ঢাকা, সোমবার 15 October 2018, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ৪ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন -সংগ্রাম

# সরকারের পদত্যাগ-খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি ॥ ১১ লক্ষ্য ঘোষণা

# স্বৈরশাসককে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় তা বঙ্গবন্ধু আমাকে শিখিয়েছেন --- ড. কামাল
# জনগণের অধিকারগুলো আদায় করেই ঘরে ফিরবো  ---মির্জা ফখরুল
# সরকারি কর্মকর্তারা স্বৈরশাসকের নির্দেশ মানলে পরিণতি হবে ভয়াবহ --- রব
# জনগণের ওপর চেপে থাকা সিন্দাবাদের ভূত তাড়াতে হবে --মান্না
# জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে দেশবাসী আশার আলো দেখতে পাচ্ছে --ব্যারিস্টার মইনুল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফা দাবিতে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা, বিশ্বখ্যাত আইন বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঐক্যফ্রন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে সূচনা বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, গত তিনদিনের টানা বৈঠক শেষে আমরা একটি ঐক্যমতে পৌঁছেছি। এই ঐক্য কোনো দলের স্বার্থে নয়। জাতীয় স্বার্থে এই ঐক্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন কারো বিরুদ্ধে নয়। আমরা আমাদের সংবিধান কর্তৃক দেয়া অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। এই দেশের মালিক জনগণ। তারাই ঠিক করবে কারা আগামীতে দেশ পরিচালনা করবে। তিনি বলেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না।  লিখিত বক্তব্যে ৭ দফা দাবিসহ ১১ লক্ষ্য তুলে ধরেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। এ ফ্রন্টে কামাল হোসেনের গণফোরাম, আসম আবদুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অন্যতম সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি।
নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ সারাদেশে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা একযোগে সফর শুরু করবেন বলে ঘোষণা দেন জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব। তিনি বলেন, আমরা শিগগিরই কর্মসূচি ঘোষণা করবো। কূটনীতিকদের সাথে আমরা মতবিনিময় করবো, সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করবো, সকল পেশার মানুষের সাথে আমরা আলোচনা করবো।
সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এছাড়া গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাষ্টি ডা. জাফরুল্লাহ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মনসুর আহমেদও বক্তব্য দেন। এই সাংবাদিক সম্মেলন জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আবম মোস্তফা আমিন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী, ফজলুর রহমানসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যের পর ঐক্য ফ্রন্টের ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য তুলে ধরেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, দেশে আজ সিন্দাবাদের ভূত চেপে বসেছে। দেশবাসী ঐক্যবদ্ধ না হলে এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যাবে না।  তিনি বলেন, এসব দাবি আদায়ে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসক আ’লীগের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু হলো। তিনি জানান, ধীরে ধারে আমরা কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবো। এসময় তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ তুলে ধরেন এবং সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ডিজিটাল নিরাপত্তাসহ সব কালো আইন বাতিল করাসহ সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য ঘোষণা করেন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবিগুলো হলো:
১. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা সপেক্ষে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদাসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার নিশ্চিত করতে হবে।
২. গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
৩. বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
৪. কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে ছাত্রছাত্রী, সাংবাদিকসহ সবার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেফকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল করতে হবে।
৫. নির্বাচনের ১০ দিন পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে।
৬. নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ভোটকেন্দ্র, পোলিং বুথ, ভোট গণনা স্থল ও কন্ট্রোল রুমে তাদের প্রবেশের ওপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ না করা। নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর যেকোনও ধরনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে।
৭. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও কোনও ধরনের নতুন মামলা না দেয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
ঘোষিত ১১টি লক্ষ্য:
১. মহান মুক্তি সংগ্রামের চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিদ্যমান স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থার অবসান করে সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক, শোসনমুক্ত ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা। এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক নির্বাহীক্ষমতার অবসান কল্পে সংসদে, সরকারে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নসহ প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ ও ন্যায়পাল নিয়োগ করা।
২.৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন করা। জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানসমূহের গুরুত্বপূর্ণ পদে  নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, সৎ-যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দানের জন্য সাংবিধানিক কমিশন ও সাংবিধানিক কোর্ট গঠন করা।
৩. বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের নীতমালা প্রণয়ন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করা।
৪.  দুর্নীতি দমন কমিশনকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা। দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন।
৫. দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, বেকারত্বের অবসান ও শিক্ষিত যুবসমাজের সৃজনশীলতাসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে মেধাকে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় কোটা সংস্কার করা।
৬. সকল নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তার বিধান করা। কৃষক, শ্রমিক ও দরিদ্র জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও পুষ্টি সরকারি অর্থায়নে সুনিশ্চিত করা। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
৭. জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কালো থাবা থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।
৮. রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জনগণের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রের সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, সুষম বন্টন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। নিম্ন আয়ের মানবিক জীবন মান নিশ্চিত করা এবং দ্রব্যমূলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বেতন-মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা।
৯. জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নেতিবাচক রাজনীতির বিপরীতে ইতিবাচক সৃজনশীল এবং কার্যকর ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখ- ব্যবহার করতে না দেয়া।
১০. ‘সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব-কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’-এই নীতির আলোকে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সমুন্নত রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করা এবং প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে পারস্পরিক সৎ-প্রতিবেশী বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
১১. বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাদের দেশে ফেরত ও পুনর্বাসনের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং দেশের সার্বোভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরপত্তা সুরক্ষার লক্ষে প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত ও যুগোপযোগী করা।
সভাপতির বক্তব্যে গণফোরাম সভাপতি, দেশের সংবিধান প্রণেতাও জাতীয় ফ্রন্টের চেয়ারপার্সন ড. কামাল হোসেন বলেন,  অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্যই ৭ দফা দাবি নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ ঘোষণা করা হয়েছে। ফ্রন্টের ঘোষণা দিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, কোনো দলের স্বার্থে নয়, জাতির স্বার্থে ১৬ কোটি মানুষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। জনগনের অধিকার, জনগনের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা আজকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। আশা করছি এটা সফল হবে। তিনি বলেন, আজকে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে বিএনপি, যুক্তফ্রন্টের আসম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না আছেন। আমরা আশা করি বি চৌধুরী (অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী) ও  মান্নান (আবদুল মান্নান) সাহেব এর সাথে যুক্ত হবেন। যারা ঐক্য ফ্রন্টের বাইরে আছেন সেসব রাজনৈতিক দল যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তি, সংগঠন, পেশাজীবী, মানবাধিকার সংগঠন, সামাজিক ব্যক্তিগণ সকলে এই ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হবেন বলে আমি আশা করছি।
ড. কামাল হোসেন বলেন, একটি পরিচয় ভুলে গেলে চলবে না, আমি বঙ্গবন্ধুর বিশ^স্ত সৈনিক ছিলাম। তিনি আমাকে শিখিয়ে গেছেন কীভাবে ভয়কে জয় করতে হয়। কিভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হয়। আমি কাউকেই ভয় পাইনা।
তিনি বলেন, দেশের মালিক হলা জনগণ। তারা যতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে থাকে তাহলে কেউই বিজয় ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকে শিকিয়ে গেছেন কিভাবে স্বৈশাসককে মোকাবেলা করতে হয়। লড়াই শুরু হয়েছে, এ লড়াই চলবে। তিনি বলেন, আমি জীবনের ঝুঁকি নিতে জানি। যদি সাহস থাকে মারো, গুলী করো। আমার মৃত্যু যেভাবে আছে, যেদিন আছে সেটি কেউই ঠেকাতে পারবে না। এগুলোও বঙ্গবন্ধু বলতেন। আমি তার সৈনিক।
ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছেন, জনগণ কি চায় সেটি সংবিধানে তুলে ধরো। কারণ দেশের মালিক জনগণ। তারাই এ দেশ স্বাধীন করেছে। যদি জনগণ রাস্তায় নেমে আসে তাহলে সরকার কত গুলী করবে? কত ট্যাঙ্ক নামাবে।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, আমাদের কোনো হুমকি দিয়েন না। এসব করে লাভ হবেনা। সরকার গঠন করতে হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যেখানে মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার পাবে। যেখানে টাকার কোনো নির্বাচন হবেনা।
তিনি বলেন, আমাদের সংবিদানে যেগুলো আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে দেশ দেখতে চাই। সেটি কি হয়েছে? হয়নি। তিনি বলেন, সরকার গঠনের অধিকার কেবল জনগণের। তিনি বলেন, আমি সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের সকল স্বপক্ষের শক্তি, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবিসহ সকল পেশাজীবিদের আমাদের পাশে পেতে চাই। সকলকে একসাথে দেশ রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলো। আমরাও বলছি, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ঘরে ঘরে ঐক্য গড়ে তুলুন। এদের রুখে দিতে পারলেই জনগণ তাদের ভোটাধকার ফিরে পাবে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজ একটি শুভ সূচনা হলো। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের একটি দ্বার উন্মোচন হলো আজ। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার, দুর্নীতি লুটপাটসহ ক্ষমসতাসীনদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরা দীর্ঘদিন লড়াই করছি। আমরা বারবার বলেছি, আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করতে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই আওয়ামী লীগ যতবারই ক্ষমতায় ছিল ততবারই দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে। মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, এই সরকার গণতন্ত্রের অগ্র সেনানী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আটক রেখেছে। তারা বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে হাজার হাজার মামলা দিচ্ছে। লাখ লাখ নেতাকর্মী এসব মামলার আসামী।
তিনি বলেন, আমরা একটি মুক্ত দেশের স্বপ্ন দেখছি। যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে। মানুষ তাদের বেঁচে থাকার অধিকার পাবে। তিনি বলেন, আমরা নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। নতুন আঙ্গিকে লড়াই শুরু হয়েছে। এ লড়াইয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্রের অধিকারগুলো আদায় করেই ঘরে ফিরব। তিনি বলেন, দেশ আজ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কোথাও কেউ নিরাপদ না। আমরা এ অবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাই। সেই জন্যই আমাদের ঐক্য। এসময় সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, কর্তৃত্ববাদী এই স্বৈরশাসক থেকে জনগণ মুক্তি পেতে চায়। এখন দেশে সর্বত্রই আতংক বিরাজ করছে। এখানে আমরা যারা আছি তারা ঘরে ফিরতে পারবো কিনা তা নিয়ে শংকিত। যেভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, গায়েবী মামলা দেয়া হচ্ছে, এসব থেকে জনগণকে বাঁচাতে হবে। তিনি বলন, এ জাতি ১৯৭১ সালে একবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আজ দেশ রক্ষায় আবারো আমরা ঐক্যবদ্ধ হলাম। তিনি বলেন, আমরা আহবান জানাই যারা মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের শক্তি আছেন, যারা গণতান্ত্রিক দল, দেশকে ভালো বাসেন, তারা আমাদের সাথে থাকবেন। প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা শুনেছি আপনাদের অনেকেই বিদেশ চলে যাচ্ছেন। আমি বলব আপনারা অন্যায়ের কাছে নত শিকার করবেন না। যদি স্বৈরশাসকের কথা মতে চলেন তাহলে পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমরা ষড়যন্ত্রে বিশ্বাস করিনা। আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। দাবি না মানলে আন্দোলন চলতেই থাকবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দুর্বিসহ জীবন থেকে পরিত্রাণের জন্য এই ঐক্য ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে। দেশে আজ গণতন্ত্র নেই। কথা বলার, সভা সমাবেশ করার অধিকার নেই। কোথাও কেউ নিরাপদ নয়। সর্বত্র শুধু লুট আর লুট। জনজীবন আজ অতিষ্ঠ। তিনি বলেন, এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারেনা। তাই জনগণের আশা আকাংখাকে সামনে রেখে নির্বাচনে আগেই খালেদা জিয়ারসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিতে হবে।
সাবেক আইন মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এটি ইতিহাসের অন্যতম দিন। এই বয়সেও ড. কামাল হোসেন দেশের জন্য, মানুষের জন্য যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা জনগণ আজীবন স্বরণ রাখবে। তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন ভোটাধিকারের আন্দোলন। জনগণকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার আন্দোলন। তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই এই সরকারকে সাত দফা দাবি মানতে বাধ্য করা হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, আজকের এই ঐক্যের মাধ্যমে মানুষের দীর্ঘদিনে একটি প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে। আমরা আশার আলো দেখছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর আগে। অথচ আমরা এখনো ভোটাধিকারই পেলাম না। এখনো আমরা অসহায়। এ অবস্থা থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায়।
গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘ দিনেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তণ চায়। তারা তাদের ভোটাধিকার, কথা বলার অধিকার, মৌলিক অধিকারগুলো চায়। মানুষ গায়েবি মামলা, অযথা ধরে নিয়ে যাওয়া এসব দেখতে চান না। তাই সময়ের প্রয়োজনে এ ঐক্য হয়েছে। এটিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।
গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, হারানো গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। এ ঐক্যের মাধ্যমে স্বৈরশাসকের পতন ঘটানো হবে। তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ