ঢাকা, বুধবার 10 October 2018, ২৫ আশ্বিন ১৪২৫, ২৯ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ॥ ৫ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী বহিষ্কার

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা : মাওলানা ভাসানী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সন্তোষ, টাঙ্গাইল) ছাত্রলীগ কর্তৃক অকৃতকার্য এক ছাত্রীকে জোরপূর্বক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে পদত্যাগকৃত শিক্ষকরা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে স্ব-স্ব পদে ফিরে এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ভিসি সাথে শিক্ষকদের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগ সভাপতি সজীব তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানসহ অসদ আচরণ করা ৫ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করায় শিক্ষকরা এ সিদ্ধান্ত নেন। তবে গতকাল মঙ্গলবারও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অডিনেন্স সংশোধনের দাবীতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রলীগ।
উল্লেখ্য গত ৮ অক্টোবর সোমবার টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ কর্তৃক পরীক্ষা  দেয়ানোর সময় শিক্ষকরা বাধা দিলে তারা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের চার নেতার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে তাৎক্ষণিক বিচার চেয়ে না পাওয়ায় ঐদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে ৪৮ জনের পদত্যাগপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. তৌহিদুল ইসলামের কাছে জমা দেয়া হয়। এর মধ্যে ২ জন রিজেন্ট বোর্ড সদস্য, ৪ জন ডিন, ৪ জন প্রভোস্ট, ১৪ জন বিভাগীয় চেয়ারম্যান, সকল হাউজ টিউটর, সকল সহকারী প্রক্টরসহ ৪৮ জন।
জানা যায়, রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-১ পরীক্ষায় বিভাগের পক্ষ থেকে অনুমোদন না দেয়ার পরেও জোর করে এক পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেয় ছাত্রলীগ। গত শনিবার ২য় বর্ষ ২য় সেমিস্টারের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ। এ পরীক্ষায় সেই ছাত্রী ঈশিতা বিশ্বাস উন্নীত হতে পারেনি। তার ফলাফল ৪ এর মধ্যে ১.৯৮ যা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন। পরীক্ষার ফলাফল ১ দিন আগে ঘোষণা করায় একে অধ্যাদেশ বিরোধী উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সজীব তালুকদার তার সহযোগীদের নিয়ে ঈশিতার পক্ষ হয়ে তাকে জোরপূর্বক কোয়ান্টাম মেকানিক্স পরীক্ষার সিটে বসিয়ে দেয়। বিভাগের শিক্ষকরা এ বিষয়ে বাধা দিতে গেলে সজীব তালুকদার ঐ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আনোয়ার হোসেন ও শিক্ষক মহিউদ্দিন তাসনিনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে।
একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঈশিতাকে পাহারা দিয়ে সম্পূর্ণ পরীক্ষা শেষ করায়। ঈশিতাকে পরীক্ষা শেষ করানোর পর তারা শিক্ষার্থীদের ডেকে অর্ডিন্যান্স পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করে। এ সময় কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা বন্ধ করা হয়।
এদিকে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় বিকাল ৪টার দিকে জরুরি সভা ডাকে শিক্ষক সমিতি। সভায় ছাত্রলীগের সভাপতি সজীব তালুকদার, সহ-সভাপতি ইমরান মিয়া, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাবির ইকবাল ও সহ-সভাপতি আদ্রিতা পান্নার বিচারের দাবি জানানো হয়। মাভাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি ও ১৫ জন শিক্ষক স্বাক্ষরিত ভাইস চ্যান্সেলর বরাবর দুইটি আবেদনে এই চারজনের বিচারের দাবি জানানো হয়। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ভাইস চ্যান্সেলরের কক্ষে ছাত্রলীগ ও শিক্ষকদের নিয়ে সভা করা হয়। সভার একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ বের হয়ে এসে প্রতিটি হল থেকে ছাত্র-ছাত্রী বের করে অর্ডিন্যান্স পরিবর্তনের আন্দোলন শুরু করে। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলতে থাকে।
একপর্যায়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সজীব তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ভাইস চ্যান্সেলর অফিস থেকে বৈঠক করে জানায়, স্যাররা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন অর্ডিন্যান্স পরিবর্তনের ব্যাপারে। আমরা সকাল ৯টায় ছাত্র-ছাত্রী স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি ভাইস চ্যান্সেলর বরাবর জমা দেবো। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। এরপর ছাত্র-ছাত্রীরা হলে ফিরে যায়। ছাত্র-ছাত্রী চলে যাবার পর ভাইস চ্যান্সেলরের কনফারেন্স রুমে বিচার না পাওয়ার কারণে রাতেই সকল শিক্ষক একযোগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে রাতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলের ছাত্রলীগের নেত্রীরা হলে ফিরে গেলে সেখানে সাধারণ ছাত্রীদের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি ছাত্রলীগের নেত্রীরা ছাত্রলীগ সভাপতি সজীব তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানকে জানায়। পরে সজীব ও সাইদুর ছাত্রী হলের ভিতরে প্রবেশ করে ছাত্রীদেরও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। একপর্যায়ে সজীব ও সাইদুরকে ছাত্রীরা হল থেকে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর এসে ছাত্রলীগের নেত্রীদের হলের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেন। এ বিষয়ে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মুহাম্মদ শাহীন উদ্দিন বলেন, আমরা সঠিক বিচার না পাওয়ায় গতকাল দুপুরের দিকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবি করছি। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের ড. মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ তবে গতকাল মঙ্গলবারও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অডিনেন্স সংশোধনের দাবীতে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রলীগ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ