ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 October 2018, ২৬ আশ্বিন ১৪২৫, ৩০ মহররম ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাবর-পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ॥ তারেক হারিছসহ যাবজ্জীবন ১৯

* ৩ সেনা ও ৮ পুলিশ কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা
স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীবিরোধী সমাবেশে নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালতে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া এ মামলার আসামী ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন গতকাল বুধবার সকালে আলোচিত ওই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলায় এই রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে ১৪ বছর আগে সংঘটিত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিচারিক আদালতে শেষ হলো।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন; আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান আজকের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ মোট ৪৯ জন এ মামলার আসামী।
শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই হামলা হয়েছিল এবং তাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে এ মামলার তদন্তে উঠে আসে।
সেদিন যা ঘটেছিল : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা হওয়ার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের মাঝখানে একটি ট্রাক এনে তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ। শোভাযাত্রার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বক্তৃতা শেষ করে তিনি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলার সময় ঘটে পর পর দু’টি বিস্ফোরণ। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়। তারই মধ্যে শোনা যায় গুলীর আওয়াজ।
হামলায় আহতদের সাহায্য করতে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা যখন ছুটে গেলেন, তখন পুলিশ তাদের ওপর টিয়ার শেল ছোড়ে। পুলিশ সে সময় হামলার আলামত সংগ্রহ না করে তা নষ্ট করতে উদ্যোগী হয়েছিল বলেও পরে অভিযোগ ওঠে।
ওই হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ জন আহত হন।
মঞ্চে উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিস্ফোরণে মধ্যে মানববর্ম তৈরি করায় সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচ- শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।
সেদিনের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট মারা যান। প্রায় দেড় বছর পর মৃত্যু হয় ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের। পরে সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে।
২১ আগস্ট হামলায় নিহত অন্যরা হলেন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম। একজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে চারদলীয় জোট সরকার। ১ মাস ১০ দিনের মাথায় কমিশন সরকারের কাছে ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে বলে, কমিশনের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত।
মামলা বৃত্তান্ত : হামলার পরদিন মতিঝিল থানার তৎকালীন এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। থানা পুলিশ, ডিবির হাত ঘুরে সিআইডি এই মামলার তদন্তভার পায়। ঘটনার চার বছর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যার অভিযোগ এবং বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি অভিযোগপত্র দেন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির। জঙ্গি দল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে সেখানে আসামী করা হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করে তাদের বিচারও শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করে। সিআইডির বিশেষ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩ জুলাই আসামীর তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন। সেখানে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ চার দলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের নাম আসে।
২০১২ সালের ১৮ মার্চ সম্পূরক অভিযোগপত্রের আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। নতুন করে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। রাষ্ট্রপক্ষের ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে মোট ২২৫ জন এ মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দেন।
জামিনে ও কারাগারে থাকা ৩১ আসামীর সবাই আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ২০ জন।
রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিশেষ এজলাসে ১২০ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলা দুটি রায়ের পর্যায়ে আসে।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু জানান, দ-বিধি ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার বিচার কাজ একই সঙ্গে চলে। সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৪৫৪ কার্যদিবস আদালত বসেছে এ মামলা শোনার জন্য।
মামলার সাক্ষীদের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন ১৪ জন। আর আসামীদের মধ্যে ১৩ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।
অধিকতর তদন্তের আসামী : ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামী করা হয়। তাঁরা হলেন তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম (ডিউক), এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বকশ চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাইদ হাসান ও মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহণের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ জন নেতা।
আসামীদের মধ্যে পুলিশের সাবেক ছয় কর্মকর্তা, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরিফুর রহমান ছিলেন। আদালত রায়ের দিন ধার্য করলে ওই দিন তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠান আদালত। বাবর, পিন্টুসহ ২৩ জন আসামী কারাগারে আছেন। পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। আরেক আসামী জামায়াত নেতা মুজাহিদ, মুফতি হান্নানসহ তিন আসামীর অন্য মামলার রায়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
গ্রেনেড হামলায় সরাসরি জড়িত ও আসামী ফরিদপুরের মাহাবুব মুস্তাকিম ও আনিসুর মুরসালিন। এই দুই ভাই দীর্ঘদিন ভারতের নয়াদিল্লির তিহার কারাগারে আছেন। ভারত থেকে গত সাত বছরেও এই দুই আসামীকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি সরকার।
কারাগারে থাকা ৩১ জন হলেন যথাক্রমে,সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, জঙ্গি শাহদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে মো. ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু উমর আবু হোমাইরা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে ওভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম,হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও আবু বক ওরফে হাফে সেলিম হাওলাদার, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল -দা,সাবেক আইজিপি শ-দুল হক, সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আবদুর রশীদ, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম।
অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে যাদের তারা হলেন, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান, শহিদুল আলম বিপুল।
পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। তারা হলেন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, মাওলানা মো. তাজউদ্দীন, মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মোরসালিম ওরফে মোরসালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর ওরফে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর, মো. ইকবাল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, মো. হানিফ, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল আহম্মেদ বাবু ওরফে বাবু ওরফে রাতুল বাবু, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (সাবেক ডিসি পূর্ব), পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান খান, মুফতি শফিকুর রহমান।

যাঁদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত : মামলায় ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জন কারাগারে আছেন, বাকি দুজন পলাতক। কারাগারে থাকা ১৭ জন হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে মো. ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ ও মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন।
আর পলাতক দুজন হলেন আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই ও জঙ্গিনেতা মাওলানা মো. তাজউদ্দীন এবং হানিফ পরিবহণের মালিক মো. হানিফ।

যাঁদের যাবজ্জীবন হলো : আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন: শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল (উপস্থিত), মাওলানা আবদুর রউফ ওরফের আবু ওমর আবু হোমাইরা ওরফে পীরসাহেব (উপস্থিত), মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির (উপস্থিত), আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া (উপস্থিত), আবু বকর ওরফে হাফে সেলিম হাওলাদার (উপস্থিত), মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (উপস্থিত), মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর ওরফে ওস্তাদ জাহাঙ্গীর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) এবং রাতুল আহম্মেদ বাবু ওরফে বাবু ওরফে রাতুল বাবু (পলাতক)।
৩ সেনা ও ৮ পুলিশ কর্মকর্তার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা : রায়ে আট পুলিশ ও তিন সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুই বছর করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক (খালেদা জিয়ার ভাগনে), লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, সাবেক আইজিপি আশরাফুল -দা, সাবেক আইজিপি শ-দুল হক, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (সাবেক ডিসি পূর্ব), সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন (তদন্ত কর্মকর্তা) ও সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খান। রায়ের একটি আদেশে দুই বছরের এবং আরেকটি আদেশে তিন বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সাবেক আইজিপি খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও সাবেক এএসপি আবদুর রশীদ।

অন্ধকার কক্ষে মোবাইলের টর্চের আলোয় রায় পড়েন বিচারক : রায় ঘোষণার সময় অন্ধকারে ছিল আদালত কক্ষ। গতকাল বুধবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। জনাকীর্ণ আদালতে তখন নীরবতার শুরু। ওই সময়েই আদালত কক্ষের বিদ্যুৎ চলে যায়। বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায় পড়া চালিয়ে যান। এসময় আদালতের একজন কর্মকর্তা মোবাইলের টর্চ বের করে আলো দিতে থাকেন। বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে কক্ষের পরিবেশ। এসময় ১১টা ৫৪ মিনিটে বিভিন্ন ধারায় আসামীদের দণ্ড ঘোষণা শুরু করেন বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন। তিনি ১২টা ২০ পর্যন্ত রায় পড়ে শোনান। এর মধ্যে একবার বিদ্যুৎ এলেও তিন মিনিট পরেই আবারো চলে যায়। দুই মামলার রায় ঘোষণা শেষে দুপুর সাড়ে ১২ টায় এজলাস থেকে নেমে যান বিচারক।
এর আগে সকাল থেকেই রায়ের খবর সংগ্রহে আসা সাংবাদিকরা অপেক্ষা করতে থাকেন আদালত চত্বরে। পুরো এলাকায় ছিল পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি। সোয়া ১০ টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। এরপর পর্যায়ক্রমে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা ও বিচারক এসে উপস্থিত হন। ১১টা ১৮ মিনিটে এই মামলার আসামীদের এজলাসে তোলা শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদেরকে সকালেই কাশিমপুর থেকে ঢাকার আলিয়া মাদরাসায় স্থাপিত আদালত প্রাঙ্গণে এনে রাখা হয়।
প্রথমে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, এরপর আবদুস সালাম পিন্টু, আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা ও সবশেষে জঙ্গী আসামীদের এজলাসে তোলা শুরু হয়। এসময় বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। জঙ্গিদের পায়ে হাতে জড়ানো শেকলের শব্দে গুমগুম করে ওঠে সেখানকার পরিবেশ।
সাংবাদিকরা আদালত কক্ষে প্রবেশের পর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন তার বক্তব্য রাখেন।
কোর্টের ভেতরে দেখা যায়, আসামীদের কাঠগড়ায় সবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন লুৎফরজামান বাবর, তারপাশে আবদুস সালাম পিন্টু, এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, শহুদুল হক, খালেদা জিয়ার ভাগনে সাইফুল ইসলাম (ডিউক)সহ অন্যান্যরা। রায় ঘোষণা শেষে আসামীদের আবারো কাশিমপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
রায়ে যা বলা হয়েছে : অত্র মোকদ্দমার আসামী আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন (পলাতক), মাওলানা শেখ আবদুস সালাম (উপস্থিত), মো. আবদুল মাজেদ ভাট @ মো. ইউসুফ ভাট (উপস্থিত), আবদুল মালেক @ গোলাম মোহাম্মদ @ জি.এম (উপস্থিত), মাওলানা শওকত ওসমান @ শেখ ফরিদ (উপস্থিত), মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমার ওরফে অভি (উপস্থিত), মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর (উপস্থিত), আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল (উপস্থিত), মো. জাহাঙ্গীর আলম (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (উপস্থিত), হোসাইন আহম্মেদ তামিম (উপস্থিত), মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ (উপস্থিত), মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ (উপস্থিত), মো. উজ্জল ওরফে রতন (উপস্থিত), মো. লুৎফুজ্জামান বাবর (উপস্থিত), মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী (উপস্থিত), বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিম (উপস্থিত), মো. আবদুস সালাম পিন্টু (উপস্থিত), মো. হানিফ (মালিক হানিফ পরিবহণ, উপস্থিত) গং এর বিরুদ্ধে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং উক্ত অপরাধে সহায়তা করে অত্র মোকদ্দমার নিহতগণকে হত্যা করার অভিযোগে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইন (সংশোধনী-২০০২)-এর ৩ ও ৬ ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো এবং প্রত্যেককে ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা জরিমানা প্রদান করা হলো। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আসামীদের গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ প্রদান করা হলো।
অত্র মোকদ্দমার আসামী শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল (উপস্থিত), মাওলানা আ. রউফ @ আবু হোমাইরা @ পীর সাহেব (উপস্থিত), মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির (উপস্থিত), আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া (উপস্থিত), আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার (উপস্থিত), মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (উপস্থিত), মহিবুল মুস্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক), রাতুল আহমেদ বাবু ওরফে রাতুল বাবু (পলাতক) গণের বিরুদ্ধে গ্রেনেড নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং উক্ত অপরাধে সহায়তা করে অত্র মোকদ্দমার নিহতগণকে হত্যা করার অভিযোগে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইন (সংশোধনী-২০০২)-এর ৩ ও ৬ ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা প্রদান করা হলো। জরিমানা অনাদায়ে আরোও এক বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
অত্র মোকদ্দমার আসামী আলহাজ্ব মাওলানা মো. তাজউদ্দিন (পলাতক), মাওলানা শেখ আবদুস সালাম (উপস্থিত), মো. আবদুল মাজেদ ভাট @ মো. ইউসুফ ভাট (উপস্থিত), আবদুল মালেক @ গোলাম মোহাম্মদ @ জি.এম (উপস্থিত), মাওলানা শওকত ওসমান @ শেখ ফরিদ (উপস্থিত), মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমার ওরফে অভি (উপস্থিত), মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর (উপস্থিত), আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল (উপস্থিত), মো. জাহাঙ্গীর আলম (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (উপস্থিত), হোসাইন আহম্মেদ তামিম (উপস্থিত), মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জানদাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ (উপস্থিত), মো. রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ (উপস্থিত), মো. উজ্জল ওরফে রতন (উপস্থিত), মো. লুৎফুজ্জামান বাবর (উপস্থিত), মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী (উপস্থিত), বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিম (উপস্থিত), মো. আবদুস সালাম পিন্টু (উপস্থিত), মো. হানিফ (মালিক হানিফ পরিবহণ) উপস্থিত গণের বিরুদ্ধে অত্র মোকদ্দমার জখম প্রাপ্ত ভিকটিমগণকে অভিন্ন অভিপ্রায় পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গুরুতর জখম করার অভিযোগে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইন (সংশোধনী-২০০২)-এর ৪ ও ৬ ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে প্রত্যেককে ২০ (বিশ) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা প্রদান করা হলো। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
অত্র মোকদ্দমার আসামী শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল (উপস্থিত), মাওলানা আ. রউফ @ আবু হোমাইরা @ পীর সাহেব (উপস্থিত), মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির (উপস্থিত), আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক (উপস্থিত), হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া (উপস্থিত), আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার (উপস্থিত), মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (উপস্থিত), মহিবুল মুস্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক), রাতুল আহমেদ বাবু ওরফে রাতুল বাবু (পলাতক) গণের বিরুদ্ধে অত্র মোকদ্দমার জখমপ্রাপ্ত ভিকটিমগণকে অভিন্ন অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গুরুতর জখম করার অভিযোগে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইন (সংশোধনী-২০০২)-এর ৪ ও ৬ ধারায় দোষী সাব্যস্তক্রমে প্রত্যেককে ২০ (বিশ) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জরিমানা প্রদান করা হলো। জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে প্রদত্ত ২০ (বিশ) বছর কারাদণ্ডাদেশ কার্যকর হবে না। একইভাবে ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইন (সংশোধনী-২০০২)-এর ৩ ও ৬ এবং ৪ ও ৬ উভয় ধারায় আসামীগণকে প্রদত্ত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২০ বছরের কারাদণ্ড একযোগে কার্যকর হবে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের হাজত বাসকাল ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫এ ধারানুসারে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ থেকে বাদ যাবে মর্মে আদেশ প্রদান করা হলো। দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামীদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করা হোক। পলাতক আসামীগণের গ্রেফতার বা আত্মসমর্পণের দিন থেকে প্রদত্ত দণ্ডাদেশ কার্যকর হবে। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামীগণ ইচ্ছা করলে অত্র রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন-২০০২-এর ১৪ ধারানুসারে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে আপীল দায়ের করতে পারবেন। জব্দকৃত আলমত পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেয়া হলো।
অত্র মোকদ্দমার সমস্ত প্রসিডিংস ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৭৪ ধারানুসারে মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের বিভাগে প্রেরণ করা হোক।
অত্রাদেশের অনুলিপি বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা, সিনিয়র জেল সুপার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মালখানা, সিএমএম কোর্ট, ঢাকা বরারবর প্রেরণ করা হোক।

আদালতের পর্যবেক্ষণ : রাজনীতি মানে কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? এই রাজনীতি এ দেশের জনগণ চায় না। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে, তাই বলে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হবে? রাজনীতিতে এমন ধারা চালু থাকলে মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে। মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশেষ আদালত-৫-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এই মন্তব্য করেছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে কি বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় বিরোধী যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদারনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
আদালত বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়। রাজনৈতিক জনসমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সাধারণ জনগণকে হত্যার এ ধারা চালু থাকলে সাধারণ মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে।
আদালত এ দেশে আর এমন হামলার পুনরাবৃত্তি চান না-এমন মন্তব্য করে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ওপর হামলা বা রমনা বটমূলে হামলার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না। আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে নৃশংস হামলার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।
আদালত বলেন, এ আদালত চিকিৎসক প্রাণ গোপাল দত্ত, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাহারা খাতুন, বাহাউদ্দিন নাসিমের জবানবন্দী গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। সাক্ষী নীলা চৌধুরী গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। আদালত বলেন, ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ফলে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডান কান গুরুতম জখম হয়।

খালেদা জিয়া ও তারেকের নাম বলিনি, তাই সাজা পেলাম -বাবর
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারসপারসন তারেক রহমানের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেননি বলেই মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন হামলার সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা লুৎফুজ্জামান বাবর। রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
সাজা ঘোষণার পর বাবর আদালতকে বলেন, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজা দেয়া হলো। আমি খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার নাম বলিনি। তাই আমাকে এই সাজা দেয়া হলো।
রায়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাবর বলেন, ২১ আগস্টের ঘটনাটি ন্যক্কারজনক। এটি ইতিহাসের জঘন্যতম একটি ঘটনা। ‘এই ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ সাজা আমিও চেয়েছি,’ বলেন বাবর।
লুৎফুজ্জামান বাবর আরও বলেন, আমি প্রতিদিন তাহাজ্জুত নামাজ পড়ি এবং আল্লাহর কাছে এই ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করি। ‘আমি আল্লাহর কাছে এই ঘটনার বিচার চাই’, সবশেষে বলেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার রহিমের স্ত্রী বললেন, আমার স্বামী নির্দোষ-এসবে জড়িত ছিলেন না : আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিমের স্ত্রী শিরিন রহিম তাঁর স্বামীকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। শিরিন রহিম এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথাও বলেছেন। আবদুর রহিম ২০০৪ সালে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক ছিলেন।
মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালত চত্বরের বাইরে ছিলেন আবদুর রহিমের স্ত্রী শিরিন রহিম। রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি আমলে তাঁর স্বামী এনএসআইয়ে থাকার কারণে তাঁকে আসামী করা হয়। মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা ও গাড়ির চালককে ডাকা হলেও তাঁরা কোনো সাক্ষ্য দেননি বলে জানান। তিনি দাবি করে বলেন, তাঁর স্বামী কোনো অন্যায় কাজ করেননি।
শিরিন রহিম বলেন, ‘আমার স্বামী নির্দোষ। তিনি এসবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষীও ছিল না। এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব।’ এ ছাড়া তাঁর স্বামী ঘটনার সময়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বলেও দাবি করেন।
রায় ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা : রায়কে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ-র‌্যাবের সমন্বয়ে রাজধানীতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি মোড়ে পথচারিতে চলাচল সীমিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেহতল্লাশী করেছে তাদের। গতকাল বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তার এই চিত্র দেখা গেছে।
রাজধানীর ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ী এলাকায় সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে রয়েছেন ডেমরা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখারুজ্জামান ইফতি। তিনি বলেন, সব ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মাঠে কাজ করছে পুলিশ। দয়াগঞ্জ মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মেতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ বন্দুক তাক করে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরে অবস্থান নিয়েছে। পাশেই রয়েছে অ্যাম্বুলেন্সসহ পুলিশের গাড়ি।
মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, পুরানা পল্টন, নয়া পল্টন, কাকরাইল কদম ফোয়ারা, মৎস ভবন, শাহবাগ এলাকায় দেখা যায়, মোড়ে মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। সেইসঙ্গে রায়ট কার, এপিসি কারসহ জলকামানের গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে র‌্যাব টহল দিয়েছে। পুলিশ বলছে, কেউ যাতে নূন্যতম বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেজন্য এতো আয়োজন।
রাজধানীর উত্তরায়ও বিপুল সংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ উত্তরা এলাকায় নিরাপত্তা বলয় করেছে। একইসঙ্গে পুলিশের জল কামানসহ বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও র‌্যাবের ডগ স্কোয়াড মোতায়েন রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, চাঁনখার পুল থেকে পুরান ঢাকায়। কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশের এলাকায় প্রায় ৫০০ পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে জলকামান, রায়ট কার ও এপিসি কারসহ বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকেও প্রস্তুত থাকতে দেখা গেছে। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে দেখা গেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এই এলাকায় লোকজনকে দল বেঁধে যাতায়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার বলেন, কোন ধরনের নৈরাজ্য বরদাস্ত করা হবে না। কেউ নৈরাজ্য করে আতঙ্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ