ঢাকা, বুধবার 10 October 2018, ২৫ আশ্বিন ১৪২৫, ২৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

টাকা পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

দেশের ভেতরে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির অবস্থায় থাকলেও একদিকে ব্যাংক ঋণ যেমন বাড়ছে তেমনি বেড়ে চলেছে আমদানি ব্যয়ও। বিষয়টিকে অস্বাভাবিক শুধু নয়, রহস্যজনক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা। তারা মনে করেন, অন্তরালের কারণ আসলে টাকার পাচার। নির্বাচনের বছর বলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারও হচ্ছে বিভিন্ন পন্থায়। এসব পন্থার মধ্যে প্রাধান্যে রয়েছে আমদানি ব্যয় মেটানোর অজুহাত। শিল্প কারখানায় উৎপাদন ও উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী আমদানির জন্য যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নেয়া হচ্ছে বাস্তবে দেশে আনা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম মূল্যের পণ্যসামগ্রী। অনেক ক্ষেত্রে আবার আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুললেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো পণ্যই আমদানি করা হচ্ছে না। এলসির সমুদয় অর্থই পাচার করা হচ্ছে। এরই পাশাপাশি আমদানির জন্য বেশি মূল্য দেখানো বা ওভার ইনভয়েসিং করা এবং রফতানির ক্ষেত্রে প্রকৃত আয়ের চাইতে কম আয় দেখানো বা আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমেও পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রেও মারাত্মক দুর্নীতি করছে বিশেষ কিছু চক্র। এসব চক্রের লোকজন প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রেমিট্যান্সের অর্থ সংগ্রহ করে সে অর্থ বিদেশেই রেখে দেয়। অন্যদিকে দেশে তাদের এজেন্টরা প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে ওই পরিমাণ অর্থ পৌঁছে দেয়। স্বজনরা যেহেতু প্রত্যাশিত পরিমাণ অর্থ পেয়ে যায় সে কারণে পাচারের বিষয়টি সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, প্রবাসীরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থই দেশে আসতে পারে না। ফলে দেশ বঞ্চিত হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন থেকে।
এসবের পাশাপাশি অন্য কিছু বিচিত্র পন্থায়ও বিপুল অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সব জানা সত্ত্বেও কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এর ফলেও পাচারকারী ব্যক্তি ও চক্রগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের ব্যবধান বেড়ে চলেছে অবিশ্বাস্য পরিমাণে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয় ছিল ৫৪ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছিল ৩৬ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসা ১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার যোগ করার পরও আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের। এই পরিসংখ্যানে প্রমাণিত হয়েছে, যে হারে বৈদেশিক মুদ্রা আসছে চলে যাচ্ছে তার চাইতে অনেক বেশি পরিমাণে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারসহ তথ্যাভিজ্ঞরা একে অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করে জানিয়েছেন, গত ১০ বছরেও এ ধরনের ঘটনা কখনো ঘটেনি।
এমন অবস্থার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচনের বছর বলেই বিশেষ করে কালো টাকার মালিক ও ঋণখেলাপিদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন আর সে কারণে দেশের ভেতরে টাকা রাখা নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। একই কারণে একদিকে তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে হাত গুটিয়ে রেখেছেন, অন্যদিকে অর্থ পাচার করছেন বিপুল পরিমাণে। সে জন্যই রফতানি আয় ও আমদানি ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। বাড়ছে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণও। কথা আরো আছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে পণ্যের মূল্যও বাড়তে থাকবে। বাস্তবে সব পণ্যের মূল্য বেশ কিছুদিন বাড়তেও শুরু করেছে।
নির্বাচনের বছর ধরনের যতো কিছুরই দোহাই দেয়া হোক না কেন, আমরা কিন্তু বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না। কারণ, গত বছরই ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তার এক রিপোর্টে জানিয়েছিল, টাকা পাচারের ক্ষেত্রে মাত্র এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৮তম অবস্থান থেকে ২৬তম অবস্থানে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে গড়ে ৪৪ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। জিএফআই-এর ওই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছিল, ‘নির্বাচনের বছর’ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
এই রিপোর্টের আলোকে তথ্যাভিজ্ঞরা সে সময় জানিয়েছিলেন, এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে দেশের ভেতরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। সৃষ্টি হয়নি চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও। মূলত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের আশংকার কারণেই দেশি-বিদেশি কোনো শিল্প উদ্যোক্তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না। অবৈধ পথে লক্ষ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে শিল্প-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির প্রতিটি খাতে সংকট ক্রমাগত আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
সমগ্র এ প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, টাকার পাচার বন্ধ করার পাশাপাশি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হলে সরকারের উচিত সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, কাউকেই যাতে অবৈধ পথে টাকা পাচারের কথা চিন্তা না করতে হয়। আমরা প্রসঙ্গক্রমে পাচারকারীদের চিহ্নিত করার এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনসম্মত কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ