ঢাকা, বুধবার 24 October 2018, ৯ কার্তিক ১৪২৫, ১৩ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গ্রেনেড হামলার দায় বিএনপির হলে বিডিআর হত্যার দায় সরকারের: ফখরুল

সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলামসহ বিএনপি নেতারা (ফাইল ফটো)

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

ক্ষমতায় থাকার কারণে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দায় যদি তখনকার বিএনপি সরকারকে  নিতে হয়, তাহলে  বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ সকল হত্যাকাণ্ডের দায় বর্তমান সরকারকে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আজ (শুক্রবার) সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব মন্তব্য করেন। বিএনপির মহাসচিব বলেন, “বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে সংঘটিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের হয়, তাহলে বর্তমান সরকারের শাসনামলে পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, হলি আর্টিজানে হত্যাকাণ্ড এবং জঙ্গি হামলায় নিহত বিদেশি কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইমাম-মুয়াজ্জিন, যাজক-পুরোহিত, ব্লগারসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষের হত্যাকাণ্ডের দায় ক্ষমতাসীনদের ওপরই বর্তায়। কিন্তু গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।”

রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বিস্ময় প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “গতকাল প্রকাশিত দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় হামলা’ বলে আদালতের পর্যবেক্ষণের যে খবর প্রচারিত হয়েছে-তাতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের হুবহু প্রতিফলন দেখে দেশের জনগণের মতো আমরাও বিস্মিত হয়েছি। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালাতে থাকে। পরাজিত শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে। জাতির পিতাকে হত্যার পর জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। ‘২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন চেষ্টা চালানো হয়’ বলেও আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্য হুবহু এক।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, জেলখানায় চার জাতীয় নেতার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ঘৃণ্য অপরাধকে একইসূত্রে গাঁথার যুক্তি সঠিক হলে বিএনপি কিংবা বিএনপি পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপরাধী বলা হল কোন যুক্তিতে? ১৯৭৪ সালে বিএনপির জন্মও হয়নি এবং ১৫ আগস্ট কিংবা ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোনো আদালতই বিএনপি কিংবা বিএনপির কোনো নেতাকে অভিযুক্ত, এমনকি সম্পৃক্তও করেনি। তাহলে ২১ আগস্টের ঘটনার বিচারের পর্যবেক্ষণে আগের দুটি ঘটনার উল্লেখ কতটা প্রাসঙ্গিক? দল বিশেষের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ মিলে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলেই জনগণ মনে করে।”

তিনি আরও বলেন, “হুজি নেতা মুফতি হান্নান দৈহিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা তিনি প্রকাশ্য আদালতে লিখিতভাবে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরেও তারই জবানবন্দিকে ভিত্তি করে তারেক রহমান এবং অন্যান্য বিএনপি নেতাকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়াটা কতটা মানবিক ও যুক্তিযুক্ত কিংবা আইনসঙ্গত হয়েছে তা উচ্চ আদালত বিবেচনা করবে বলে আমরা আশা করি। আদালতের পর্যবেক্ষণে বিরোধী দলের প্রতি সরকার ও সরকারি দলের প্রত্যাশিত আচরণ সম্পর্কে যেসব বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে তা বর্তমানে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের আচরণের ঠিক বিপরীত। আমরা আশা করব সরকার আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ মান্য করবে।”

তারেক-বাবরসহ দণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “রায়ের পর্যবেক্ষণে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এস এম এ কিবরিয়া ও আহসান উল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ থাকলেও বিচারকের বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি সরকারি দলের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে দেয়া পর্যবেক্ষণে বর্তমান সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী ও সাইফুল ইসলাম হিরু, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, ছাত্রনেতা জাকিরসহ গুম হওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কোনো কথা নেই কেন জনগণ তা জানতে চাইতেই পারে। রায়ের পর্যবেক্ষণে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গত ১০ বছরে হাজারো গুম, খুন, গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে পঙ্গু করা, হাজার হাজার গায়েবি মামলা দিয়ে লাখ লাখ বিএনপি নেতাকর্মীদের বছরের পর বছর ঘরছাড়া করে রাখা, গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন করার বিষয়ে কোনো কথা না থাকা রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে।”

সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, মিডিয়ার একাংশ এই রায় প্রকাশের পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে মনগড়া কিছু তত্ত্ব ও তথ্য প্রকাশ করে তার সম্পর্কে জনমনে বিরুপ ধারণা দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। আমরা আশা করি, ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ক্ষমতাবান কারো তুষ্টির জন্য কারো বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো থেকে দায়িত্বশীল মিডিয়া বিরত থাকবে।

বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, “২১ আগস্টের নৃশংস ঘটনার সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন সরকারই মামলা দায়ের করেছে। নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য এফবিআই এবং ইন্টারপোলকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে; বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করেছে এবং সর্বোপরি এই মামলার মূল আসামি মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, তৎকালীন সরকার অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। কাজেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় হামলা হয়েছে বলে আদালতের যে পর্যবেক্ষণ-তা যুক্তিগ্রাহ্য কিংবা গ্রহণযোগ্য নয়।”

গত (বুধবার) ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
-এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ