাদের গ্রেফতার করা হয়। সরকার এখন দেখে দেখে আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের সম্ভাব্য ও প্রতিশ্রুতিশীল প্রার্থীদের গ্রেফতার করছেন এবং তাদের বিভিন্ন  ফৌজদারি মামলায় ফাসাচ্ছেন। উদ্দেশ্য তাদেরকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা যাতে করে সরকার দলীয় প্রার্থীরা তাদের আসন ছিনিয়ে নিতে পারে। আবার মামলা জিইয়ে রেখে ধরপাকড়ের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থক প্রায় ৩০ লাখ আসামীকে ভোট দানে বিরত রাখাও সরকারের একটি নির্বাচনী কৌশল হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট এবং সরকার শতকরা ১০০ ভাগেরও বেশী আওয়ামী লীগার। প্রশাসনেরও আওয়ামীলীগীকরণ হয়েছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফর্মুলা অনুযায়ী তার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকার দেশে অবাধ নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন করতে পারেন না। গত ১০ বছরে এই সরকারের আমলে পুলিশ, আনসার, ভিডিপিতে লক্ষাধিক লোককে এই সরকার নিয়োগ দিয়েছেন। কিছু দিন আগে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল তাদের এক ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টে অভিযোগ করেছে যে, সরকার ভূয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ভারতীয় নাগরিকদের পুলিশে নিয়োগ দিয়েছেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগের নেতা-কর্মী এখন ব্যাপকভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে রয়েছে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। নির্বাচন কমিশন শোনা যাচ্ছে নির্বাচনের আগে ২,০০০ কর্মী নিয়োগ করবে। সরকারের বিদ্যমান নীতি অনুযায়ী এরা যে আওয়ামী লীগার হবে না তার নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ নির্বাচনে এবার যারা প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার হবেন তাদের সকলেই আওয়ামী পরিবারের সদস্য হবেন। সরকারের এই নিখুঁত পরিকল্পনা ভোট কারচুপিকে ত্বরান্বিত করবে। বিরোধী দলের প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্ট এবং ভোট কেন্দ্রের পোলিং এজেন্টদের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য হামলা-মামলা তো আছেই। সকল বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও প্রচেষ্টাই শুধু এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। তা না হলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কোন কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ